
১০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ইস্ট পালো অল্টোতে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের জন্য বিনা খরচে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পারিবারিক সহায়তার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল দ্য প্রাইমারি স্কুল। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের স্ত্রী শিশুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রিসিলা চ্যান ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির সহপ্রতিষ্ঠাতা।
তবে এক দশক পর এই শিক্ষা উদ্যোগটি বন্ধ হয়ে গেছে। চ্যান জাকারবার্গ ইনিশিয়েটিভ (সিজেডআই) থেকে ১২৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন পাওয়ার পরও চলতি বছরের জুনে স্কুলটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে এপ্রিলে পরিচালনা পর্ষদ সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ, ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের পর সিজেডআই আর অর্থায়ন দেবে না বলে জানতে পারে তারা।
এটি ছিল চ্যান জাকারবার্গ ইনিশিয়েটিভের সবচেয়ে আলোচিত শিক্ষা প্রকল্পগুলোর একটি। পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জ্যাঁ-ক্লোদ ব্রিজার্ড বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সিজেডআইয়ের সঙ্গে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। তবে প্রধান অর্থদাতার সমর্থন ছাড়া পর্ষদ কখনোই স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিত না।
অন্যদিকে সিজেডআইয়ের এক মুখপাত্র জানান, স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্ত পরিচালনা পর্ষদের। সংস্থাটি পরিচালন ব্যয়ের চেয়ে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ফলাফলের উন্নয়নকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পারিবারিক সহায়তার সমন্বিত উদ্যোগ—
দ্য প্রাইমারি স্কুলের মূল লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে বিদ্যালয়ের পাঠদানের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় নানা সেবা একই জায়গায় পাওয়া যাবে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিনা মূল্যে দাঁতের পরীক্ষা, শিশুদের বিকাশসংক্রান্ত মূল্যায়ন এবং অভিভাবকদের জন্য স্বাস্থ্য ও সুস্থতাবিষয়ক পরামর্শসেবা পেত।
প্রিসিলা চ্যান শিশুবিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার সময় দেখেছিলেন, একই পরিবারের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদাভাবে কাজ করে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই সমন্বিত এই শিক্ষা মডেল গড়ে তোলা হয়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মীরা স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আচরণগত সমস্যা, শেখার অসুবিধা বা বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে—এমন শিশুদের শনাক্ত করতেন। বিদ্যালয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর পরিবারে ইংরেজির বাইরে অন্য ভাষায় কথা বলা হতো।
প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকের বছরগুলোতে প্রিসিলা চ্যান নিজেও নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতেন। তিনি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, বই পড়ে শোনাতেন এবং নতুন পাঠক্রম চালুর কার্যক্রমে অংশ নিতেন। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নিয়মিত অভিভাবকদের জন্য শিশুর বিকাশ ও অভিভাবকত্ববিষয়ক কর্মশালাও আয়োজন করা হতো।
প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি শিক্ষার্থীদের ফলাফল—
এত সহায়তা পরে বিদ্যালয়টির একাডেমিক ফলাফল প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের স্প্রি সেশনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় গ্রেড বা তার পরের শ্রেণির মাত্র ২৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ভাষাজ্ঞান–সংক্রান্ত মান পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। একই সময়ে ক্যালিফোর্নিয়াজুড়ে এই হার ছিল ৪৭ শতাংশ।
তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, বছরের শেষে অষ্টম শ্রেণির ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী নির্ধারিত দক্ষতার মান অর্জন করেছিল।
বিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা পরিচালনাগত নানা সমস্যার কথাও স্বীকার করেছেন। ঘন ঘন প্রধান শিক্ষক পরিবর্তন এবং একই প্রতিষ্ঠানের আওতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পারিবারিক সহায়তা পরিচালনা করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বিদ্যালয়ের সাবেক পরামর্শক ক্যাথরিন কার্টারের ভাষ্য, এমন নতুন ধরনের শিক্ষা মডেল প্রতিষ্ঠা করতে যে পরিমাণ সময় ও সহায়তা প্রয়োজন, সে বিষয়ে শুরুতে পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না।
গত বছর প্রিসিলা চ্যানও স্বীকার করেছিলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ফলাফল তাঁদের প্রত্যাশা মতো হয়নি।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ে প্রচলিত সরকারি স্কুলগুলোর তুলনায় কিছু ভিন্নধর্মী পদ্ধতিও অনুসরণ করা হয়েছিল। শিক্ষকদের গোপনীয়তা চুক্তিতে (এনডিএ) সই করতে হতো। আবার ভাষা শেখার প্রাথমিক পর্যায়ে অভিভাবক ও সন্তানের কথোপকথন বিশ্লেষণের জন্য কিছু পরিবারকে রেকর্ডিং ডিভাইস ব্যবহারের কর্মসূচিতেও যুক্ত করা হয়েছিল।
অর্থায়ন বন্ধের সিদ্ধান্ত—
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের পর সিজেডআই অর্থায়ন বন্ধ করবে—এ তথ্য পাওয়ার পরই পরিচালনা পর্ষদ বিদ্যালয়টি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। সিজেডআই জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে তাদের দাতব্য কার্যক্রমের অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়েছে। এখন তারা সামাজিক কর্মকাণ্ডের তুলনায় বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সংস্থাটির পরিকল্পনা ছিল, দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যালয়টি সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে স্বনির্ভর হবে। কিন্তু নতুন দাতা সংস্থা বা অর্থায়নকারী খুঁজে পাওয়া সহজ হয়নি। এ বিষয়ে জ্যাঁ-ক্লোদ ব্রিজার্ড বলেন, বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তির অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানে অন্য কেউ অনুদান দিতে আগ্রহী হন না।
শিক্ষার্থী ও পরিবারের জন্য সহায়তা—
বিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার সময় শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলোর স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেয় সিজেডআই।
এই অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়ের লিজের বাকি অর্থ পরিশোধ, স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলোকে সহায়তা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সঞ্চয় হিসাব চালু করা হচ্ছে। প্রাথমিক স্তরের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ১০ হাজার ডলার, প্রাক্-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ২ হাজার ৫০০ ডলার এবং শৈশবের প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রের শিশুদের জন্য এক হাজার ডলার করে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে প্রায় ৫৪০ শিক্ষার্থীকে রেভেন্সউড সিটি এলিমেন্টারি স্কুল ডিস্ট্রিক্ট গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ জন্য তাদের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সংস্কার করা হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মীরাও শিক্ষার্থীদের অন্য স্কুল ঘুরে দেখানো, ভর্তি প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা এবং শিক্ষা সঞ্চয় হিসাব খুলতে অভিভাবকদের সহযোগিতা করছেন।
অনেক পরিবারের কাছে দ্য প্রাইমারি স্কুল শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল স্বাস্থ্যসেবা ও পারিবারিক সহায়তারও নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যাচের এক শিক্ষার্থীর মা মেলে ফাকাপেলিয়া বলেন, এই সহায়তা ব্যবস্থা হারানো তাঁদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টের। তথ্যসূত্র: দ্যা টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল