নাজমুল হাসান রাজু
নাজমুল হাসান রাজু

যুক্তরাষ্ট্রে ফুল ফান্ডিং: অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ ও স্টাইপেন্ড সম্পর্কে কতটা জানেন

যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আমরা সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নগুলো শুনি, তা প্রায় একই—ভর্তির সুযোগ কীভাবে পাব, ফান্ডিং কি সত্যিই পাওয়া যায়, আর পুরো খরচ কত? এই লেখায় সেগুলোর বাস্তব উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি। এখানে উল্লেখ করা অঙ্ক সাধারণ ধারণামাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগভেদে তা বদলায়।

ভর্তির সুযোগ কীভাবে পাবেন

যুক্তরাষ্ট্রে ভর্তির আবেদন সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অনলাইন পোর্টালে করতে হয়। সাধারণ নথিপত্রের মধ্যে আছে—একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট ও সনদ, ইংরেজি দক্ষতার প্রমাণ (টোয়েফল, আইইএলটিএস বা ডুওলিঙ্গো ইংলিশ টেস্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে গ্রহণযোগ্যতা আলাদা), স্টেটমেন্ট অব পারপাস, দুই থেকে তিনটি সুপারিশপত্র, রেজিউমে বা সিভি, জিআরই বা জিম্যাট (যদি বিভাগ চায়)। বহু প্রোগ্রামে এটি এখন ঐচ্ছিক বা আর লাগে না, তাই প্রতিটি বিভাগের শর্ত আলাদাভাবে দেখতে হবে।

আবেদন ফি সাধারণত প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৫০ থেকে ১১০ মার্কিন ডলারের মধ্যে হয়। দশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলে শুধু এই খাতেই হাজার ডলারের কাছাকাছি লেগে যেতে পারে।

মনে রাখা জরুরি

স্টেটমেন্ট অব পারপাস ও সুপারিশপত্র ভর্তির সবচেয়ে সিদ্ধান্তমূলক অংশ, বিশেষ করে ফান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে। আপনি কেন ওই নির্দিষ্ট বিভাগে পড়তে চান, কোন অধ্যাপকের গবেষণার সঙ্গে আপনার আগ্রহ মেলে এবং আপনার এখন পর্যন্ত কী অভিজ্ঞতা আছে—তা পরিষ্কারভাবে লিখুন। সাধারণ বা সবার জন্য এক রকম লেখা এখানে কাজ করে না।

অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ: তিন ধরনের সহায়তা

যুক্তরাষ্ট্রে ‘ফান্ডিং’ বলতে প্রায়ই এই কয়েকটি ধরন বোঝায়—

১. রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (আরএ): কোনো অধ্যাপকের গবেষণা প্রকল্পে কাজ করার বিনিময়ে টিউশন ছাড় ও মাসিক ভাতা। এই ফান্ড সাধারণত অধ্যাপকের গবেষণা অনুদান থেকে আসে। তাই ভর্তির আগে সংশ্লিষ্ট অধ্যাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করা ও গবেষণার আগ্রহ জানানো কাজে লাগে।

২. টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (টিএ): স্নাতক পর্যায়ের ক্লাসে পাঠদানে সহায়তা, ল্যাব পরিচালনা বা খাতা দেখার মতো কাজ। এর বিনিময়েও টিউশন ছাড় ও ভাতা মিলতে পারে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএ হতে ইংরেজি বলার দক্ষতার আলাদা মূল্যায়ন বা পরীক্ষা থাকে।

৩. গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (জিএ): বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যালয়, লাইব্রেরি বা প্রশাসনিক বিভাগে কাজ। এটি একটি বিস্তৃত শব্দ, কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে আরএ ও টিএকেও জিএ বলা হয়।

সাধারণত এসব পদে সপ্তাহে প্রায় ২০ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিমার একটি অংশও বিশ্ববিদ্যালয় বহন করে। তবে প্রতিষ্ঠানভেদে নিয়ম আলাদা।

কার জন্য ফান্ডিং বেশি বাস্তবসম্মত

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটা বুঝে নিন—

পিএইচডি: অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে, ভর্তি দেওয়ার সময়ই ফান্ডিংয়ের প্রস্তাব থাকে। এতে টিউশন ছাড় এবং মাসিক স্টাইপেন্ড মিলতে পারে।

মাস্টার্স: বেশির ভাগ কোর্সভিত্তিক মাস্টার্সে সম্পূর্ণ ফান্ডিং পাওয়া তুলনামূলক কঠিন। থিসিসভিত্তিক মাস্টার্সে সুযোগ কিছুটা বেশি। অনেকে পড়ার মাঝপথে আরএ বা টিএ পদ জোগাড় করেন, তবে এর নিশ্চয়তা নেই।

তাই মাস্টার্সে আবেদন করছেন এমন কেউ যদি ধরে নেন যে ফান্ডিং পাবেনই, সেটি ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা সব সময় বলি, ফান্ডিং না পেলে কী হবে, সেই পরিকল্পনা আগেই করে রাখুন।

স্টাইপেন্ড কত হতে পারে

বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের ওপর নির্ভর করে স্টাইপেন্ডের পরিমাণ অনেক আলাদা হয়। সাধারণ ধারণা হিসেবে, পিএইচডি স্টাইপেন্ড অনেক জায়গায় বছরে মোটামুটি ২৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার মার্কিন ডলারের মধ্যে থাকে। উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের শহরে বা নামী প্রতিষ্ঠানে তা আরও বেশি হতে পারে। মাস্টার্স পর্যায়ের অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে সাধারণত অঙ্ক কম হয়। এই অঙ্কগুলো ধারণামাত্র, নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের অফার লেটার ও বিভাগের ওয়েবসাইটই চূড়ান্ত তথ্য।

একটি বিষয় খেয়াল রাখবেন। ভালো স্টাইপেন্ড মানেই বেশি সঞ্চয় নয়। যে শহরে ভাড়া বেশি, সেখানে স্টাইপেন্ডের বড় অংশ ভাড়াতেই চলে যায়। তাই স্টাইপেন্ড ও শহরের খরচ পাশাপাশি রেখে তুলনা করুন।

খরচের হিসাব

টিউশন ফি: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে সাধারণত প্রায় ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ডলার। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ৪০ হাজার থেকে ৭০ হাজার ডলার বা তার বেশি হতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয়: বহু বিশ্ববিদ্যালয় বছরে ১২ হাজার থেকে ২৫ হাজার ডলার বা তার বেশি ধরে। নিউইয়র্ক, বোস্টন বা ক্যালিফোর্নিয়ার বড় শহরে বেশি, ছোট বিশ্ববিদ্যালয়-শহরে কম।

অন্যান্য খরচ: আবেদন ফি, পরীক্ষার ফি, ভিসা ও সেভিস ফি, স্বাস্থ্যবিমা, বিমানভাড়া, শুরুর দিকের থাকার অগ্রিম, শীতবস্ত্র ও বই।

ফান্ডিং না থাকলে একজন মাস্টার্স শিক্ষার্থীর বার্ষিক মোট খরচ অনায়াসে ৩৫ থেকে ৮০ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে। সঠিক হিসাবের জন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্ট অব অ্যাটেনডেন্স’ দেখে নিতে হবে।

ভিসা: ২০২৬ সালের নতুন পরিবর্তন জেনে রাখুন

এই বিষয়টি অনেকেই এখনো জানেন না। ২০২৬ সালের ১৭ জুলাই মার্কিন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস) একটি চূড়ান্ত বিধি প্রকাশ করে এফ-ওয়ান শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিনের ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ ব্যবস্থা তুলে দিয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে বেশির ভাগ এফ-ওয়ান শিক্ষার্থী কোর্সের মেয়াদ জুড়ে অনির্দিষ্ট সময়ের বদলে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য প্রবেশের অনুমতি পাবেন। এর ফলে কোর্সের মেয়াদ বাড়ানো, স্কুল বদল, বিষয় পরিবর্তন বা পিএইচডি দীর্ঘায়িত হলে এখন ইউএসসিআইএসে ফি দিয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হতে পারে। ওপিটির সময় ও প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে।

তাই যাঁরা এখন আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি পিএইচডিতে যেতে চান, তাঁরা ভর্তির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কার্যালয়ের (ডিএসও) সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলে নিন। ওপিটি–সংক্রান্ত আরও পরিবর্তনের আলোচনা চলছে বলেও জানা যায়। কর্মজীবনের পরিকল্পনা করার সময় অফিসিয়াল সূত্র থেকে হালনাগাদ তথ্য দেখে নেওয়া জরুরি।

আমাদের পরামর্শ

১. আবেদন শুরু করুন কমপক্ষে ৮ থেকে ১২ মাস আগে।

২. মাস্টার্স হলে ফান্ডিংয়ের সম্ভাবনা আছে এমন বিভাগ খুঁজুন, আর পিএইচডি হলে অধ্যাপকের গবেষণার সঙ্গে নিজের আগ্রহ মেলান।

৩. একটি বা দুটি ‘স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়’, কয়েকটি মাঝারি এবং কয়েকটি নিরাপদ বিকল্প—এভাবে তালিকা সাজান।

৪. ফান্ডিং না পেলে বিকল্প খরচের উৎস কী, তা আগে থেকে ঠিক করে রাখুন।

৫. যিনি ফান্ডিং বা ভিসার ‘শতভাগ নিশ্চয়তা’ দেন, তাঁর থেকে সাবধান থাকুন।

সিএইচএস এডুকেশনে আমরা যেভাবে সাহায্য করি

আমরা শিক্ষার্থীর একাডেমিক প্রোফাইল, লক্ষ্য ও বাজেট বুঝে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগ নির্বাচন, আবেদন প্রস্তুতি, ফান্ডিংয়ের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং ভিসা সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতিতে পাশে থাকি। ভর্তি ও ভিসার সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও দূতাবাসের, তবে প্রস্তুতিটা যেন সুচিন্তিত হয়, সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের কাজ।

লেখক: নাজমুল হাসান রাজু, উচ্চশিক্ষা পরামর্শক; সিইও, সিএইচএস এডুকেশন লিমিটেড