মডেল: আনিকা অনিন্দিতা ও অচিব রেজা
মডেল: আনিকা অনিন্দিতা ও অচিব রেজা

শিক্ষায় ৫% জিডিপি: নতুন দিনের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

এ বছর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ইশতেহারে একটি বড় চমক ছিল শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি। এটি নিঃসন্দেহে একটি উচ্চাভিলাষী অঙ্গীকার। তবে আমরা যাঁরা শিক্ষানুরাগী, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই এমন উদ্যোগ প্রত্যাশা করে আসছি। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তব অর্থে ঢেলে সাজাতে হলে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি বিষয়টি উপলব্ধি করেছে বলেই তাদের ইশতেহারে এমন প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা গেছে।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশের কম। এর ফলে শিক্ষা ও গবেষণা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নতমানের ল্যাবরেটরি গড়ে ওঠেনি; মৌলিক গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন পাওয়া যায়নি। ফলে বিদেশ থেকে উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে ফেরা অনেক শিক্ষকও প্রয়োজনীয় গবেষণা অবকাঠামোর অভাবে মানসম্পন্ন গবেষণা প্রকাশে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমরা এমন একজন প্রধানমন্ত্রী পাচ্ছি, যিনি দীর্ঘ সময় লন্ডনে অবস্থান করেছেন এবং ইউরোপের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষায় কীভাবে জোর দেওয়া হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে অর্থায়ন পায়, অবকাঠামো, পাঠদান ও গবেষণা কতটা আধুনিক—এসব বিষয়ে তাঁর প্রত্যক্ষ জ্ঞান রয়েছে। আশা করছি, সেই জ্ঞানের বাস্তব প্রতিফলন নীতিনির্ধারণে ঘটবে।

বাংলাদেশের প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিক স্তরে শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে, ভাষা ও মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি থেকে গেলে, তাদের পক্ষে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হলে গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন অপরিহার্য। তৃণমূলের শিক্ষাকে শহুরে শিক্ষার সমপর্যায়ে নিয়ে আসতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা ৫ শতাংশ বরাদ্দের মতো প্রতিশ্রুতিকে যৌক্তিক করে তোলে।

মডেল: গোধূলি ও রনি

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো বিশ্বমানের নয়। মৌলিক গবেষণার জন্য যে পরিমাণ অর্থ ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ দরকার, তা আমাদের নেই। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের আমলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যূনতম অবকাঠামো, শিক্ষার্থী–শিক্ষক আবাসন কিংবা পর্যাপ্ত গবেষণা সুবিধা নেই। ভাড়া করা ভবনে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার মতো বাস্তবতাও দেখা গেছে। তাই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের চেয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো ও গবেষণা সক্ষমতা উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া অধিক যুক্তিসংগত হবে।

ব্রেইন ড্রেইন রোধ করতে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং প্রতিযোগিতামূলক বেতনের ব্যবস্থা করা জরুরি। বিদেশে কর্মরত মেধাবী বিজ্ঞানীদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেন বাধ্য হয়ে বিদেশমুখী না হয়, সে পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।

কারিগরি শিক্ষার প্রসার এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, তা বিবেচনায় রেখে কারিগরি শিক্ষার কারিকুলাম প্রণয়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সফট স্কিল উন্নয়নেও জোর দিতে হবে। এতে বেকারত্ব হ্রাসের পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সব স্তরে শিক্ষকদের বেতন তুলনামূলকভাবে কম—বিশেষ করে সার্কভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় তা অপ্রতুল। শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা না বাড়ালে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে অনাগ্রহী থাকবে। ইউরোপে শিক্ষকদের যেভাবে মূল্যায়ন করা হয়, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি টেকসই বেতন ও প্রণোদনা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সার্বিকভাবে বলা যায়, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। তবে প্রতিশ্রুতির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়ন। আগামী বাজেট ও নীতিমালার মাধ্যমে বোঝা যাবে এ অঙ্গীকার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়। সঠিক পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব।

লেখক: অধ্যাপক মো. ফজলুল করিম, বিজিই বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল।