
ইংরেজি বিষয়ে ক্লাস নেন ৬৪ হাজার ২৫৩ শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ৯ হাজার ৯৮২ জন স্নাতক পাস হলেও স্নাতকে ইংরেজি বিষয় ছিল না।
গণিত পড়ান ৬৭ হাজার ৬৯৭ শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জনের স্নাতকে গণিত বিষয় ছিল না।
দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ানো ৯ হাজার ৯৮২ শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয় ছিল না। গণিতেও একই পরিস্থিতি। গণিত পড়ানো শিক্ষকদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জনের স্নাতকে গণিত নেই। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান–২০২৫’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে দেখা গেছে, ২০ হাজারের বেশি শিক্ষক স্নাতকে অন্য বিষয়ে পড়লেও ক্লাস নিচ্ছেন ইংরেজি ও গণিতে।
শুধু বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা নয়, শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণেও রয়েছে বড় ঘাটতি। মাধ্যমিক স্তরে কর্মরত শিক্ষকদের প্রায় ৪০ শতাংশের বিএড, এমএড, বিপিএডের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই।
শিক্ষক ও শিক্ষাবিদেরা বলছেন, মাধ্যমিকে শিক্ষক নিয়োগ বিষয়ভিত্তিক; কিন্তু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদেরও ইংরেজি ও গণিতের ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে বিদ্যালয়ে যথাযথভাবে পড়াশোনা হয় না। শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় পাসের প্রস্তুতি নিতে বিদ্যালয়ের বাইরেও অর্থ খরচ করে কোচিং ও প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে।
মাধ্যমিকে প্রায় ৪০% শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই। শিক্ষক–শিক্ষাবিদদের মতে, এতে প্রভাব পড়ছে পাঠদানের মানে।
ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে সরকারি–বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান, ভৌতবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের সংখ্যাগত তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ক্লাস নেওয়া শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার চিত্র আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল প্রথম আলোকে বলেন, শুধু পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের ঘাটতি নয়, বিদ্যালয়গুলোতে সার্বিকভাবেই শিক্ষকসংকট রয়েছে। তাই দ্রুত কীভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ বলেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গণিত শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে ‘খান একাডেমি বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে শিক্ষা বিষয়ে ডিগ্রিধারীরা যাতে প্রাথমিক ও মাধমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন, সে ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইংরেজি-গণিতে শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতি
ব্যানবেইসের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিকে ইংরেজিতে ক্লাস নেন ৬৪ হাজার ২৫৩ শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ৯ হাজার ৯৮২ জন স্নাতক। যদিও স্নাতকে তাঁদের ইংরেজি বিষয় ছিল না। এ ছাড়া এইচএসসি পাস শিক্ষক আছেন ৪ হাজার ২১২ জন। বাকি প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষকের ইংরেজি বিষয়সহ স্নাতক, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে।
গণিত পড়ানো শিক্ষক আছেন ৬৭ হাজার ৬৯৭ জন। তাঁদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জন স্নাতক (পাস) হলেও তাঁরা গণিত বিষয়ে পড়েননি। অর্থাৎ স্নাতকে গণিত বিষয় ছিল না। প্রায় ২৯ হাজার শিক্ষক স্নাতক বা স্নাতকোত্তরে গণিত পড়েছেন। বাকিদের মধ্যে ডিগ্রি ও উচ্চমাধ্যমিকে গণিত না পড়া শিক্ষক যেমন আছেন, আবার শুধু উচ্চমাধ্যমিকে গণিত পড়েছেন, এমন শিক্ষকও আছেন।
মাধ্যমিকে শিক্ষক হতে হলে কমপক্ষে স্নাতক পাস হতে হয়। ব্যানবেইসের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিজেদের মতো অস্থায়ীভাবে কিছুসংখ্যক শিক্ষক নেন, তাঁদের মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক পাস শিক্ষকও আছেন।
গণিত পড়ানো শিক্ষক আছেন ৬৭ হাজার ৬৯৭ জন। তাঁদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জন স্নাতক (পাস) হলেও তাঁরা গণিত বিষয়ে পড়েননি। অর্থাৎ স্নাতকে গণিত বিষয় ছিল না। প্রায় ২৯ হাজার শিক্ষক স্নাতক বা স্নাতকোত্তরে গণিত পড়েছেন। বাকিদের মধ্যে ডিগ্রি ও উচ্চমাধ্যমিকে গণিত না পড়া শিক্ষক যেমন আছেন, আবার শুধু উচ্চমাধ্যমিকে গণিত পড়েছেন, এমন শিক্ষকও আছেন।
শিক্ষকসংকটের কারণে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিজেদের বিষয় ছাড়াও অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে। প্রায় ১৯০ বছরের পুরোনো ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে দুই পালায় (শিফট) পাঠদান হয়। বিদ্যালয়টিতে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক থাকার কথা আটজন; কিন্তু কর্মরত আছেন চারজন। গণিত বিষয়ে শিক্ষক থাকার কথা ছয়জন, আছেন চারজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, গণিত বিষয়ের ক্লাসগুলো ভৌতবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষকেরা সমন্বয় করে পাঠদান করেন। সামাজিক বিজ্ঞান ও ধর্ম বিষয়ের শিক্ষকদেরও ইংরেজি পড়াতে হচ্ছে।
ঢাকার বাইরের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ৪৮৬ ছাত্রী পড়াশোনা করছে; কিন্তু শিক্ষক আছেন মাত্র দুজন। বর্তমানে কর্মরত সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক) মো. ওমর ফারুক এবং ইসলাম শিক্ষার সহকারী শিক্ষক জুলহাস সুজন। ফলে প্রয়োজনীয় পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, এ রকম পরিস্থিতিতে অস্থায়ীভাবে ছয়জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়েছেন।
মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল ভিত্তির প্রভাব পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও পড়ে। উচ্চশিক্ষায় গিয়েও অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজিতে সাধারণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ে।
ইংরেজি-গণিতে দুর্বলতার প্রভাব পরীক্ষার ফলাফলেও
শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণেও ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার চিত্র দেখা যায়। এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে কমেছে প্রায় ১৯ হাজার।
কুমিল্লা ছাড়া আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে। গণিতেও কয়েকটি বোর্ডে ফল তুলনামূলক ভালো হয়নি। ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে এ বছরের এসএসসিতে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ। সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ। এমনকি এ বছর পাসের হারে শীর্ষে থাকা ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৮ শতাংশের কিছু বেশি, যা গত বছর ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ। দুটি বিষয়ই বাধ্যতামূলক হওয়ায় এগুলোতে অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব পড়েছে সার্বিক পাসের হারে।
মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল ভিত্তির প্রভাব পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও পড়ে। উচ্চশিক্ষায় গিয়েও অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজিতে সাধারণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ে।
প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই
ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে ১৬ হাজার ৭৩৭টি। শিক্ষক আছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৭ জন। তাঁদের প্রায় ৬৫ শতাংশ বিএড (ব্যাচেলর অব এডুকেশন), এমএড (মাস্টার্স অব এডুকেশন), বিপিএডের (ব্যাচেলর অব ফিজিক্যাল এডুকেশন) মতো পেশাগত বিষয়ে প্রশিক্ষিত। অর্থাৎ প্রায় ৩৫ শতাংশ শিক্ষকের এ ধরনের প্রশিক্ষণ নেই।
২ হাজার ৪৭৪টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি) শিক্ষক আছেন ২৫ হাজারের বেশি। তাঁদের মধ্যে পেশাগত বিষয়ে প্রশিক্ষিত মাত্র ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ শিক্ষক।
স্কুল অ্যান্ড কলেজে মাধ্যমিক স্তর রয়েছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান আছে ১ হাজার ৫৫৬টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক আছেন ৩৫ হাজারের বেশি। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
শিক্ষক হওয়ার জন্য চাকরিতে যোগদানের আগেই পেশাগত প্রশিক্ষণ ও সনদব্যবস্থা থাকা জরুরি। এখন হয়তো স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করে শিক্ষক হয়ে প্রাথমিক ধারণা নিয়ে ক্লাস শুরু করা হয়; কিন্তু পড়ানোর মতো সামর্থ্য অর্জনের জন্য পেশাগত প্রশিক্ষণ জরুরি। একই সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান
সব মিলিয়ে মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের এ ধরনের প্রশিক্ষণ নেই। বর্তমানে সারা দেশে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী আছে ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষক হওয়ার জন্য চাকরিতে যোগদানের আগেই পেশাগত প্রশিক্ষণ ও সনদব্যবস্থা থাকা জরুরি। এখন হয়তো স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করে শিক্ষক হয়ে প্রাথমিক ধারণা নিয়ে ক্লাস শুরু করা হয়; কিন্তু পড়ানোর মতো সামর্থ্য অর্জনের জন্য পেশাগত প্রশিক্ষণ জরুরি। একই সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।