মাধ্যমিক শিক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সুপারিশ করেছে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত পরামর্শক কমিটি। মাধ্যমিকে সব বিষয়ের পরিবর্তে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজপাঠ ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক দক্ষতা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা সীমিত রাখা এবং অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা (জেএসসি) ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা বাদ রাখার কথা সুপারিশে রয়েছে।
এ ছাড়া এখনকার মতো নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা ইত্যাদি শাখায় বিভাজন না করে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে অভিন্ন শিক্ষাক্রমের আলোকে পড়ানো এবং একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে শাখায় বিভাজন করারও সুপারিশ করা হয়েছে। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে সর্বজনীন করাসহ ১২০টির মতো সুপারিশ করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদের নেতৃত্বাধীন পরামর্শক কমিটি।
জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ কর্মদিবসে গতকাল মঙ্গলবার শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আবরারের (সি আর আবরার) কাছে কমিটি সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেন কমিটিপ্রধান মনজুর আহমদসহ অন্য সদস্যরা। কমিটির পক্ষ থেকে আশা করা হয়েছে, নির্বাচিত সরকার এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেবে।
এখনকার মতো নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা ইত্যাদি শাখায় বিভাজন না করে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে অভিন্ন শিক্ষাক্রমের আলোকে পড়ানো এবং একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে শাখায় বিভাজন করারও সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন জমা নিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ভবিষ্যতে সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা এই রূপরেখার আলোকে একটি শক্তিশালী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষা কেবল পাঠ্যজ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র নয়, এটি কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সংবেদনশীল সময়। তাই এই স্তরে বৈষম্য নিরসন ও শিক্ষার মানোন্নয়ন অপরিহার্য।
গত বছরের অক্টোবরে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিখন-শেখানো কার্যক্রমের উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ ও মাধ্যমিক শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য আশু, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ করেছে কমিটি। কমিটি দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪৪টি কর্মশালা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষা কেবল পাঠ্যজ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র নয়, এটি কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সংবেদনশীল সময়। তাই এই স্তরে বৈষম্য নিরসন ও শিক্ষার মানোন্নয়ন অপরিহার্য।
কমিটির প্রতিবেদনে শিক্ষণ-শিখনপ্রক্রিয়া এবং শিক্ষার্থী মূল্যায়ন বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে বর্তমান পাঠ্য বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ভাষা (বাংলা ও ইংরেজি), গণিত, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা তৈরিকে ভিত্তিমূলক দক্ষতা হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে বলেছে কমিটি। দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবিভাজিত শিক্ষাক্রমের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কমিটি বলেছে, নবম শ্রেণি থেকে বিদ্যালয় শিক্ষাকে বিভিন্ন ধারায় (বিজ্ঞান-মানবিক-ব্যবসায় শিক্ষা) বিভাজিত করার সিদ্ধান্ত সুবিবেচিত হয়নি। এই বিভাজন একাদশ শ্রেণি থেকে হওয়া বাঞ্ছনীয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাদ দেওয়া নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা ইত্যাদি শাখা বিভাজন তুলে দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় সিদ্ধান্ত হয়েছিল একাদশ শ্রেণিতে শাখা বিভাজন হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার নতুন শিক্ষাক্রমের এ বিষয়সহ অনেক কিছু বাদ দিয়ে আবারও মাধ্যমিকে বিভাজন চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম ফিরিয়ে আনা হয়। ফলে এখন পর্যন্ত নবম শ্রেণিতে শাখা বিভাজন হচ্ছে, যা এখন পরামর্শক কমিটি ভিন্নমত দিল।
মাধ্যমিক স্তরে বর্তমান পাঠ্য বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ভাষা (বাংলা ও ইংরেজি), গণিত, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা তৈরিকে ভিত্তিমূলক দক্ষতা হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে বলেছে কমিটি। দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবিভাজিত শিক্ষাক্রমের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কমিটি বলেছে, নবম শ্রেণি থেকে বিদ্যালয় শিক্ষাকে বিভিন্ন ধারায় (বিজ্ঞান-মানবিক-ব্যবসায় শিক্ষা) বিভাজিত করার সিদ্ধান্ত সুবিবেচিত হয়নি। এই বিভাজন একাদশ শ্রেণি থেকে হওয়া বাঞ্ছনীয়।
পরামর্শক কমিটি বলেছে, পাবলিক পরীক্ষা মূল দক্ষতার বিষয়গুলোতে (বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সমাজপাঠ ও বিজ্ঞানে) সীমিত থাকবে। এসব বিষয়ে প্রশ্ন দক্ষতাভিত্তিক ও প্রয়োগমুখী হবে। আর বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন প্রধানত হবে পাঠ্যপুস্তক ও পাঠ্যবিষয়ভিত্তিক।
অষ্টম শ্রেণিতে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট জেএসসি পরীক্ষা ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা আগেই বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু সদ্য শেষ হওয়া বছরে শিক্ষাবিদদের মতামত উপেক্ষা করে হঠাৎ জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা চালু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থী এ পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়। শিক্ষাবিদেরা বলছেন, এমন বৃত্তি পরীক্ষা একদিকে যেমন শিক্ষার্থীর ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, অন্যদিকে বৈষম্যও বাড়ে। কোচিং-প্রাইভেট পড়ার প্রবণতাও বাড়ে। কমিটি অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা বাতিল রাখার পক্ষে মত দিয়ে বলেছে, জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার প্রয়োজন নেই।
বর্তমানে দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমে শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় জানুয়ারিতে, শেষ হয় ডিসেম্বরে। পরামর্শক কমিটি সেপ্টেম্বর থেকে জুন বা কাছাকাছি সময়ে শিক্ষাবর্ষ নির্ধারণ করার সুপারিশ করেছে। এ ক্ষেত্রে জুলাই-আগস্ট মাসে বার্ষিক গ্রীষ্মের ছুটি হতে পারে।
সামগ্রিক বিদ্যালয় শিক্ষা উন্নয়নে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয় শিক্ষাকে সর্বজনীন করে তা দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নের কথা বলেছে কমিটি। এ ছাড়া সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং পৃথক শিক্ষা অধিকার আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিদ্যালয় শিক্ষাকে আদালতে বলবৎযোগ্য অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
শিক্ষাবিদেরা বলছেন, এমন বৃত্তি পরীক্ষা একদিকে যেমন শিক্ষার্থীর ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, অন্যদিকে বৈষম্যও বাড়ে। কোচিং-প্রাইভেট পড়ার প্রবণতাও বাড়ে। কমিটি অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা বাতিল রাখার পক্ষে মত দিয়ে বলেছে, জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার প্রয়োজন নেই।
কমিটি প্রতিবেদনের শেষে বলেছে, বর্তমান প্রতিবেদনের সুপারিশ শিক্ষা সংস্কারের শেষ কথা নয়। আসল কথা, শিক্ষার সংস্কার ও উন্নয়ন অবহেলিত হয়ে এসেছে। এ অবহেলার অবসান ঘটাতে হবে। সামগ্রিক সংস্কারপ্রক্রিয়ার সূচনা হতে হবে।