লিপইয়ার কি সত্যিই চার বছর পরপর আসে

তুমি নিশ্চয়ই জানো, চার বছর পরপর একটা লিপইয়ার আসে, আর ফেব্রুয়ারি মাসে ২৯ দিন হয়। ছোটবেলা থেকে এই নিয়ম আমরা মুখস্থ করে ফেলেছি। ৪ দিয়ে ভাগ করা যায় মানেই লিপইয়ার। ২০২০, ২০২৪, ২০২৮ সব ঠিকঠাক মিলে যাচ্ছে।

কিন্তু একটা প্রশ্ন করি। ১৯০০ সাল কি লিপইয়ার ছিল? ১৯০০-কে ৪ দিয়ে ভাগ করলে ৪৭৫ পাওয়া যায়, নিঃশেষে ভাগ হয়ে যায়। তাহলে তো ১৯০০ লিপইয়ার হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ১৯০০ সালে ফেব্রুয়ারিতে ২৮ দিনই ছিল! অথচ ২০০০ সাল, যেটাও ৪ দিয়ে ভাগ করা যায়, সেটা ঠিকই লিপইয়ার ছিল। তাহলে নিয়মটা কী দাঁড়াল? আসল নিয়ম হলো:

∎ কোনো বছর ৪ দিয়ে ভাগ করা গেলে, সেটা সাধারণত লিপইয়ার।

∎ কিন্তু যদি সেই বছর ১০০ দিয়েও ভাগ করা যায়, তাহলে সেটা লিপইয়ার নয়—যদি না সেটা আবার ৪০০ দিয়েও ভাগ করা যায়।

তার মানে, ১৯০০ (১০০ দিয়ে ভাগ যায়, কিন্তু ৪০০ দিয়ে যায় না) লিপইয়ার নয়। কিন্তু ২০০০ (৪০০ দিয়ে ভাগ করা যায়) ঠিকই লিপইয়ার। এই ‘শতাব্দী ব্যতিক্রম’ নিয়মটার কথা আমরা কজনই–বা খেয়াল করি?

কেন এই ঝামেলা?

আসল রহস্যটা লুকিয়ে আছে একটা সংখ্যায়—পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ঠিক কত সময় নেয়, তার মধ্যে। আমরা স্কুলে শিখি, এক বছর মানে ৩৬৫ দিন। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় প্রায় ৩৬৫.২৪২২ দিন। অর্থাৎ ৩৬৫ দিনের চেয়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড বেশি।

আমরা যদি প্রতিবছর এই বাড়তি সময়টুকু হিসাব থেকে বাদ দিই, তাহলে কী হবে? চার বছরে এই বাড়তি সময় জমে হয় প্রায় ২৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। এক দিনের কাছাকাছি। তাই চার বছর পরপর ফেব্রুয়ারিতে একটা গোটা বাড়তি দিন (২৯ তারিখ) জুড়ে দেওয়া হয়। খেয়াল করো, ঘাটতি ছিল ২৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের, আর আমরা পুষিয়ে দিচ্ছি পুরো ২৪ ঘণ্টা দিয়ে। এই বাড়তি ৪৫ মিনিটই পরের সব ঝামেলার গোড়া। এটাই সবচেয়ে সহজ ও পরিচিত নিয়ম।

কিন্তু এখানেই একটা সূক্ষ্ম হিসাবের গন্ডগোল থেকে যায়। চার বছরে এক দিন যোগ করার অর্থ হলো, আমরা গড়ে প্রতিবছর, ১ ÷ ৪ = ০.২৫ দিন যোগ করছি। ফলে আমাদের ক্যালেন্ডারের গড় বছর দাঁড়ায় ৩৬৫.২৫ দিন। কিন্তু প্রকৃত ক্রান্তীয় বছর (tropical year—এক ঋতুচক্র শেষ হয়ে আবার একই ঋতুতে ফিরে আসতে যত সময় লাগে) প্রায় ৩৬৫.২৪২২ দিন। অর্থাৎ আমরা প্রতিবছর প্রায়,

৩৬৫.২৫-৩৬৫.২৪২২ = ০.০০৭৮ দিন বেশি ধরে নিচ্ছি।

সংখ্যাটা দেখতে খুবই ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে, তা–ই না? কিন্তু এই ছোট্ট পার্থক্যই বছরের পর বছর জমতে জমতে বড় হয়ে ওঠে। হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতি ১২৮ বছরে এই পার্থক্য জমে প্রায় ১ পূর্ণ দিনে পরিণত হয়। তার মানে, যদি আমরা শুধু ‘৪ দিয়ে ভাগ করা গেলেই লিপইয়ার’ নিয়মে, অর্থাৎ জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে চলতাম, তাহলে প্রতি ১২৮ বছরে ক্যালেন্ডার সূর্যের প্রকৃত অবস্থান থেকে ১ দিন এগিয়ে যেত। প্রায় ২৩ হাজার বছর পর দেখা যেত, ক্যালেন্ডারে যেটা জুন মাস, বাস্তবে সেটা আসলে ডিসেম্বর মাস!

এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই ১৫৮২ সালে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি একটা সংশোধনী আনেন, যাকে আমরা এখন বলি Gregorian Calendar। এই সংশোধনীতে ঠিক করা হলো, প্রতি ৪০০ বছরে যে ১০০টা লিপইয়ার হওয়ার কথা (৪০০ ÷ ৪ = ১০০), তার মধ্যে থেকে তিনটা লিপইয়ার বাদ দিতে হবে। আর সেই তিনটা বাদ দেওয়ার নিয়মই হলো: শতবর্ষী বছরগুলো (১০০ দিয়ে ভাগ যায় এমন) সাধারণত লিপইয়ার হবে না, শুধু ৪০০ দিয়ে ভাগ করা গেলে হবে।

এভাবে ১৭০০, ১৮০০ আর ১৯০০ বাদ পড়ে, কিন্তু ২০০০ টিকে যায়। ফলে প্রতি ৪০০ বছরে লিপইয়ারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০০-৩ = ৯৭টি। তাহলে গড় বছরের দৈর্ঘ্য হয়,

৩৬৫ + ৯৭/৪০০ = ৩৬৫.২৪২৫ দিন আর প্রকৃত ক্রান্তীয় বছর হলো ৩৬৫.২৪২২ দিন। পার্থক্য মাত্র ০.০০০৩ দিন। অর্থাৎ প্রায় ২৬ সেকেন্ড! এই সামান্য পার্থক্য জমতে জমতে ১ দিন পূর্ণ হতে সময় লাগবে প্রায় ৩,৩০০ বছর। অর্থাৎ আমরা যদি আজ থেকে ৩,৩০০ বছর পরও এই ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি, তাহলেও মাত্র ১ দিনের গরমিল হবে!

তাহলে দেখা যাচ্ছে, ছোট্ট একটা ‘ব্যতিক্রম’ নিয়ম, যেটা আমরা কখনো প্রশ্নই করি না, আসলে হাজার হাজার বছরের গাণিতিক হিসাবের ফসল। ২০০০ সাল লিপইয়ার হওয়া বা ১৯০০ সাল না হওয়া নেহাত কাকতালীয় কিছু নয়; বরং পৃথিবীর কক্ষপথের সঙ্গে আমাদের ক্যালেন্ডারকে যতটা সম্ভব নিখুঁতভাবে মিলিয়ে রাখার একটা সচেতন গাণিতিক কৌশল।

মজার কথা হলো, ২১০০ সাল আসছে। আর সেটা ১০০ দিয়ে ভাগ করা গেলেও ৪০০ দিয়ে ভাগ করা যাবে না। তাই ২১০০ সালে লিপইয়ার হবে না! যারা তখন বেঁচে থাকবে, তারা হয়তো অবাক হয়ে ভাববে, ‘৪ দিয়ে তো ভাগ করা যাচ্ছে, তাহলে লিপইয়ার নয় কেন?’ আর তখনই তারাও হয়তো বুঝবে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি সাধারণ নিয়মও আসলে প্রকৃতির সঙ্গে গণিতের দীর্ঘ এক সমঝোতার ফল।

সহযোগিতায়: বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি