যখন ১ আর ০ মিলেমিশে একাকার!

ধরে নাও, তোমার এক বন্ধু তোমাকে একটি অদ্ভুত অফার দিল। প্রথম সেকেন্ডে ১ টাকা দিল, পরের সেকেন্ডেই আবার কেড়ে নিল। এভাবে ‘দেওয়া-নেওয়ার’ খেলা যদি কখনো শেষ না হয়ে অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে, তবে শেষ পর্যন্ত তোমার কাছে কত টাকা থাকবে?

একটু ভেবে বলো তো? কেউ বলবে, ‘প্রথমে ১ টাকা পেলাম, পরক্ষণেই চলে গেল, হাত তো খালি—অর্থাৎ ০ টাকা থাকবে।’ আবার কেউ যুক্তি দেবে, ‘খেলাটা যদি টাকা পাওয়ার ঠিক পরপরই থেমে যায়, তাহলে তো ১ টাকা থাকবে।’

মজার ব্যাপার হলো, ইতালিয়ান গণিতবিদ লুইজি গুইডো গ্র্যান্ডি ১৭০৩ সালে এই সহজ দেখতে ধাঁধাটি নিয়ে মাথা ঘামিয়েছিলেন। গণিতের ভাষায় একে একটি ধারা হিসেবে লেখা যায়:

S = 1 - 1 + 1 - 1 + 1 - 1 + …

একটু চালাকি করে ব্র্যাকেট বসালে কী ঘটে দেখো। জোড়ায় জোড়ায় সাজালে—

S = (1 - 1) + (1 - 1) + (1 - 1) + … = 0

উত্তর এল শূন্য! এবার প্রথম ১-কে আলাদা রেখে বাকিদের জোড়া বানালে—

S = 1 - (1 - 1) - (1 - 1) - … = 1

উত্তর চলে এল ১! একই অঙ্ক, কিন্তু ব্র্যাকেটের সামান্য হেরফেরে উত্তর একবার ০, আরেকবার ১। এখানেই শেষ নয়, গ্র্যান্ডি সাহেব আরও এক কাঠি বাড়িয়ে দেখিয়েছিলেন যে এর উত্তর নাকি ১/২ বা অর্ধেকও হতে পারে (যদিও সেটি একটু ভিন্ন উচ্চতর গণিতের হিসাব)! অথচ বাস্তব জীবনে তোমার পকেটে একই সঙ্গে ১ আর ০ টাকা থাকা অসম্ভব, তাই না?

তাহলে গণিতের মতো নিখুঁত বিষয়ে এমন গোলমাল কেন? ভুলটা কোথায়?

আসলে ভুল আমাদের হিসাবে নয়, ভুল অসীমের ধারণায়। আমরা সাধারণত ২, ৫ বা ১০০-র মতো সসীম সংখ্যা যেভাবে যোগ-বিয়োগ করি, অসীমের বেলাতেও ঠিক একই নিয়ম খাটাতে চেয়েছি। কিন্তু অসীম কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। যে ধারার পদগুলো নির্দিষ্ট কোনো উত্তরের দিকে না গিয়ে ০ আর ১-এর মধ্যে দুলতে থাকে, তাকে বলা হয় ডাইভারজেন্ট বা অপসারী ধারা, যার কোনো নির্দিষ্ট যোগফল নেই!

গ্র্যান্ডি কীভাবে ১/২ বের করেছিলেন? তিনি বীজগণিতের একটি সাধারণ কৌশল ব্যবহার করেছিলেন।

ধরো, আমাদের ধারা S। এবার 1 থেকে পুরো ধারাটি বিয়োগ করলে, অর্থাৎ 1 - S লিখলে পাওয়া যায়—

1 - (1 - 1 + 1 - 1 + …) = 1 - 1 + 1 - 1 + … = S

খেয়াল করো, ডান পাশের অংশটি আমাদের মূল ধারা S ছাড়া আর কিছুই নয়! সুতরাং,

1 - S = S

⇒ 2S = 1

∴ S = 1/2

বাস্তব বিচারে এই উত্তর যতই অদ্ভুত শোনাক, দর্শনে এই যুক্তি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। গ্র্যান্ডি নিজে ধর্মতত্ত্ববিদও ছিলেন, তাই দাবি করেছিলেন—শূন্য থেকে সৃষ্টিকর্তার মহাবিশ্ব সৃষ্টির যেন এক গাণিতিক প্রমাণ এই ধারা! কারণ এখানে ০ আর ১-এর টানাটানিতে শেষ পর্যন্ত ১/২-এর মতো একটি মধ্যবর্তী মান ভেসে ওঠে, যা শূন্য আর একের মাঝে সেতু তৈরি করে।

ইতিহাসের পাতায় চোখ বোলালে দেখা যায়, কেবল গ্র্যান্ডি নন, বিখ্যাত গণিতবিদ আইজ্যাক নিউটন, গটফ্রিড লিবনিজ এবং পরবর্তী সময়ে লেওনার্ড অয়লারের মতো মানুষও এই ধারা নিয়ে গবেষণা করেছেন। লিবনিজ সম্ভাবনার যুক্তিতে ১/২-কেই সমর্থন করেছিলেন—যেহেতু উত্তর ০ বা ১ হওয়ার সম্ভাবনা সমান ৫০ শতাংশ, তাই তাদের গড়কেই সবচেয়ে যৌক্তিক উত্তর ধরা উচিত।

তবে আধুনিক গণিতে অসীমের হিসাব আরও সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল। উনিশ শতকে ওগ্যুস্তাঁ-লুই কোশি ও নিলস হেনরিক আবেলের মতো গণিতবিদেরা ধারার সংজ্ঞা নতুনভাবে দাঁড় করান। তাঁরা জানান, সাধারণ যোগের নিয়ম অসীম ধারায় অন্ধভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। কোনো ধারার আংশিক যোগফল নির্দিষ্ট সংখ্যার দিকে অগ্রসর হলে তবেই তাকে কনভারজেন্ট বা অভিসারী ধারা বলা যাবে, আর কেবল তখনই তার প্রকৃত যোগফল সম্ভব। কিন্তু গ্র্যান্ডির ধারার আংশিক যোগফল 1, 0, 1, 0... এভাবে অনন্তকাল ধরে লাফাতে থাকে, কখনো স্থির হয় না। তাই আধুনিক গণিতের চোখে এটি সম্পূর্ণ অসংজ্ঞায়িত ও অপসারী ধারা।

তাহলে কি এই ধারার কোনো গুরুত্বই নেই? একেবারেই তা নয়। কোয়ান্টাম ফিজিকস, স্ট্রিং থিওরি বা সিগন্যাল প্রসেসিংয়ের মতো জটিল ক্ষেত্রে যখন সাধারণ নিয়মে অসীম চলে আসে ও হিসাব আটকে যায়, তখন এই অপসারী ধারাগুলোকে বিশেষ পদ্ধতিতে সামাল দেওয়া হয়, একে বলা হয় সেসারো সামেশন বা আবেল সামেশন। এই পদ্ধতিতে গ্র্যান্ডির ধারার মান সত্যিই ১/২ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, যা পদার্থবিজ্ঞানের অনেক জটিল সমস্যার সমাধান দেয়।

সুতরাং, ১ আর ০-এর এই সহজ খেলাটি কেবল একটি মজার ধাঁধা নয়; এটি আমাদের শেখায় যে অসীম কোনো সাধারণ গন্তব্য নয়, বরং এটি এক পরম রহস্যময় সফর। আমরা যখনই আমাদের চেনা নিয়মগুলোকে অসীমের ক্যানভাসে চাপিয়ে দিতে যাব, তখনই গণিত আমাদের চমকে দিয়ে নতুন কোনো সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে।