
বিয়েবাড়িতে গান গেয়ে কখনো পেয়েছেন ৫০০ রুপি, কখনো জুটেছে শুধু পান। সেই অনিরুদ্ধ রবিচন্দরই এখন ভারতের সবচেয়ে আলোচিত সুরকারদের একজন। রজনীকান্ত, বিজয় থেকে শাহরুখ খান—দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর সুর ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ভারতে।
আজ ১৬ অক্টোবর অনিরুদ্ধের জন্মদিন। ১৯৯০ সালের এই দিনে চেন্নাইয়ে জন্ম নেওয়া এই সংগীত পরিচালক আজ ৩৬ বছরে পা দিলেন।
বিয়েবাড়িতে ৫০০ রুপির গান
আজকের অনিরুদ্ধকে দেখে শুরুর দিনগুলোর কথা কল্পনা করা কঠিন। অথচ নিজের সংগীতজীবনের শুরুর সময়ের স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, বিয়েবাড়িতে গান গেয়ে কখনো পেয়েছেন ৫০০ রুপি, কখনো আবার পারিশ্রমিকের বদলে শুধু পান পেয়েছেন। অর্থের চেয়ে তখন বড় ছিল গান গাওয়ার আনন্দ, মঞ্চে ওঠার উত্তেজনা আর মানুষের সামনে নিজের সংগীত তুলে ধরার সুযোগ।
অবশ্য অনিরুদ্ধের পথচলাকে একেবারে শূন্য থেকে উঠে আসার গল্প বললে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। তাঁর পরিবার বিনোদনজগতের সঙ্গে যুক্ত। বাবা রবি রাঘবেন্দ্র অভিনেতা, আর সুপারস্টার রজনীকান্ত তাঁর মামা। ফলে চলচ্চিত্র ও বিনোদনের জগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তাঁর ছিল। কিন্তু সেই পরিচিত পরিবেশে বেড়ে ওঠা আর নিজের সংগীত দিয়ে আলাদা জায়গা তৈরি করা এক বিষয় নয়। অনিরুদ্ধকে নিজের প্রতিভা দিয়েই শ্রোতাদের মন জয় করতে হয়েছে।
‘কোলাভেরি ডি’ যে গান বদলে দিল জীবন
অনিরুদ্ধের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া গান ‘হোয়াই দিস কোলাভেরি ডি’। ধনুশ অভিনীত তামিল সিনেমা ‘থ্রি’-এর জন্য গানটি তৈরি হয়েছিল। ধনুশের কণ্ঠ, অনিরুদ্ধের সুর ও সংগীত আয়োজন মিলে গানটি হয়ে ওঠে ব্যাপক আলোচিত।
গানটির বিশেষত্ব ছিল এর সরলতা। ইংরেজি ও তামিলের মিশ্র ভাষা, ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা ইংরেজি উচ্চারণ, আকর্ষণীয় সুর আর সহজে মনে থাকার মতো ছন্দ—সব মিলিয়ে গানটি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গানটি ছড়িয়ে পড়ে, তৈরি হয় অসংখ্য অনুকরণ ও সংস্করণ। তখনকার সময়ের হিসেবে এটি ছিল ইন্টারনেটে ভারতীয় গানের অন্যতম বড় ভাইরাল সাফল্য।
২০১২ সালে ‘থ্রি’ মুক্তির আগেই গানটির জনপ্রিয়তা অনিরুদ্ধকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। তবে একটি ভাইরাল গান দিয়ে শুরু হওয়া যাত্রাকে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পরিণত করাই ছিল আসল চ্যালেঞ্জ। অনিরুদ্ধ বুঝেছিলেন, প্রথম সাফল্যের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং প্রতিটি সিনেমার জন্য নতুন সুর ও নতুন সংগীতভাষা তৈরি করতে হবে তাঁকে।
একের পর এক হিট, বদলে গেল পরিচয়
‘কোলাভেরি ডি’-এর পর অনিরুদ্ধর সামনে খুলে যায় তামিল চলচ্চিত্রের বড় দরজা। ‘কাত্থি’, ‘ভিআইপি’, ‘ভেদালাম’, ‘পেট্টা’, ‘মাস্টার’, ‘বিস্ট’, ‘বিক্রম’ ও ‘জেলার’-এর মতো সিনেমায় তাঁর সংগীত ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর জনপ্রিয়তা পায়।
অনিরুদ্ধর সংগীতের বড় শক্তি হলো, গানকে শুধু সিনেমার একটি অংশ হিসেবে না দেখে পুরো ছবির আবহ তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা। কখনো দ্রুতগতির বিট, কখনো ইলেকট্রনিক সংগীতের ব্যবহার, কখনো আবার আবেগঘন সুর-সিনেমার চরিত্র ও গল্প অনুযায়ী নিজের সংগীতের ধরন বদলে নেন তিনি।
বিশেষ করে আবহসংগীতে অনিরুদ্ধর কাজ তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। নায়ক পর্দায় প্রবেশ করছেন, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতের দৃশ্য কিংবা উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত—এসব দৃশ্যে তাঁর সংগীত দর্শকের আবেগকে আরও তীব্র করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে সিনেমার প্রচারণাতেও তাঁর তৈরি গান ও সংগীত বড় ভূমিকা রাখে।
এই কারণেই দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় রজনীকান্ত, বিজয়, অজিত কুমার ও কমল হাসানের মতো তারকাদের ছবিতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তারকাদের জনপ্রিয়তা যেমন তাঁর সংগীতকে বড় দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, তেমনি তাঁর সংগীতও সিনেমার প্রচারে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে।
শাহরুখ খানের ‘জওয়ান’ দিয়ে নতুন অধ্যায়
তামিল সিনেমায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর অনিরুদ্ধর সামনে আসে আরও বড় বাজারের সুযোগ। শাহরুখ খান অভিনীত অ্যাটলি পরিচালিত ‘জওয়ান’ দিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক হিসেবে অভিষেক হয় তাঁর। সিনেমাটি ২০২৩ সালে মুক্তি পায় এবং বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করে।
‘জওয়ান’-এর সংগীত ও আবহসংগীত অনিরুদ্ধকে দক্ষিণ ভারতের বাইরের দর্শকদের মধ্যেও পরিচিত করে তোলে। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়, তাঁর সংগীত শুধু একটি ভাষা বা অঞ্চলের দর্শকের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। দৃশ্যের সঙ্গে মানানসই শক্তিশালী আবহ, আধুনিক সংগীত আয়োজন এবং সহজে মনে থাকার মতো সুর—এসব বৈশিষ্ট্য অন্য ভাষার সিনেমাতেও কার্যকর।
এরপর তেলুগু সিনেমা ‘দেবারা’র সংগীত নিয়েও আলোচনায় আসেন অনিরুদ্ধ। ফলে তামিল সিনেমায় জনপ্রিয় এক সুরকার থেকে ধীরে ধীরে প্যান-ইন্ডিয়া চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগীত পরিচালক হয়ে ওঠেন তিনি।
১০ কোটি রুপির পারিশ্রমিক
জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অনিরুদ্ধর পারিশ্রমিকও। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, একটি সিনেমার সংগীত অ্যালবামের জন্য তিনি প্রায় ১০ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিচ্ছেন। ওই সময় তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া সংগীত পরিচালকদের একজন হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে মানিকন্ট্রোলের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হিন্দি সিনেমার জন্য তাঁর পারিশ্রমিক ১০ কোটি রুপির বেশি হতে পারে এবং তেলুগু সিনেমার ক্ষেত্রে তা ১৫ কোটি রুপি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ২০২৬ সালের আগস্টে স্যাকনিল্কের প্রতিবেদনে আল্লু অর্জুন ও লোকেশ কানাগরাজের আসন্ন সিনেমা ‘এএ২৩’-এর জন্য তাঁর পারিশ্রমিক ২৩ কোটি রুপি (প্রায় ৩০ কোটি টাকা) বলে দাবি করা হয়।
নিজের সংগীত, নিজের নিয়ম
অনিরুদ্ধর কাজের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সংগীতচর্চা ও একটি নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি। স্কুলজীবন থেকেই তিনি সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বন্ধুদের নিয়ে ব্যান্ডে কাজ করেছেন, বিভিন্ন ধরনের সংগীত শুনেছেন এবং নিজের সুর তৈরির চর্চা চালিয়ে গেছেন। চলচ্চিত্রের কাজের পাশাপাশি স্বাধীন সংগীত নিয়েও তাঁর আগ্রহ রয়েছে।
২০২৬ সালে বিলবোর্ড ইন্ডিয়ার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তাঁর স্টুডিওতে একই সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন। আরও বলেন, তাঁদের তৈরি সংগীতের বড় একটি অংশ শুরুতে কোনো নির্দিষ্ট সিনেমার জন্য তৈরি করা হয় না।
এই চর্চা তাঁর সংগীতে বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে। একই ধরনের গান বারবার তৈরি না করে নতুন শব্দ, নতুন ছন্দ ও নতুন আবহ তৈরির চেষ্টা করেন তিনি। এ কারণেই তাঁর সংগীত কখনো নাচের উপযোগী, কখনো অ্যাকশন দৃশ্যের জন্য তীব্র, আবার কখনো আবেগঘন হয়ে ওঠে।