স্মরণ

আমার স্যার নেই

স্টার জলসার জল নূপুর সিরিয়ালের দৃশ্যে অপরাজিতা আঢ্য ও পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায়
স্টার জলসার জল নূপুর সিরিয়ালের দৃশ্যে অপরাজিতা আঢ্য ও পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায়

অপরাজিতা আঢ্যর কণ্ঠ বারবার থেমে যাচ্ছে। ফোনের এক প্রান্ত থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তিনি কাঁদছেন। কথা বলতে সমস্যা হচ্ছে। কিছুক্ষণ থেমে থাকার পর বললেন, ‘আমার স্যার নেই। আমার সব শূন্য হয়ে গেল। কীভাবে অভিনয় করব? অমন মনের মানুষ কি আর পাওয়া যাবে?’
অপরাজিতা আঢ্য। স্টার জলসার অন্যতম জনপ্রিয় জল নূপুর সিরিয়ালের ‘পারি’। তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছেন পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায়। এই সিরিয়ালে তাঁর চরিত্রের নাম ‘অমর্ত্য’। দারুণ জুটি এই পারি-অমর্ত্য। যাঁরা সিরিয়ালটি নিয়মিত দেখেছেন, তারা ভুলতে পারবেন না এই জুটির কথা।
জল নূপুর সিরিয়ালের অমর্ত্য হারিয়ে গেছেন। মৃত্যুর কাছে হার মেনেছেন কলকাতার টিভি, মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত অভিনেতা এবং সংগীতশিল্পী পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায় (৫০)। পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিং হোমে ২৪ অক্টোবর দিবাগত রাতে তিনি চলে গেছেন না-ফেরার দেশে।
দুর্গাপূজার সপ্তমীর সন্ধ্যায় নিজেই গাড়ি চালিয়ে কোনা এক্সপ্রেস ওয়ে ধরে হাওড়ার দিকে ফিরছিলেন পীযূষ। গাড়িতে তাঁর পাশের আসনেই ছিলেন নৃত্যশিল্পী মালবিকা সেন। চারাগাছ সেতুতে একটি লরির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে তাঁদের গাড়িটি একেবারে দুমড়ে যায়। স্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর মালবিকা সেনকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হলেও পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায়ের শারীরিক অবস্থার ক্রমেই অবনতি ঘটতে থাকে। দুর্ঘটনায় তাঁর ডান হাত, ডান পা ও বুকের ডানদিকের পাঁচটি পাঁজর ভেঙে যায়। মুখের দুই পাশে ও কপালে মারাত্মক আঘাত পান তিনি। প্রচুর রক্তপাত হয়েছে এবং হাড় ভেঙে অস্থিমজ্জা রক্তে মিশে গেছে। ফলে পীযূষ গঙ্গোপাধ্যায়ের রক্তে সংক্রমণ বেড়ে যায়।
২৬ অক্টোবর রাতে কথা হলো অপরাজিতা আঢ্যর সঙ্গে। তখন তিনি শুটিং শেষ করে বাসায় ফিরেছেন। বললেন, ‘গাড়ি চালানোর দারুণ নেশা ছিল পীযূষের। সেই গাড়িই কেড়ে নিয়েছে তাঁর প্রাণ। জল নূপুর সিরিয়ালের আরেক বন্ধু রনি বন্দ্যোপাধ্যায়ও মারা গেছেন আরেকটি দুর্ঘটনায়। সিরিয়ালে তাঁর চরিত্রের নাম ছিল ‘লাল’। তিনি ছিলেন ভালো সাঁতারু। অথচ সেই রনি মারা যান পানিতে ডুবে।’
পীযূষের সঙ্গে দীর্ঘদিন অভিনয় করেছেন অপরাজিতা আঢ্য। তাঁর অভিনয়জীবনের ১৮ বছরের ১৭ বছরই তিনি অভিনয় করেছেন পীযূষের সঙ্গে। চারটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন একসঙ্গে। বললেন, ‘দারুণ মানুষ ছিলেন পীযূষ। অমায়িক ব্যবহার। শুটিংয়ের অবসরে আমাদের মজিয়ে রাখতেন নানা কথার বেড়াজালে। বিরাট মনের মানুষ ছিলেন। ইলিশ মাছ ছিল তাঁর খুব প্রিয়। পীযূষের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে আর আমার বরিশালে। আমরা দুজনই ইলিশ পছন্দ করতাম। বলুন, এসব কথা কী করে ভুলব?’
জল নূপুর সিরিয়ালের ভবিষ্যৎ নিয়ে অপরাজিতা আঢ্য বললেন, ‘জল নূপুর সিরিয়ালের পরিচালক আর প্রযোজকেরা হয়তো পীযূষের বিকল্প কাউকে নেবেন। কিন্তু আমি কি পারব সেই আগের মতো অভিনয় করতে? পারব কি মন দিয়ে, হৃদয় দিয়ে স্যার ডাকতে? যেভাবে খোলামনে পীযূষের সঙ্গে অভিনয় করেছি, সেভাবে কি আর পারব? অমর্ত্য (পীযূষ) ছাড়া পারি হতে পারে না, জল নূপুরও হতে পারে না অমর্ত্য ছাড়া। অমর্ত্য নেই। চলে গেছেন অমৃতলোকে। আর আমরা পীযূষের স্মৃতি আগলে বসে আছি। ভাবছি আর কি সাড়া দেবেন অমর্ত্য? ডাকবেন পারি বলে? আমি মনের মাধুরী মিশিয়ে আর একবার ডাকতে পারব না আমার স্যারকে?’