
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মানসী সিনেমা হলে এবারের ঈদে কোনো নতুন ছবির প্রদর্শনী হয়নি। ওঠেনি পুরোনো ছবিও। পর্দায় আলো পড়েনি। প্রেক্ষাগৃহে আলো জ্বলেনি। দেশে প্রতিষ্ঠিত প্রথম দিকের সিনেমা হলগুলোর মধ্যে অন্যতম এই প্রতিষ্ঠানের মূল সুরম্য মিলনায়তনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
পুরান ঢাকার ১ নম্বর বংশাল রোডে অবস্থিত মানসী হলটি ব্রিটিশ, পাকিস্তান শাসনামলসহ নানা সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। ধুঁকে ধুঁকে শেষ পর্যন্ত আর সেই ‘গতি’ নিয়ে টিকে থাকতে পারল না প্রতিষ্ঠানটি। চালু হওয়ার পর চতুর্থবারের মতো ছবি প্রদর্শন বন্ধ হয়েছে এই হলের। কর্তৃপক্ষ বলছে, আধুনিকীকরণ ও সংস্কারকাজ চলার কারণে বন্ধ আছে মানসী। কাজ চলছে। ভবিষ্যতে ছোট পরিসরে ‘সিনেপ্লেক্স’ আকারে চালু করা হবে এটি।
গতকাল বুধবার বংশাল রোডে মানসী হলে গিয়ে দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসন আমলে নির্মিত ভবনটির নিচতলার মূল প্রবেশপথ দিয়ে হলে ঢোকার নকশা করা কাঠের দরজাটি নেই। ভেঙে ফেলা হয়েছে মুখোমুখি দুটি টিকিট কাউন্টার। সেখানে দুটি দোকান চালু হয়েছে। মূল প্রেক্ষাগৃহের ভেতরে আগের কোনো চিহ্ন নেই, যা একসময় শত শত দর্শকের পদচারণে মুখরিত হতো, এখন সেখানে সারি সারি ঘর বানানো হয়েছে। ছবি প্রদর্শনের পর্দাটিও নেই। কর্মরত কয়েকজন নির্মাণশ্রমিক জানালেন, রূপালী পর্দার জায়গায় দোকান হচ্ছে। এখানে মার্কেট হবে।
দোতলায় ওঠার পুরোনো সিঁড়ির দুই পাশে মোজাইক পাথরের ওপর বিভিন্ন নকশা, মানুষ, প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবিগুলো আবছা হয়ে গেছে। ভেঙে ফেলা হয়েছে প্রক্ষেপণ ঘরটি। হলের ক্যানটিনে নির্মাণশ্রমিকদের থাকার জন্য অস্থায়ী ঘর বানানো হয়েছে। ভেতরে অফিসঘরটি আগের মতো আছে। ঘরের এক পাশে হলের প্রক্ষেপণযন্ত্রগুলো রাখা। অফিসে দেখা হলো হলের ব্যবস্থাপক খোরশেদ আলমের সঙ্গে। ৪০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আছেন তিনি। এত বছরের চাকরিজীবনে এই প্রথম দেখলেন কোনো ঈদে হলটি বন্ধ ছিল। এর আগে একবার এরশাদ সরকারের সময়ে অল্প কিছুদিনের জন্য প্রদর্শনী বন্ধ ছিল। তবে সেটা ঈদের সময় নয়। খোরশেদ আলম বললেন, ‘খারাপ লাগে। কিন্তু কিছু করার নেই। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেই হবে।’
‘দি নিউ পিকচার্স লিমিটেড’-এর পক্ষে এখন হলটি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি জানালেন, ১০ বছরের বেশি সময় লোকসান দিয়েই মালিকপক্ষ হলটি চালাচ্ছিল। গাজীপুরের জমিদার আবরার সিদ্দিকীর বংশধর চৌধুরী আফসার আহমেদ সিদ্দিকী ও মুনিরা সিদ্দিকী হল পরিচালনায় আন্তরিক ছিলেন। তাঁরা বলে দিয়েছেন, ব্যবসা নয়, শুধু ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে যত দিন পারা যায় হলটি চালিয়ে যাবেন। কিন্তু অবস্থা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছিল যে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতা দেওয়া দূরে থাক, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। একটা সময় প্রতি প্রদর্শনীতে দর্শকের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতেন মানসী হলের কর্মীরা, সেখানে গত কয়েক বছরে শুধু শুক্রবারের বিকেল ও সন্ধ্যার প্রদর্শনীতে ভিড় দেখা যেত। তাই মালিকেরা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন, নতুন উদ্যোগে নিচে মার্কেট করে ওপরে ছোট পরিসরে সিনেপ্লেক্স আকারে হলটি চালু করবেন।
আগে মানসী হলে দুইটি তলায় মোট ৭৫৫টি আসন ছিল। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুধু একটি তলাতেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মানসী সিনেপ্লেক্স পরিচালিত হবে। সর্বোচ্চ ২৫০টি আসনসংখ্যা থাকবে।
জানা গেছে, এর আগে আরও দুবার দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়েছিল মানসী হল। মুক্তিযুদ্ধের আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় মুসলমানরা মানসী নামের কারণে হিন্দুদের প্রতিষ্ঠান ভেবে এতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেবার বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এর অনেক দিন পর প্রতিষ্ঠানটি নাম পরিবর্তন করে নিশাত নামে চালু হয়। মুক্তিযুদ্ধের পরে নিশাতকে পাকিস্তানিদের সম্পত্তি ভেবে আবার আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আবার বন্ধ হয় সিনেমা হলটি। বেশ কিছু দিন পর আবার মানসী নামে ফিরে আসে প্রেক্ষাগৃহটি। তবে এখনো প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন স্থানে নিশাত নামটি আছে। এর ক্যানটিনের নাম নিশাত, দেয়াল ঘেঁষে তৈরি হওয়া মার্কেটের নামও নিশাত সুপার মার্কেট।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর ঐতিহ্যবাহী বলিয়াদী জমিদার আবরার আহমেদ সিদ্দিকী ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র সমিতি এবং ১৯৫২ সালে পূর্ববঙ্গ চলচ্চিত্র সমিতির অন্যতম নেতা ছিলেন। এর আগে তিনি ১৯২৬ সালে বংশাল এলাকায় একটি হল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ওই সময়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য জমিদার আবরার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে যান। কবিগুরু তখন সিনেমা হলের নাম দেন মানসী।