কলকাতায় বাঁদী-বান্দার 'চিচিং ফাঁক'

বাঁদী–বান্দার রূপকথায় শামীম আরা নীপা ও আনিসুল ইসলাম
বাঁদী–বান্দার রূপকথায় শামীম আরা নীপা ও আনিসুল ইসলাম

‘চিচিং ফাঁক’, ‘চিচিং বন্‌ধ’—ছোটবেলায় শুনে আসা বা ছবিতে দেখা সেই দৃশ্যপট নতুন করে কানে ধ্বনিত হলো আবার। মনে করিয়ে দিল আরব্য রূপকথা ‘আলীবাবা ও চল্লিশ চোর’-এর কথা। বাংলার বিখ্যাত নাট্যকার ক্ষীরোদ প্রসাদ বিদ্যা বিনোদের অমর সৃষ্টি ‘আলীবাবা’ গল্পটি কখনো সাধনা বোস-মধু বোসের আলীবাবা, কখনো মর্জিনা-আবদেল্লাহ চলচ্চিত্রে রূপ পেলেও এবার সেটা উপস্থাপিত হলো পরিপূর্ণ গীতিনৃত্যনাট্য বাঁদী–বান্দর রূপকথায়। কলকাতার রবীন্দ্রসদন মঞ্চে উপস্থিত দর্শকদের চোখ ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট আটকে থাকল অভূতপূর্ব এই পরিবেশনায়।

ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে বাঁদী–বান্দর রূপকথার ১৩টি মঞ্চায়ন হয়ে গেলেও দেখার সৌভাগ্য হয়নি বলে মনে মনে একটা আফসোস ছিল। তবে সেই আফসোসের ঘটে তৃপ্তির জল ঢেলে দিলেন শামীম আরা নীপা, শিবলী মহম্মদ, আনিসুল ইসলাম, ডলি ইকবাল, সাবরিনা নিশা, তপন, তামিমসহ নৃত্যাঞ্চল ও সৃষ্টি কালচারাল সেন্টারের ৭০ জন নৃত্যশিল্পী। তারকাঁটার বেড়া ডিঙিয়ে একটা আকাশ, একটা ভাষা আমাদের। তবুও দুই দেশ। তবে সেই বেড়াজাল ছেদ করে এক মঞ্চে উপস্থাপিত হয়েছিল দুই বাংলার শিল্পীদের প্রয়াস বাঁদী–বান্দার রূপকথা। রবীন্দ্রসদন মিলনায়তনের আধো অন্ধকারে বসে সেই রূপকথায় ডুব দিয়েছি, আর স্থানীয় দর্শকদের উচ্ছ্বাসের ঢেউয়ে বারবার ভেসে গিয়েছি অন্য রকম শিহরণে। বাংলার রূপকথার যে ঐতিহ্য, আধুনিক পৃথিবীর চাকচিক্যে তা এখন প্রায় মলিন। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি, লাল কমল-নীল কমল, সুয়োরানি-দুয়োরানির কাহিনি হারিয়ে গেছে শৈশবের পাতায়। বিদেশি সুপার হিরোদের দাপাদাপিতে সেই কাহিনি এখন কোণঠাসা। সেই পুরোনো রূপকথাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস বাঁদী–বান্দার রূপকথা

মর্জিনা, আলীবাবা, আবদুল্লাহ, সাকিনা, কাশেম, ডাকাত সর্দার প্রতিটি চরিত্রেই শিল্পীদের অভিনয় নৃত্যশৈলী ছিল নান্দনিক। আলোকসম্পাতে ব্যবহৃত ত্রিমাত্রিক ইফেক্ট কখনো এনেছে বৈচিত্র্য। ডাকাত সর্দার ‘চিচিং ফাঁক’ বলতেই যখন খুলে যায় গুহার দরজা, তখন চোখে ভাসে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।
ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাসের সহযোগিতায় এবং কলকাতার নৃত্য সংগঠন ‘সুকল্যাণ ডি অন্তরাজ’-এর আমন্ত্রণে কলকাতার রবীন্দ্রসদন মঞ্চে ১৮ মার্চ সন্ধ্যায় হয়ে গেল ‘আলী বাবা ও চল্লিশ চোর’ অবলম্বনে গীতিনৃত্যনাট্য বাঁদী–বান্দার রূপকথা, যেটি প্রাণ পেয়েছে নৃত্যপরিচালক সুকল্যাণ ভট্টাচার্যের ভাবনায়। যদিও সব শেষে মঞ্চে এসে তিনি জানালেন অন্য কথা। বললেন, ‘এই কাজটি কখনোই প্রাণ পেত না, যদি আনিসুল ইসলাম এর পেছনে বিরাট অঙ্কের টাকা লগ্নি না করতেন। আমি আমার বাংলাদেশের বন্ধুদের অকৃত্রিম সহযোগিতাতেই শেষ করতে পেরেছি কাজটি। সবার কাছে তাই আমি কৃতজ্ঞ।’

ডলি ইকবাল, তামিমুল হক ও িশবলী মহম্মদ

এদিন উপস্থিত সবার মুখেই ছিল প্রশংসার ফুলঝুরি। সুকল্যাণের গুরুজি কলাবতী দেবী বললেন, ‘আমি আলীবাবা সিনেমা দেখেছি। কিন্তু ওই সিনেমার থেকে বেশি ভালো হয়ে গেছে বাঁদী–বান্দার রূপকথা। এতটা আমার ভাবনায় ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সাধারণ কাজ দেখে চোখে ঘুম এসে যায়, কিন্তু আজ আমার চোখটা বড় হয়ে গেল। মনে হলো আজ সারা রাত ঘুমই আসবে না।’

মঞ্চে এসে শ্রীকান্ত আচার্য বলেন, ‘আমি অভিভূত। বলার ভাষা নেই। এত বড় একটা কাজ, এত বড় একটা ভাবনার সঙ্গে আমাদের যুক্ত করেছেন সুকল্যাণ, এ জন্য আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের কলাকুশলী, তাঁদের চমৎকার পারফরম্যান্স, এই প্রডাকশনটিকে অসাধারণ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে।’
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক রায়া ভট্টাচার্যের আমন্ত্রণে এই নৃত্যনাট্যের এক সহযোদ্ধা অভিনেত্রী ইন্দ্রাণী হালদার এসেও বললেন, ‘সুকল্যাণের একটা বড় স্বপ্ন ছিল। আমার বন্ধু রাঘব, লোপামুদ্রা মিত্র, শ্রীকান্ত আচার্য, নচিকেতা, মনোময়, জয়তী চক্রবর্তী এবং বাংলাদেশের বন্ধুরা মিলে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি।’

তবে ওই রাতেই এক ফাঁকে নৃত্যনাট্যের প্রযোজক আনিসুল ইসলামের কাছে জানা গেল পেছনের গল্পটি। ডিসেম্বর, ২০১৩। শান্তিনিকেতনে একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে একসঙ্গে যাচ্ছিলেন এপার বাংলার নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নীপা, শিবলী মহম্মদ, আনিসুল ইসলাম হিরু ও কলকাতার সুকল্যাণ ভট্টাচার্য। দুই বাংলার শিল্পীদের নিয়ে সম্মিলিত কোনো কাজ করা যায় কি না, হিরুর এমন প্রস্তাবে সুকল্যাণ তখনই বললেন, তাঁর দীর্ঘদিনের একটা স্বপ্ন আছে, একটা বড় ধরনের কাজ করার। কিন্তু কাজটা অনেক ব্যয়বহুল। শুনে হিরু বললেন, ‘যা খরচ হবে, আমি দেব।’ সুকল্যাণ তখন ‘আলীবাবা’ নিয়ে নৃত্যনাট্য করার প্রস্তাব দেন। গাড়িতে বসেই কে কোন চরিত্র করবেন, ঠিক করে ফেলেন তাঁরা। মর্জিনা চরিত্রটি করবেন শামীম আরা নীপা, আলীবাবা শিবলী মহম্মদ, আবদুল্লাহ চরিত্রে আনিসুল ইসলাম, কাশেম হবেন সুকল্যাণ। শান্তিনিকেতন থেকে ফেরার পথেই কেনা হয় মর্জিনারূপী নীপা মাথায় যে মুকুটটি পরেছেন, সেটি।

সেই থেকে সুকল্যাণের পরিচালনায় শুরু হয় বাঁদী–বান্দার রূপকথার মহড়া। পাশাপাশি এক বছর ধরে আবহসংগীত তৈরি করেন জয় সরকার। এর প্রতিটি গানে ও চরিত্রে কণ্ঠ মেলান ওপারের ইন্দ্রাণী হালদার, অন্বেষা দাশগুপ্ত, নচিকেতা, শ্রীকান্ত আচার্য, লোপামুদ্রা মিত্র, জয়তী চক্রবর্তী, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, মনোময় ও অরিজিৎ। এর সংলাপ লিখেছেন শংকর তালুকদার। কলকাতা রবীন্দ্রসদনের পর এবার ইচ্ছে বাংলাদেশের কোনো মঞ্চে আবার দেখব বাঁদী–বান্দর রূপকথা এবং অন্যকেও বলব, কাজটা একবার গিয়ে দেখুন। অসাধারণ।