‘মুক্তির গান’, ‘কর্ণফুলীর কান্না’ ও ‘শুনতে কি পাও’ প্রামাণ্যচিত্রের পোস্টার
‘মুক্তির গান’, ‘কর্ণফুলীর কান্না’ ও ‘শুনতে কি পাও’ প্রামাণ্যচিত্রের পোস্টার

ক্রমে সমাদৃত হচ্ছে প্রামাণ্যচিত্র

বাংলাদেশের সঙ্গে প্রামাণ্যচিত্রের সম্পর্ক স্বাধীনতার শুরু থেকেই। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও প্রামাণ্যচিত্র অবহেলিত রয়ে গেছে। ভালো প্রামাণ্যচিত্র তৈরি হয়নি এমন নয়, তবে এর কদর তৈরি হয়নি তেমন। বেশির ভাগ কাজই হয়েছে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায়। তবে এতকালের অবহেলা থেকে ক্রমে সমাদরের পথে এগোচ্ছে প্রামাণ্যচিত্র।
জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’ ও ‘আ স্টেট ইজ বর্ন’ প্রামাণ্যচিত্র দুটি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। স্বাধীনতাযুদ্ধ যেন হয়ে উঠেছিল প্রামাণ্যচিত্র তৈরির অন্যতম অনুপ্রেরণা। যেমন আলমগীর কবিরের ‘লিবারেশন ফাইটার্স’, বাবুল চৌধুরীর ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’। স্বাধীনতার পর মার্কিন সাংবাদিক লিয়ার লেভিনের ফুটেজ থেকে বাছাই করা অংশ দিয়ে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ নির্মাণ করেছিলেন ‘মুক্তির গান’। মানজারে হাসীন মুরাদ, তানভীর মোকাম্মেল ও তারেক মাসুদের ‘কৃষ্ণগড়ে একদিন’, তারেক মাসুদের ‘আদম সুরত’, তারেক-ক্যাথরিনের ‘মুক্তির কথা’, তানভীর মোকাম্মেলের ‘কর্ণফুলীর কান্না’ প্রামাণ্যচিত্রগুলোতে মাটি ও মানুষের কথা উঠে এসেছে। এ ছাড়া মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, বাবুল বিশ্বাস, ফৌজিয়া খান, ইয়াসমীন কবির, শাহীন–দিল-রিয়াজ, সাইফুল ওয়াদুদ হেলালসহ বেশ কয়েকজন নির্মাতা প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছেন, করছেন।

মুক্তির গান চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য: একাত্তরে সাংস্কৃতিক দলের কর্মীরা সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন শরণার্থী শিবির আর মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ঘুরে ঘুরে গান করেন l ছবি: সংগৃহীত
প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে ফিকশনের যেমন চাহিদা, নন–ফিকশনেরও তেমন চাহিদা। আমরা সম্প্রতি আবরার আতহারের পরিচালনায় সংগীতশিল্পী অর্ণবকে নিয়ে একটি কাজ করেছি। একে মোটা দাগে প্রামাণ্যচিত্র বলব না, মিউজিক্যাল ফিল্ম বলব। এটা এক্সাইটিং একটা প্রজেক্ট। কারণ, অর্ণব তাঁর গানগুলো নিয়ে কথা বলবেন। এটা বাংলাদেশে নতুন ধারার ভিজ্যুয়াল কনসেপ্ট।

তবে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ক্রমেই কমে আসছে। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের সঙ্গে সমান্তরালভাবে আলোচনায় কখনোই আসেনি প্রামাণ্যচিত্র। বাংলাদেশে প্রামাণ্যচিত্রকে গতিশীল করতে গঠন করা হয় বাংলাদেশ প্রামাণ্যচিত্র পর্ষদ। ২০০৫ সাল থেকে প্রতি দুই বছর পর প্রামাণ্যচিত্র উৎসবের আয়োজন করে তারা। কিন্তু পর্ষদের সাবেক সভাপতি আনোয়ার চৌধুরী জানান, প্রামাণ্যচিত্রের উৎসবটি শেষবারের মতো আয়োজিত হয় ২০১৪ সালে। এরপর নির্মাতারা ব্যক্তিগত কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় উৎসবটি আর হয়নি। পর্ষদের বর্তমান সভাপতি ফরিদুর রহমান বলেন, ‘গত বছর করোনা শুরু হওয়ার কারণে আমরা তেমন কোনো কাজ করতে পারিনি। কারণ, এমনিতেই প্রামাণ্যচিত্রের ব্যাপারে আমাদের দেশে উৎসাহ কম। তবে আমরা মহামারির আগে শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে যৌথভাবে নিয়মিত প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম।’

গত বছর করোনা শুরু হওয়ার কারণে আমরা তেমন কোনো কাজ করতে পারিনি। কারণ, এমনিতেই প্রামাণ্যচিত্রের ব্যাপারে আমাদের দেশে উৎসাহ কম। তবে আমরা মহামারির আগে শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে যৌথভাবে নিয়মিত প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম।

ফরিদুর রহমানের কথায় উঠে আসে প্রামাণ্যচিত্রের বর্তমান সংকটগুলো। তিনি জানান, প্রামাণ্যচিত্র দেখানোর সুযোগ নেই বললেই চলে। কিছু কিছু টেলিভিশন শুরু করেছিল, কিন্তু এখন খুব একটা চালানো হয় না। তা ছাড়া টেলিভিশনে প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে মূলত তথ্যচিত্র দেখানো হয়। দর্শকও প্রামাণ্যচিত্র দেখতে ততটা অভ্যস্ত নন।
এর মধ্যেও নিজস্ব উদ্যোগে বেশ কজন নির্মাতা প্রামাণ্যচিত্র বানিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সেসবের মধ্যে নির্মাতা শাহীন-দিল-রিয়াজের ‘লোহাখোর’, ‘প্রজেকশনিস্ট’, ‘বাঁশ বৈভব’; সাইফুল ওয়াদুদের ‘ঝলমলিয়া’; কামার আহমাদ সাইমনের ‘শুনতে কি পাও’-এর কথা বলা যায়। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকজন তরুণ নির্মাতা প্রামাণ্যচিত্র বানাচ্ছেন এবং নিয়ে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোতে।

‘শুনতে কি পাও’ ছবির পোস্টার

এর মধ্যেও প্রামাণ্যচিত্রে সহায়তার জন্য দেশে দুটি ফিল্ম বাজার তৈরি হয়েছে। ২০১৭ সালে তৈরি হয় ঢাকা ডক ল্যাব। দক্ষিণ এশিয়ার প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতাদের জন্য প্রকল্প পিচিং, মাস্টারক্লাস, ওয়ার্কশপসহ নানা আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি লিবারেশন ডকফেস্ট বাংলাদেশ নামেও একটি উৎসব হচ্ছে প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে। সেখানেও প্রামাণ্যচিত্রের জন্য অর্থসহায়তা দেওয়া হয়। এর পৃষ্ঠপোষকতা করে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ঢাকা ডক ল্যাব ও লিবারেশন ডকফেস্ট বাংলাদেশের পরিচালক তারেক আহমেদ মনে করেন, প্রামাণ্যচিত্রের সম্ভাবনা এখন বাড়ছে। তিনি জানান, সরকারি অনুদানের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে সহায়তা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে যৌথ প্রযোজনায় আগ্রহ বাড়ছে। তবে মূল সমস্যা তরুণ নির্মাতাদের শিক্ষা ও আগ্রহ নিয়ে। তারেক বলেন, ‘অনেক তরুণ ভালো প্রকল্প নিয়ে শুরু করেন, কিন্তু কিছুদূর গিয়ে হারিয়ে যান। তাঁরা খুব দ্রুত ছবিটা করে ফেলতে চান। উৎসবে দেখাতে চান। টাকা পেতে চান। কিন্তু লম্বা সময় ধরে লেগে থাকার মতো প্যাশন নেই। আরেকটা সমস্যা হলো, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের শিক্ষাও সমসাময়িক নয়।’

যদিও নির্মাতারা বলছেন, পরিবেশনা ও প্রদর্শনীর সুযোগের অভাবে প্রামাণ্যচিত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে না। মূলধারার পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রে প্রযোজক ও পরিবেশক পাওয়া গেলেও প্রামাণ্যচিত্রের জন্য পাওয়া যায় না। ব্যক্তি উদ্যোগে অর্থের জোগান এবং বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয় তাঁদের। ছবি বানানোর পর প্রদর্শনী নিয়েও ভাবতে হয়। তরুণ নির্মাতা ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘প্রামাণ্যচিত্রের জন্য আমাদের দেশে কোনো পেশাদার প্রযোজক বা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নেই। যেসব নির্মাতা স্বাধীনভাবে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করছেন, তাঁরা নিজস্ব প্রতিষ্ঠান থেকেই তৈরি করছেন। কখনো কখনো নির্মাতার কাছের মানুষ, যেমন স্বামী বা স্ত্রী প্রযোজকের ভূমিকা নেন। ব্যতিক্রম আছে হাতে গোনা দু–একটি।’

‘বাঁশ বৈভব’ প্রামাণ্যচিত্রের দৃশ্য

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে নাটক ও টেলিছবি প্রদর্শনীর সুযোগ থাকলেও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর সুযোগ একেবারেই কম। তাই দ্বিতীয় ছবিটি নির্মাণের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন পরিচালক। এ প্রসঙ্গে নির্মাতা ফৌজিয়া খান বলেন, ‘“বিনা পয়সায়”আপনার বানানো যেকোনো প্রামাণ্যচিত্র আপনি বাংলাদেশের যেকোনো টেলিভিশনে দেখাতে পারবেন। কথা হলো, কোনো নির্মাতা সেটা চান কি না। আমি এখন আর তা চাই না।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাভিশনের অনুষ্ঠান প্রধান তারেক আখন্দ বলেন, ‘টেলিভিশনের প্রোগ্রামগুলোকে মোটা দাগে দুইটা অংশে ভাগ করা হয়। একটা হচ্ছে ফিকশন। আরেকটা নন–ফিকশন। ফিকশন হলো ড্রামা, সিনেমা। এন্টারটেইনমেন্টের ৮৫ শতাংশ হলো ফিকশন। বাকি ১০ কি ২০ শতাংশে চ্যানেল নিজে কাজ করে। সেলিব্রিটি টক শো করে, ক্যারিয়ার শো করে, ডকুমেন্টারি চালায়।’

টেলিভিশন চ্যানেলগুলো প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে যা চালিয়ে থাকে, সেগুলো বেশির ভাগই মূলত নিজেদের উদ্যোগে বানানো তথ্যচিত্র। স্বাধীনভাবে নির্মাতারা যেসব প্রামাণ্যচিত্র বানান, সেগুলো প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কেমন থাকে? এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘টেলিভিশনের প্রতিটি অনুষ্ঠানকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করতে হয়। কিছু অনুষ্ঠান রাষ্ট্র, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দায় থেকে করতে হয়। এরপরে যে সময়টুকু থাকে, সেটা বিজ্ঞাপনদাতা ও দর্শকের আগ্রহ—সবকিছু মিলিয়ে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়।’

‘ঝলমলিয়া’ ছবির পোস্টার

তবে বিশ্বজুড়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো হয়ে উঠছে প্রামাণ্যচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা। দেশি ওটিটিগুলো কী ভাবছে এ নিয়ে? চরকির প্রধান নির্বাহী রেদওয়ান রনি বলেন, ‘প্রামাণ্যচিত্র কনসেপ্টটা আমাদের দর্শকের কাছে দীর্ঘদিন সম্ভবত এমন ছিল—বোরিং, শিক্ষামূলক, দেখতে গেলে অনেক ধৈর্য নিয়ে দেখতে হয় ইত্যাদি। কিন্তু ফিকশনের থেকে নন–ফিকশন বা প্রামাণ্যচিত্রের চাহিদা অনেক বাড়ছে। দেশের বাইরে একটা প্রামাণ্যচিত্রের বাজেট কিন্তু ফিকশন ফিল্মের থেকে কম নয়, আবেদনও অনেক। কারণ, নানা ইন্টারেস্টিং টপিক নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রগুলো হচ্ছে। সেদিক থেকে বলব, প্রামাণ্যচিত্রের জন্য এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে ফিকশনের যেমন চাহিদা, নন–ফিকশনেরও তেমন চাহিদা। আমরা সম্প্রতি আবরার আতহারের পরিচালনায় সংগীতশিল্পী অর্ণবকে নিয়ে একটি কাজ করেছি। একে মোটা দাগে প্রামাণ্যচিত্র বলব না, মিউজিক্যাল ফিল্ম বলব। এটা এক্সাইটিং একটা প্রজেক্ট। কারণ, অর্ণব তাঁর গানগুলো নিয়ে কথা বলবেন। এটা বাংলাদেশে নতুন ধারার ভিজ্যুয়াল কনসেপ্ট।’