মহড়াকক্ষথেকে

ফিরে এল 'চাকা'

সেলিম আল দীনের চাকা নাটকের মহড়া চলছে। ছবি: আনন্দ
সেলিম আল দীনের চাকা নাটকের মহড়া চলছে। ছবি: আনন্দ

‘আপনি দৃশ্যের এই জায়গাটাতে এমনভাবে অভিনয় করবেন, যেন মনে হয় আপনার অভিনয়টা একটা তরবারি—তরবারিটা শরীরে লাগবে আর ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হবে।’—নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের একজনকে বলছেন কথাগুলো। ১৪ জুলাই রোববার সারা দিন মহড়া করার পর সন্ধ্যায় তখন তাঁরা খুবই ক্লান্ত; কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমণ্ডলের মহড়াকক্ষে দাঁড়িয়ে নির্দেশকের কথা শুনছেন হাঁ হয়ে—ক্লান্তি যেন কোথায় উবে গেছে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শেষ পর্বের শিক্ষার্থীদের প্রযোজনা চাকা। সেলিম আল দীনের লেখা নাটকটির নির্দেশনা দিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক, তরুণ নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী। আগামী ১৮ আগস্ট সেলিম আল দীনের ৬৫তম জন্মদিন উপলক্ষে পরপর তিন দিন নাটমণ্ডলে মঞ্চস্থ হবে নাট্যকলা বিভাগের এই নাটকটি। মাত্র শেষ হয়েছে মহড়া—রানথ্রো। মহড়াকক্ষের চারদিকে বসে আছেন জনা ত্রিশেক দর্শক—নাট্যকলার শিক্ষার্থীরা। আছেন নাট্যকলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ওয়াহীদা মল্লিকও। তিনি এই নাটকের পোশাক পরিকল্পনা করছেন। ‘আপা, মহড়া-রানথ্রো কেমন লাগল?’—ওয়াহীদা মল্লিকের কাছে প্রশ্ন।
এখনো বলার সময় আসেনি। এখন কেবল নাটকটির কঙ্কাল তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে আরও অনেক কিছু যুক্ত হবে। আমরা কি তাহলে এতক্ষণ দেড় ঘণ্টা ব্যাপ্তির এ নাটকের ‘কঙ্কাল’ দর্শন করলাম? হ্যাঁ, পাঠক। আকার-চেহারায় সেই কঙ্কালটি কেমন, এখন তবে সেই কথা বলি। নাটমণ্ডলের মহড়াকক্ষের চারদিকে বসে আছেন দর্শক। মাঝখানে শুকনো পাতা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি বৃত্ত—নাটক শুরু হলে বৃত্তের মধ্যে তৈরি হয় আরেকটি ছোট বৃত্ত। দেখে মনে হয়, মঞ্চজুড়ে যেন গড়ে তোলা হয়েছে চাকার সোজাসাপ্টা রূপ। মঞ্চের দুই পাশে এক হাত উঁচু দুটি প্ল্যাটফর্ম—সব মিলিয়ে গোটা মহড়াকক্ষটিই মঞ্চ।

‘একদিন বৈশাখের কোনো এক সকালে কাকেশ্বরী নাম গাঙ পাড়ে একটি গঞ্জ—এলংজানী...।’—এলংজানী গঞ্জের কথা বলতে বলতে নাটক শুরু হয়ে গেছে। নানা দৃশ্যের বর্ণনায় মঞ্চে ফুটে উঠছে ছবি—আমরা দেখছি, একটি নামহীন লাশ নিয়ে পথ থেকে পথে ছুটে চলেছে বাহেড় গাড়োয়ান। বাহেড়ের সঙ্গে আরও আছে সাঁওতাল যুবক ধরমরাজ, প্রৌঢ় ও শুকুরচান—কেউই লাশের ঠিকানা জানে না। লাশটিকে কেবল তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিতে চান তাঁরা। তবে দীর্ঘ পথযাত্রায় এর মধ্যেই অজ্ঞাত, অপরিচিত লাশটি তাঁদের স্বজন হয়ে উঠেছে। ফলে তার শরীরে যখন পিঁপড়ে বাসা বাঁধে, তখন বাহেড়কে বলতে শোনা যায়, ‘মানুষের নজ্জা মানষে লিবে পিঁপড়েরে লিতে দেমো ক্যা।’

নাটকের কাহিনি এমনই। কিন্তু নানা দৃশ্য পরম্পরায় ক্ষণে ক্ষণে এখানে উদ্ভাসিত হচ্ছে, সাঁওতাল সৃষ্টিতত্ত্ব, ইমাম হোসেনের কারবালার প্রান্তর, নয়ানপুর-নবীনপুরের মানুষজন, দৈনন্দিন বিভিন্ন প্রসঙ্গ—আরও কত কী!

বর্ণনা আর অভিনয়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে—কখনো বর্ণনা কখনো অভিনয়ের বর্ণিলতায় বর্ণনাত্মক ধারার এই নাটকের যখন শেষ দৃশ্য উপস্থিত, দেখি, আমাদের চোখে পানি, আমরা কাঁদছি!

এর আগে এই প্রযোজনার তিন কথকসহ মাত্র সাতজন অভিনেতা কত না রসে-বসে রেখেছিলেন আমাদের। বর্ণনা দিতে দিতে দৃশ্য মূর্ত করছেন কথক, আবার কখনো তাদের দেখা যাচ্ছে নিপাট চরিত্রাভিনেতার ভূমিকায়। অন্যদিকে নাটকের চার প্রধান চরিত্র বাহেড়, ধরমরাজ, প্রৌঢ় ও শুকুরচান পুরো নাটকেই একটি নির্দিষ্ট চরিত্র ধারণ করছেন। সামান্য কাপড় মুহূর্তেই পেয়ে যাচ্ছে লাশের অবয়ব—পুরো বিষয়কে তাই ‘এলাহি কায়কারবার’ বলা যায়।

অবশ্য নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী বললেন, ‘প্রযোজনাটি এখনো তেমনভাবে দাঁড়ায়নি। আরও অনেক সূক্ষ্ম কাজ করতে হবে। সংগীতকে পরিশীলিত করতে হবে। নাটকের মধ্যে অন্যায় মৃত্যুর বিরুদ্ধে সেলিম আল দীনের যে বক্তব্য, তা অটুট রেখে দেশীয় রীতিতে একটি দর্শক-ঘনিষ্ঠ প্রযোজনা নির্মাণ করতে চাই আমরা। নাটকের জন্য কয়েকদিন আগে আমরা রাজশাহীর সাঁওতালপল্লিতেও গিয়েছিলাম।’

সেই কবে চাকার নির্দেশনা দিয়েছিলেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। তারপর আবার নতুনভাবে ফিরে এল চাকা। আর হ্যাঁ, নতুন এই নাটকের অভিনেতারা মাহ্জাবীন ইসলাম, সুশান্ত কুমার সরকার, খান মো. রফিকুল ইসলাম, নুসরাত শারমিন, মেহেদী তানজিব, লাবণী আকতার ও সৈয়দা ইফাত আরা—প্রত্যেকের অভিনয়ই যেন তরবারির মতো ধারালো, আমাদের হূদয়ে রক্তক্ষরণ জাগায়।