শ্রদ্ধা

বেহালার সঙ্গে সুনীল

সুনীল চন্দ্র দাস। ছবি: খালেদ সরকার
সুনীল চন্দ্র দাস। ছবি: খালেদ সরকার

বেহালার সুর যত না আনন্দের, তার চেয়ে বেশি বিরহের, বেদনারই বটে। সেই বেদনার আর্তি তুলে গান-পিপাসু শ্রোতার হৃদয়ে কষ্ট সাজিয়ে দেওয়ার নিপুণ শিল্পকর্মটি করে যাচ্ছেন যিনি তাঁর বেহালা দিয়ে; তিনি সুনীল চন্দ্র দাস।
১৯৬৪ সাল। ‘তেরে কেটে তাক, তেরে কেটে তাক’—তবলায় কচি হাতে বোল তুলেছিলেন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সুনীল। চোখেমুখে তবলাশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু বাদ সাধলেন তাঁর বাবা মতি লাল দাস, বেতারের বেহালাশিল্পী। পাশাপাশি ওই সময় নির্মিত বাক্ চলচ্চিত্রগুলোর আবহ সংগীতে তিনি নিয়মিত বেহালা বাজাতেন। তবে অবসরে চলে যাওয়ায় বেহালা বাজানোয় ছেদ পড়ে। ইতালিতে তৈরি তাঁর দুটি বেহালা ছিল। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে একদিন মনস্থির করলেন, বেহালা দুটি বিক্রি করে দেবেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানলেন, বিক্রি করলে যে দাম পাবেন, তা খুবই কম। তাই ছেলে সুনীলের হাতে একটা বেহালা এবং সারগাম তুলে দিয়ে বললেন, ‘বেহালাটা শিখে রাখ, কাজে লাগবে’।
কিন্তু সুনীলের তখন তবলায় মন। বাবা জোর করে ছেলেকে বেহালা নিয়ে বসাতেন। কোনো দিন ১০ মিনিট, কোনো দিন ১৫-২০ মিনিট। তবুও সুনীলের বেহালায় মন নেই, কিন্তু একটা সময় বেহালায় আসক্ত হয়ে পড়লেন।
বাবার শিষ্যত্ব খুব বেশি দিন পাওয়া হলো না। মতি লাল দাস ১৯৬৭ সালে পৃথিবী ছাড়লেন। তারপর থেকে সুনীল নিজেই বেহালা অনুশীলন চালিয়ে গেলেন। দুই বছর পর প্রথম ডাক পড়ল লাল কুটি মিলনায়তনে, একটি মঞ্চ নাটকে বেহালায় আবহ সংগীত করার জন্য।
সুনীল চন্দ্র দাস বলেন, প্রথম বাজিয়ে সম্মানী বাবদ ১০ টাকা, সঙ্গে যাতায়াত ভাড়া বাবদ আরও দুই টাকা পেয়েছিলাম। আনন্দে মন ধরে না। বাড়িতে গিয়ে সেই টাকা তুলে দিলাম মায়ের হাতে। খুশিতে মায়ের চোখে জল। তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। বললেন, ‘আরও ভালো করে শিখ বাবা।’
এরপর টুকটাক মঞ্চ নাটকেই বাজান তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরো পরিবারের সঙ্গে সুনীলও চলে গেলেন কলকাতা। সুযোগ এল দ্বিতীয় গুরুর শিষ্যত্ব পাওয়ার। প্রখ্যাত বেহালাশিল্পী পরিতোষ শীলের কাছে নতুন করে বেহালায় তালিম নেন সুনীল। দেশে ফেরার পর ১৯৭৩ সালে পেশাদার বেহালাশিল্পী হিসেবে প্রথমে বাংলাদেশ বেতারের হোম সার্ভিসে, দুই বছর পর ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসে নিয়োগ পান।
নিজের কাজগুলো সম্পর্কে বললেন, ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘বাংলার ২৪ বছর’ আমার প্রথম বড় কাজ। যেখানে আমি এককভাবে আবহ সংগীত করি। আর চলচ্চিত্রে প্রথম কাজ করি সংগীত পরিচালক খন্দকার নূরুল আলমের সঙ্গে। এরপর ধারাবাহিকভাবে সত্য সাহা, দেবু ভট্টাচার্যের মতো গুণী সুরকারদের সঙ্গে চলচ্চিত্রে কাজ করেছি।’
চলচ্চিত্রে অসংখ্য গানে বেহালার ধুন বাজিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গানগুলো হলো রুনা লায়লার গাওয়া ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে’, সুবীর নন্দীর গাওয়া ‘আমি কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি’ ও ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার’, সাবিনা ইয়াসমীনের ‘দুঃখ আমার বাসর রাতের পালঙ্ক’, খন্দকার নূরুল আলমের গাওয়া ‘চোখ যে মনের কথা বলে’।
বেহালার পাশাপাশি তিনি রেডিওতে ভায়োলাও (বেজ বেহালা) বাজাতেন। এখন এই যন্ত্র বিলুপ্ত প্রায়।
তারপর ধীরে ধীরে পারফরমিং আর্টসের সঙ্গে যুক্ত, পরে ১৯৮৩ সাল থেকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে নিয়োগ পান। অবসরে যাওয়ার আগে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর সংগীত ও কলা বিভাগের পরিচালক ছিলেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশনে বেহালাশিল্পী হিসেবে ‘বিশেষ গ্রেড’-এ তালিকাভুক্ত।
আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে দীর্ঘদিন মঞ্চে বাজানোর ব্যাপারটি তাঁর একটা বড় প্রাপ্তি। আইয়ুব বাচ্চুর আনপ্লাগড ফেরারি মন অ্যালবামের সবগুলো গানেই তিনি বেহালা বাজিয়েছেন। এই অ্যালবামের খুব জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘ফেরারি মন’, ‘সেই তুমি’, ‘তারাভরা রাতে’, ‘রুপালি গিটার’, ‘বাংলাদেশ’।
সম্প্রতি বেরিয়েছে সুনীল চন্দ্র দাসের একক বেহালা বাদনে ১০টি রবীন্দ্রসংগীতের সুরে অডিও অ্যালবাম আমার পরান যাহা চায়। তিনি বলেন, শুদ্ধরূপে, মূল স্বরলিপিমাফিক বেহালায় ১০টি গানের অ্যালবামটি বাংলাদেশে প্রথম।
দেশে খুব পরিচিত সব শিল্পীর সঙ্গেই মঞ্চে তিনি বাজিয়েছেন। দেশের বাইরে দ্বিজেন্দ্র লাল মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, হৈমন্তী শুক্লা, অন্তরা চৌধুরীর সঙ্গেও বাজিয়েছেন। এ পর্যন্ত তাঁর বাজানো রেকর্ড হওয়া গানের সংখ্যা ১৫ হাজারেরও বেশি। বেসরকারি চ্যানেল এনটিভির সূচনা যন্ত্রসংগীতে বেহালা তাঁর বাজানো।
চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন সম্প্রতি। বললেন, ‘অবসরে গেলেও বেহালা অবসর নেই। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিল্পীদের সঙ্গে বাজাই। পাশাপাশি চেষ্টা করছি নতুন প্রজন্মের কয়েকজনকে বেহালাশিল্পী হিসেবে তৈরি করতে। নিজের স্কুল নেই। একটি বাড়িতে সপ্তাহে এক দিন বসি। কয়েকজন ছাত্রকে বেহালা শেখাচ্ছি।’