
ফোন পেয়ে সে কী অনুযোগ তাঁর! ‘আমি ভাই ঘরে বসে গান করি। আমাকে তো কারও ফোন করার কথা না।’
শৈশবে টেলিভিশনে তাঁর গান শুনেছি বলার পর মনেও করিয়ে দিই সে রকম একটি গানের কথা। ‘ওই যে “চাঁদের ঈর্ষা হবে তোমায় দেখে” গানটা... আপনারই তো গাওয়া।’ ফোনের ওপাশ থেকে এবার তাঁর দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিই গেয়েছিলাম। নব্বইয়ের দশকের শ্রোতারা খুব পছন্দ করেছিলেন গানটি।’ কণ্ঠে খানিকটা স্বস্তি এনে বলেন, ‘বাহ্, আপনার মনে আছে দেখছি!’
বৈঠকি ঢঙে রাগভিত্তিক গান করেন শিল্পী আরিফুল ইসলাম, মিঠু নামেই তাঁর পরিচয় সুধীমহলে। সমসাময়িক কথা আর চিরাচরিত অনুভূতির মিশেলে রাগভিত্তিক গান এখন কম হয়। তবে কি গুরুর কাছে শাস্ত্রীয় সংগীত শিখে গান করার সেই দিন ফুরিয়েছে? চটজলদি তারকা হতে চাইলে ‘সংগীত সাধনা’ কি তবে একটি সেকেলে ধারণা? সেই কালের শিল্পী মিঠু, যখন গানের সঙ্গে প্রাণের যোগ থাকত। ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর শেষ অ্যালবামগানেরই জলশায়। তারপর ডুব দিলেন। খুঁজে পেতেই যেন উপুড় করে দিলেন বহুদিনের জমানো কথার ঝুরি। এত দিন কোথায় ছিলেন?
আড্ডা দিতে দিতে এক বিকেলে গেয়ে শোনালেন ‘এখনো কি মেঘে ভেজে হাত’ গানটির দুই কলি। শুনে থমকে যেতে হলো। কবে শোনা যাবে পুরোটা? তিনিও শিশুর উচ্ছ্বাস নিয়ে জানালেন, শিগগির বেরোবে। রেকর্ডিং শেষ। নতুন অ্যালবামও হয়ে যাবে। গানগুলো লিখছেন কাওসার আহমেদ চৌধুরী, মাস মাসুম, রাজিউর রহমান, শফিউদ্দিন শিকদার প্রমুখ। সুর করছেন আলাউদ্দিন আলী, লাকী আখান্দ্, মো. ইশহাক, টিপু। এত দিন কোথায় আর কেনই বা ডুব মেরে ছিলেন? এই প্রশ্নে জানালেন অভিমান আর মৃদু হতাশামাখা অনেক কথা। গান গাওয়া বন্ধ ছিল না। শাস্ত্রীয় গান যাঁরা পছন্দ করেন, তাঁদের নিয়ে ঘরোয়া আসর করতেন। অ্যালবামের ব্যাপারে অনীহা এসে গিয়েছিল। পৃষ্ঠপোষক নেই, রয়্যালটি নেই; বরং ঘরোয়া অনুষ্ঠানগুলোতে সম্মান ও সম্মানী দুই-ই মিলত। ভারতীয় একদল চিকিৎসক ভীষণ প্রশংসা করেছিল। শিল্পীর এত কাছে বসে এত মিষ্টি করে গজল গাইতে নাকি শোনেননি তাঁরা।
শিল্পীর শুরুটা এমন ছিল না। ব্যান্ডের ডামাডোলে রাগভিত্তিক গানের অ্যালবাম করতে চাইত না কেউ। অথচ সেই সময়েই, ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয় তোমার দুটি নয়ন অ্যালবাম এবং সেটা সুপারহিট। ছেলেবেলায় মেহেদী হাসানের গান শোনার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বললেন, ‘জানতামই না যে ওগুলো গজল। দাদাবাড়ি ও নানাবাড়ি কাছাকাছি ছিল বলে নানাবাড়িতেই পড়ে থাকতাম। মামা-খালারা সেমি ক্ল্যাসিক্যাল গান পছন্দ করতেন। ঘরে সারাক্ষণ গান বাজত। মামা রাশিয়া থেকে একটা রেকর্ডার এনেছিলেন। সেটায় গান শোনা হতো।’ বড় হওয়ার পর কার গান ভেতরে ধাক্কা দিয়েছে তাঁকে? জানালেন, তাঁরা গুলাম আলী, জগজিৎ সিং, অনুপ জালোটা, তালাত আজীজ, নুসরাত ফতেহ আলী খাঁ।
বিদায়ের সময় বললেন, ‘কিছুদিন আগে লাকী (আখান্দ্) ভাই ফোন করেছিলেন। তিনি সহজে কারও গান করেন না। আমার দুটো গান করছেন। লাকী ভাই চিকিৎসার জন্য বাইরে চলে যাওয়ায় অনেক দিন দেখা হয়নি। সেদিন দেখা করে এলাম।’
‘অনেক দিন পর আপনি দারুণ কজন গীতিকবি ও সুরস্রষ্টার গান গাইছেন তাহলে?
মিঠু হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ।’