
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর এক পশ্চিমা সাহেব যে তাঁকে বলেছিলেন, ‘টেগোর, তোমার গীতাঞ্জলি বইটা দারুণ হয়েছে, কিন্তু আমি ভাবছি, ওটা তোমাকে কে লিখে দিল’ এবং জবারে কবিগুরু যে বলেছিলেন, ‘তার আগে তুমি বলো, গীতাঞ্জলির মতো কাব্য কে তোমাকে পড়তে দিয়েছে।’
আজ কবির জয়ন্তী। বাংলাসাহিত্যের এই সূর্যসন্তানকে কত ভাবেই না পেয়েছে বাঙালি। সাহিত্যের বিস্ময় রবীন্দ্রনাথ। এত এত সৃষ্টি! অনেকের হয়তো ভাবছেন এত কিছু নিয়ে যে লোকটি ছিলেন, তিনি নিশ্চয় ভাবগম্ভীর মানুষ ছিলেন। বাস্তবতা ছিল উল্টো। বাঙালির সব অনুভূতি ধরতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ধরতে পেরেছিলেন রসিকতাকেও। রসিক মানুষ ছিলেন বটে রবীন্দ্রনাথ। বিভিন্ন বই থেকে সংগ্রহ করে তাঁর কিছু রসিকতার কথা প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল।
গান কবিতা লিখে অপরাধ করেছি
নিজের সৃষ্টির ব্যাপারে বরাবরই সচেতন ছিলেন। এক সভা শেষে ফিরবার পথে কবিগুরু চারু চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে বললেন, ‘দেখলে চারু আমার প্রায়শ্চিত্ত । আমি না হয় গোটা কয়েক গান কবিতা লিখে অপরাধ করেছি। তাই বলে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে এ রকম যন্ত্রণা দেওয়া কি ভদ্রতা সম্মত? গান হলো কিন্তু দুজনে প্রাণপণ শক্তিতে পাল্লা দিতে লাগলেন যে, কে কত বেতালা বাজাতে পারেন আর বেসুরো গাইতে পারেন! গান যায় যদি এ পথে তো বাজনা চলে তার উল্টো পথে। গায়ক-বাদকের এমন স্বাতন্ত্র্য রক্ষার চেষ্টা আমি আর কস্মিনকালেও দেখিনি । তারপর ওই একরত্তি মেয়ে, তাকে দিয়ে নাকি সুরে আমাকে শুনিয়ে না দিলেও আমার জানা ছিল যে, তঁবু মঁরিতে হঁবে।’ উল্লেখ্য, গানের প্রথম লাইন ছিল ‘তবু মরিতে হবে’। বছরে বছরে বসন্ত আসে না
একবার বোলপুরে বসন্তের প্রকোপ দেখা দিল। কবিকে বসন্তের টিকা দেওয়া হবে। কিন্তু কবি সুঁই ফোটাতে বরাবরই ভিতু ছিলেন। রাজি হন না কিছুতেই, ডাক্তার ভয়ে ভয়ে এলেন কবির কাছে। কবি ডাক্তারকে দেখেই বললেন, ‘আমার কাছে এসেছ কেন ডাক্তার, যাদের ফিরে ফিরে বসন্ত আসে তাদের টিকা দাও গে যাও, আমার অত বছরে বছরে বসন্ত আসে না।’
পাত্রের জল কমে তলায় ঠেকলে
জীবনের শেষ দিকে এসে রবীন্দ্রনাথ একটু সামনের দিকে ঝুঁকে উবু হয়ে লিখতেন। একদিন তাঁকে ওভাবে উবু হয়ে লিখতে দেখে তাঁর এক শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁকে বলল, ‘আপনার নিশ্চয় ওভাবে উপুড় হয়ে লিখতে কষ্ট হচ্ছে। বাজারে এখন এ রকম অনেক চেয়ার আছে যেগুলোতে আপনি হেলান দিয়ে বেশ আয়েশের সঙ্গে লিখতে পারেন। ও রকম একটা আনিয়ে নিলেই তো পারেন।’ লোকটার দিকে খানিকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ জবাব দিলেন, ‘তা তো পারি। তবে কি জানো, এখন উপুড় হয়ে না লিখলে কি আর লেখা বেরোয়। পাত্রের জল কমে তলায় ঠেকলে একটু উপুড় তো করতেই হয়!’
অসাধারণ মানুষদের সবই অসাধারণ হয়
একবার রবীন্দ্রনাথ গুনগুন করে সুর বাঁধছিলেন, কথা বসাচ্ছিলেন এবং এমনিভাবে পায়চারি করতে করতে গান রচনা করছিলেন। গান শেষ হতেই ডাক পড়েছিল অমলা দাশের—‘অমলা ও অমলা, শিগগির এসে শিখে নাও, এক্ষুণি ভুলে যাব কিন্তু।’
মৃণালিনী দেবী হেসে বললেন, ‘এমন মানুষ আর কখনো দেখেছ অমলা, নিজের দেওয়া সুর নিজেই ভুলে যায়।’
রবীন্দ্রনাথের সপ্রতিভ জবাব, ‘অসাধারণ মানুষদের সবই অসাধারণ হয়। ছোট বউ চিনলে না তো।’
বনমালীর সঙ্গেও রসিকতা
কবিগুরুর প্রিয় চাকর বনমালী একদিন গল্প করে বলল, তাদের দেশে মনিবাবা নামে এক সাধু আছেন। তার নাম তিনবার নিলে সাপে কাটা মানুষও ভালো হয়ে যায়। কবি অনিল চন্দ্রকে ডেকে বললেন, ‘অনিল, একটা কেউটে সাপ এনে বনমালীকে কাটা, দেখা যাক মনিবাবুর মাহাত্ম্য। বনমালী বুঝল এটা রসিকতা। সেও হাসল।’
আরেকদিন সন্ধেবেলা রবীন্দ্রনাথ ‘হে মাধবী দ্বিধা কেন’ গানটি শেখাচ্ছিলেন। এমন সময় ভৃত্য বনমালী আইসক্রিমের প্লেট নিয়ে ইতস্তত করছিল, আসবে কি আসবে না? রবীন্দ্রনাথ বনমালীকে দেখেই আবার গেয়ে উঠলেন: ‘হে মাধবী দ্বিধা কেন?’
শান্তিনিকেতনের মশারা ভারী নম্
শান্তিনিকেতনে খুব মশা ছিল। তাই কবি হাতে পায়ে একবার তেল ব্যবহার করতেন। কখনো কোন আগন্তুক উপস্থিত হলে মজা করে বলতেন, ‘ভেব না যে আমি বুড়ো মানুষ, বাত হয়েছে বলে পায়ে তেল মালিশ করছি। এ মশার ভয়ে। শান্তিনিকেতনের মশারা ভারী নম্র। তারা সারাক্ষণই পদসেবা করে।’
চিরঋণী হয়েই রইল
কবিগুরু কথা প্রসঙ্গে দিনুবাবুকে (তার নাতি দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ) একবার বলেছিলেন, ‘বুঝলি দিনু, সেদিন অমুক লোকটা আমার কাছ থেকে দশ টাকা ধার নিয়ে গদ গদ কণ্ঠে বললেন, ‘আপনার কাছে আমি চিরঋণী হয়ে রইলুম’। দিনুবাবু আতকে উঠে বললেন, ‘তুমি দিলে ওকে টাকাটা? ও তো একটা জোচ্চোর’ !
‘তা মানি, কিন্তু লোকটার শত দোষ থাকলেও একটা গুণ ওর ছিল’—কবিগুরু শান্ত স্বরে বললেন। ‘লোকটা সত্যভাষী। কথা রেখেছিল, চিরঋণী হয়েই রইল’!
কানাই নয়, সানাই
সাহিত্যিক বলাইচাদ মুখোপাধ্যায়ের (বনফুল) ছোট ভাই প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করে বিশ্বভারতীতে পড়ার জন্য একদিন শান্তিনিকেতনে এলেন। শান্তিনিকেতনে এসে তিনি জানলেন, কবিগুরু কানে কম শোনেন (!)। কথা বলার সময় যেন একটু জোরে বলেন।
কবিগুরুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি তাঁর বড় ভাই (বনফুল)-এর দেওয়া পরিচয়পত্র দেখালেন। কবিগুরু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হে তুমি কি বলাই-এর ভাই কানাই নাকি?
উত্তরে বলাই-এর ভাই চেঁচিয়ে জবাব দিলেন, ‘না, আমি অরবিন্দ।’
কবি হেসে হেসে বললেন, ‘না, কানাই নয়, এ যে দেখছি একেবারে সানাই।’
এই নিন দণ্ড
কবিগুরু একবার বিধু শেখর শাস্ত্রীকে ডেকে বললেন, ‘মশাই, আপনাকে আমি দণ্ড দেব।’
গুরুদেবের এহেন কথায় শাস্ত্রী মশাই তো একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। এমন কী অন্যায় তিনি করেছেন যার জন্য তাঁর দণ্ড? তখন কবিগুরু একখানি লাঠি তাঁকে দিয়ে বললেন, ‘এই নিন দণ্ড। ফেলে গিয়েছিলেন’।
এ তো প্রায় অপমানের শামিল
মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবী কবিগুরুকে বেশ কয়েক দিন ধরে নিরামিষ খাওয়াচ্ছিলেন। তো একদিন মৈত্রেয়ী দেবী কিছু খাবার নিয়ে এসে বললেন, ‘এটা একটু খাবেন?রোজ রোজ আপনাকে কি নিরামিষ খাওয়াব ভেবে পাই না।’
কবিগুরু বললেন, ‘ও পদার্থটা কি?’
মৈত্রেয়ী দেবীর উত্তর—ব্রেইন।’
কবিগুরু বললেন, ‘এই দেখ কাণ্ড, এ তো প্রায় অপমানের শামিল। কি করে ধরে নিলে যে, ওই পদার্থটার আমার প্রয়োজন আছে? আজকাল কি আর আমি ভালো লিখতে পারছিনে?’
ঘরে একটা বাঁদর আছে
কবিগুরু এক সভায় হঠাৎ গম্ভীরভাবে বলে উঠলেন, ‘এই ঘরে একটা বাঁদর আছে।’
সভাস্থ সকলে দারুণ অস্বস্তিভরে যখন একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছেন, তখন গুরুদেব মৃদু হেসে বললেন, ‘ডানদিকে যেমন একটি দোর আছে, বা দিকেরও সেরকম আরেকটি দোর আছে।’
সকলে নিশ্বাস ছেড়ে বাঁচলেন।
এখনো এক মন হলি নে
একবার শান্তিনিকেতনে ওজনের একটি মেশিন ক্রয় করা হয় এবং এতে ছেলেমেয়েদের একে একে ওজন নেওয়া হচ্ছিল। রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা লক্ষ করছিলেন। এক একজনের ওজন শেষ হলেই কবি তাঁকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, ‘কিরে তুই কত হলি! এর মধ্যে একটি স্থুলকায় মেয়ে বলল, ‘দু’মন’। এই মেয়েটির সে সময় বিয়ের আলাপ চলছিল এবং কবি তা জানতেন । তাই তিনি পরিহাস করে বললেন, ‘তুই এখনো দু’মন, এখনো এক মন হলি নে?’