মঞ্চ

শেষ নবাবের শেষ সংলাপ

শেষ নবাব নাটকের দৃশ্য
শেষ নবাব নাটকের দৃশ্য

বলা যায় চেনা কাহিনি, জানা কাহিনি, তবু একটি বাণী আছে এতে। আর তা হলো, ‘যদি আর জন্মে আবার পলাশীতে আসার সুযোগ হয়, তাহলে আবার আমি মীর জাফরকে বিশ্বাস করব।’ কী বোঝাতে চাইলেন নাট্যকার সাঈদ আহমেদ তাঁর শেষ নবাব নাটকের এই শেষ সংলাপ দিয়ে? সম্ভবত বাঙালি জাতির বৃত্তাকার বিন্যস্ত নিয়তির কথাই বললেন তিনি। এক তীর্যক বাস্তবতা, যার অস্তিত্ব বর্তমানেও স্পষ্ট।
২৫ এপ্রিল রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হলো সাঈদ আহমেদ রচিত, গাজী রাকায়েত নির্দেশিত চারুনীড়ম প্রযোজনায় নাটক শেষ নবাব। উল্লেখ্য, নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছে চারুনীড়মের শিক্ষার্থীদের অভিনয়ে। চারুনীড়ম গাজী রাকায়েতের স্বপ্ন সংগঠন এবং সেই সংগঠনেরই উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় একঝাঁক তরুণ-তরুণীর সাম্প্রতিকতম শিল্প প্রচেষ্টা এই শেষ নবাব।
মানতেই হবে, শেষ নবাব নাটকটি সাঈদ আহমেদের পরিচিত নাট্যধারার সঙ্গে মেলে না, যে ধারাটিকে মার্টিন এসলিন শনাক্ত করেছিলেন ‘অ্যাবসার্ড’ সংজ্ঞায়। যদিও এ সংজ্ঞাটি নিয়ে বাংলাদেশের নাট্যবোদ্ধা অনেকের মধ্যেই মতানৈক্য আছে—এই বিশেষ নাট্যধারার এই সংজ্ঞার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকভাবে সম্ভব নয়। সাঈদ আহমেদের সব কটি নাটকই স্যামুয়েল বেকেট, ইউনেসকো, হ্যারল্ড পিন্টার, অ্যালবি, ও’নিল-এর নাট্যধারার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, শেষ নবাব ছাড়া। নিরপেক্ষ মন্তব্যে বলতেই হয়, সাঈদ আহমেদ ‘অ্যাবসার্ড’ নাট্যধারায় যতটা স্বচ্ছন্দ, তাঁর শেষ নবাব নাটকে সেই স্বাচ্ছন্দ্যের কিছুটা হলেও ঘাটতি আছে। বিশেষ করে রাকায়েত নির্দেশিত বর্তমান মঞ্চায়িত নাটকে তা স্পষ্ট হয়েছে। রাকায়েত একজন পূর্ণবর্ধিত নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক ও চলচ্চিত্রকার; সন্দেহাতীতভাবে তাঁর একাধিক নাটকে এর প্রমাণ মেলে। কিন্তু শেষ নবাব নাটকের নির্দেশনা ও উপস্থাপনায় সেই পূর্ণবর্ধিত গাজী রাকায়েতের কিছুটা হলেও অনুপস্থিতি প্রকাশিত হয়। তাই এ কথা বলাই যায়, সাঈদ আহমেদের নাট্যাকৃতি এই প্রযোজনায় তাঁর খ্যাতিমানতা ও দক্ষতার সমমানের হতে পারেনি। তবে অন্য বিষয়টিও বিচার্য—যে সম্ভাবনাময় তরুণ দল এই অভিনয়ে সম্পৃক্ত, তাদের মঞ্চপরিচয় অভিজ্ঞতা নাট্যনন্দন ধারণাও অপরিণত।
আপাতদৃষ্টে যে বিষয়গুলো সাঈদ আহমেদ স্পষ্ট করতে চেয়েছেন, তাঁর নাটকে সেগুলো হলো প্রাসাদ ষড়যন্ত্র; শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার নবাব হিসেবে ব্যর্থতা, দুর্বলতা ও অসহায়তা। এই সবকিছুর প্রেক্ষাপটে বিদেশি বানিয়াদের লোভী বাণিজ্য-আসক্তি ও ইংরেজদের সুদূরপ্রসারী উপনিবেশ-সম্প্রসারণ কূট মনোভাব। কিন্তু এ সবই তো গতানুগতিক ঐতিহাসিক সত্য। একজন পরিণত প্রজ্ঞাসম্পন্ন নাট্যকার হিসেবে সাঈদ আহমেদ এই গতানুগতিকতার শিকার হতে পারেন না। তিনি নাটকের গভীরে যা দেখাতে চেয়েছেন, সেটি হলো, ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের আগের রাতে সিরাজ ও ইংরেজ যুদ্ধশিবিরে বিরাজমান উত্তেজনা, উদ্বেগ, অনুমান ও ঘটনাপ্রবাহ। কিন্তু চারুনীড়মের পরিবেশনায় বিষয়টি অস্পষ্ট ছিল। নাটকের সংলাপ প্রক্ষেপণ, মঞ্চসজ্জা, আলো প্রক্ষেপণ, পোশাক এবং সর্বোপরি নাট্য গাঁথুনি বিষয়ে দ্বিতীয় চিন্তার অবকাশ আছে। প্রথম দিনের প্রদর্শনী হিসেবে এই দুর্বলতাগুলোতে সযত্ন দৃষ্টি দিলে চারুনীড়মের পরবর্তী প্রদর্শনীগুলো সুসংবদ্ধ হবে নিঃসন্দেহে।