'চির পুরাতন নতুন শিশু' মুস্তাফা মনোয়ার

বলছেন মুস্তাফা মনোয়ার, পাশে হাস্যোজ্জ্বল সন্‌জীদা খাতুন
বলছেন মুস্তাফা মনোয়ার, পাশে হাস্যোজ্জ্বল সন্‌জীদা খাতুন

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, চির পুরাতন নতুন শিশু। কথাটার মতোই সব শিল্পকলা শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের কাছে নতুন। তিনি বললেন, শিল্পকলা কখনো পুরোনো হয় না। কবিতা, গান, চিত্রকলা যত আগেই নির্মিত হোক না কেন, তা সব সময় নতুনই থাকে।


গতকাল কণ্ঠশীলন উদযাপন করে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের জন্মদিন। সংগঠনটির অন্যতম উপদেষ্টা তিনি। ১ সেপ্টেম্বর ছিল তাঁর ৮০ তম জন্মবার্ষিকী। ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনের রমেশচন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলনায়তনে সন্ধ্যায় শিল্পী এসব কথা বলেন। সঙ্গে ছিলেন ছায়ানট ও কণ্ঠশীলনের সভাপতি সন্‌জীদা খাতুন।

আয়োজনের পুরোটা সময় জুড়ে তাঁরা সঙ্গে ছিলেন, কিন্তু ছিলেন মিলনায়তনের একদম পেছনে। সেখান থেকেই শুনেছেন কণ্ঠশীলনের শিল্পীদের আবৃত্তি। রবীন্দ্রনাথের দুটো কবিতা পাঠের পর দলগত আবৃত্তি করা হলো সুকুমার রায়ের অনেকগুলো মজার মজার ছড়া।

এরপর শিল্পী বুলবুল ইসলাম মঞ্চে এসে জানালেন, তিনি এমন দুটো গান গাইবেন যেগুলো রবীন্দ্রনাথ কবিতা হিসেবে লিখেছিলেন। পরে তাতে সুর দেওয়া হয়েছিল। ‘খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচাটিতে’, ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ গানগুলো মুগ্ধ করলো দর্শকদের।

এবার মঞ্চে উঠলেন শিল্পী ইফফাত আরা দেওয়ান। প্রথমেই নিধু বাবুর টপ্পা-‘তোমারই তুলনা তুমি প্রাণ’। পরের গানটি ছিল ইন্দু বালার ‘ওরে মাঝি, তরী হেথা বেঁধো নাকো’। পরের দুটি গান ‘তুমি এসো হে’ ও ‘কী সুর বাজে’ শেষ হওয়ার পর পেছন থেকে সন্‌জীদা খাতুন গাইতে বললেন অতুল প্রসাদের একটি গান। শিল্পী গান ধরলেন, ‘আমি বাঁধিনু তোমার তীরে তরণী আমার’।

এরপর সামনে এলেন দুজন। কণ্ঠশীলনের পক্ষ থেকে মুস্তাফা মনোয়ারকে ফুল দেওয়া হলো, পরানো হলো উত্তরীয়। সন্‌জীদা খাতুন কণ্ঠশীলনের তরুণ কর্মীদের বললেন, ‘তোমরা মনোয়ারের কথা শোনো। মনোয়ার আমার পথেই। আমি যেমন ৮২ পেরিয়ে ৮৩-তে পড়েছি, মনোয়ারও আশিতে পড়ল। ৮০ যে হচ্ছে, তার মানে একটা মুশকিলের কথাও হচ্ছে। এখন তোমরা মনোয়ারের ক্লাস বেশি করে করবে। ওর গুণগুলো আয়ত্ত করে নেবে। খুব দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, আমরা আমাদের গুণী মানুষদের গুণগুলো ধরে রাখতে শিখিনি।’
আশিতেও আনন্দে

মুস্তাফা মনোয়ার বললেন পাকিস্তানি আমলের কথা। সে সময় বাংলা সংস্কৃতির যা কিছু শ্রেষ্ঠ তার সবগুলোকেই বিধর্মী সংস্কৃতি বলা হতো। সপ্তাহে একদিন রবীন্দ্রনাথের গান প্রচার করা যেত। তাঁর লেখা কোনো নাটক করা যেত না। তো একবার সিদ্ধান্ত হলো, ভারত ফারাক্কা বাঁধ দিচ্ছে। সেটার বিরুদ্ধে বেশি করে প্রচার করতে হবে। মুস্তাফা মনোয়ার এই সুযোগে রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’ নাটকটি করে ফেললেন। তখন খুব শোর উঠল, কেন এটা হলো? মুস্তাফা মনোয়ার বললেন, মুক্তধারা তো বাঁধ দেওয়ার বিরুদ্ধে বলে। তখন পাকিস্তানিরা বলে, ‘বহত আচ্ছা কিয়া’। এরপর তিনি ‘ডাকঘর’ নাটকটিও করলেন।

তখন সন্‌জীদা খাতুন বললেন ‘রক্তকরবী’র কথা বলতে। মুস্তাফা মনোয়ার বললেন, ‘পাকিস্তানি আমল থেকেই ইচ্ছা ছিল ‘রক্তকরবী’ করার। তো দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে একটা উদ্যোগ নিলাম। অভিনেতা গোলাম মুস্তাফা, সৈয়দ হাসান ইমামকে বলে রেখেছি, আপনাদের অভিনয় করতে হবে। কিন্তু নন্দিনী পাওয়া যাচ্ছিল না।’ পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে তিনি পেয়ে গেলেন নন্দিনীকে। তারপর হলো ‘রক্তকরবী’।

শিল্পী বললেন তাঁর বাবা কবি গোলাম মোস্তফার কথাও। বললেন, ‘তিনি অনেক ইসলামী সংগীত লিখেছেন। “বিশ্বনবী”র মতো বইয়ের লেখক তিনি। কিন্তু কখনো গোঁড়া ছিলেন না। নিজে ফটোগ্রাফি করতেন। কখনো বলেননি যে, এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না।’

সবশেষে মুস্তাফা মনোয়ার বললেন শিল্পী কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় (মোহর) যখন বাংলাদেশে এলেন সে সময়ের একটি ঘটনা। তিনি বলেন, ‘মোহরদি সেটে এসে গেছেন অনেকক্ষণ। ১১টায় গান করার কথা, ১২টা বেজে গেছে। মোহরদি আমাকে ডেকে বললেন, মনোয়ার, এত কী করছ! গানই তো গাইব। তো তারপরে আলো জ্বলল। মোহরদি চিৎকার করে আমাকে ডেকে বলেন, মনোয়ার পেছনে গুরুদেব এলেন কী করে!’

আসলে আলোটা এমন করে করা হয়েছিল, যেন পেছনে থাকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি। তার নিচে কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় গান গাইবেন। মুস্তাফা মনোয়ার বললেন, ‘মোহরদি এমনিতেই খুব সুন্দর ছিলেন। সেই আলোতে তাঁকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছিল। সেদিন খুব আনন্দ পেয়েছিলেন গান করে।’।

পাশ থেকে সন্‌জীদা খাতুন বলে উঠলেন, ‘মনোয়ার, মোহরদি বলেই অমন আলো করেছে। আমি হলে কিছুতেই করতো না।’

মুস্তাফা মনোয়ারের নির্মল হাসি ছড়িয়ে পড়ল মিলনায়তনে। শুরুতেই বলেছিলেন, চির পুরাতন নতুন শিশুর কথা। তিনিও তো তাই!