আজ ৭ নভেম্বর এই অভিনেত্রী, নির্মাতা ও মানবাধিকারকর্মী নন্দিতা দাসের জন্মদিন
আজ ৭ নভেম্বর এই অভিনেত্রী, নির্মাতা ও মানবাধিকারকর্মী নন্দিতা দাসের জন্মদিন

যে গল্পগুলো সবাই বলেন না, সেগুলোই বলেন নন্দিতা

বলিউডের তারকাজগতে নন্দিতা দাসের পরিচয়টি আলাদা। তাঁর অভিনীত ছবির কথা ভাবলে মনে পড়ে এমন কিছু চরিত্রকে, যাঁরা ভালোবাসার অধিকার চান, অন্যায়ের বিচার চান, নিজের মতো করে বাঁচতে চান। ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়েও সেই মানুষদের খুঁজেছেন তিনি। কখনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বিপর্যস্ত জনপদে, কখনো দেশভাগের ক্ষত বয়ে বেড়ানো লেখকের জীবনে, কখনো শহরের রাস্তায় খাবার পৌঁছে দেওয়া শ্রমিকের প্রতিদিনের সংগ্রামে।

আজ ৭ নভেম্বর এই অভিনেত্রী, নির্মাতা ও মানবাধিকারকর্মীর জন্মদিন। ১৯৬৯ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া নন্দিতা আজ ৫৭ বছর পূর্ণ করলেন। তিন দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে ১০টি ভাষায় ৪০টির বেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর নির্মাতাদের তালিকায় আছেন মৃণাল সেন, শ্যাম বেনেগাল, দীপা মেহতা, আদুর গোপালকৃষ্ণন, ঋতুপর্ণ ঘোষ ও মণি রত্নম। সমাজকর্মে স্নাতকোত্তর এই শিল্পীর কাছে চলচ্চিত্র নিজের ভাবনা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্র আমার জন্য একটা লক্ষ্যপূরণের হাতিয়ার ।’

চরিত্রের ভেতর দিয়ে কঠিন প্রশ্ন
দীপা মেহতার ‘ফায়ার’ সিনেমার কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। ১৯৯৬ সালের এই ছবিতে নন্দিতা সীতা, আর শাবানা আজমি রাধা। একই পরিবারের দুই ভাইয়ের স্ত্রী তাঁরা। দাম্পত্যের নিঃসঙ্গতা ও অবহেলার মধ্যে পরস্পরের কাছে আশ্রয় খুঁজে পান দুজন। সেই নির্ভরতা থেকে গড়ে ওঠে ভালোবাসা।

নারীর আকাঙ্ক্ষা, নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং পরিবারের চিরাচরিত বিধিনিষেধ—এসব প্রশ্ন সামনে এনেছিল ‘ফায়ার’। ভারতে ছবিটিকে ঘিরে তীব্র প্রতিবাদ ও সহিংসতাও হয়। সীতা চরিত্রের মধ্য দিয়ে নন্দিতা এমন এক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠেন, যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শিল্পের স্বাধীনতা ও সম্পর্কের সামাজিক স্বীকৃতির প্রশ্ন।

দুই বছর পর একই নির্মাতার ‘আর্থ’–এ তাঁকে দেখা যায় অন্য এক বিপন্ন পৃথিবীতে। দেশভাগের পটভূমিতে তৈরি ছবিটিতে তাঁর সহশিল্পী আমির খান ও রাহুল খান্না। ধর্মীয় বিভাজন কীভাবে চেনা মানুষের সম্পর্ক বদলে দেয়, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে আসে বিদ্বেষ—ছবিটির গল্পে তা উঠে আসে।

জগমোহন মুন্দ্রার ‘বাওয়ান্ডার’-এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই আরও প্রত্যক্ষ। রাজস্থানের সমাজকর্মী ভাঁওরী দেবীর ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও তাঁর বিচার পাওয়ার সংগ্রাম থেকে অনুপ্রাণিত ছবিটিতে নন্দিতার চরিত্রের নাম সাঁওরি। নির্যাতনের পরও যাঁকে সামাজিক বাধা ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়। বাস্তবের একজন মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি চরিত্রে অভিনয়ের দায়িত্ব কতটা, তা নিয়ে সে সময় কথা বলেছিলেন নন্দিতা। জানিয়েছিলেন, কয়েকটি দৃশ্য ধারণের অভিজ্ঞতা তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল।

বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছেও তাঁর একাধিক স্মরণীয় কাজ রয়েছে। মৃণাল সেনের ‘আমার ভুবন’ (২০০২) ছবিতে অভিনয় করেন কৌশিক সেন ও শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। এই ছবির জন্য কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান তিনি।

ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘শুভ মহরত’-এ নন্দিতা সাংবাদিক মল্লিকা সেন। চলচ্চিত্রের মহরতের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক অভিনেত্রীর মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন মল্লিকা। রাখী ও শর্মিলা ঠাকুরের পাশাপাশি এই রহস্যকাহিনিতে নন্দিতার চরিত্রও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুমন ঘোষের ‘পদক্ষেপ’-এ আবার কাজ করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

মেহরিন জব্বারের উর্দু ছবি ‘রামচাঁদ পাকিস্তানি’ কিংবা আদুর গোপালকৃষ্ণনের মালয়ালম ছবি ‘নালু পেন্নুঙ্গাল’ তাঁকে নিয়ে গেছে ভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে। ভাষা বদলেছে, গল্প বলার ধরন বদলেছে। প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাঁর নিজের জীবনকেও সমৃদ্ধ করেছে বলে জানিয়েছেন নন্দিতা।

নন্দিতা দাস। শিল্পীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

ক্যামেরার পেছনেও মানুষ
অভিনয়ে যে প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন, নির্মাতা হিসেবেও সেগুলো তাঁকে ভাবিয়েছে। পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র পরিচালনায় তাঁর অভিষেক ‘ফিরাক’ দিয়ে। ২০০৮ সালে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির প্রিমিয়ার হয়। তবে নির্মাণে হাতেখড়ি আরও আগে। নিজের ওয়েবসাইটে জানিয়েছেন, ১৯৯৩ সালে ‘ইমপ্রিন্ট ইন ক্লে’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন।

‘ফিরাক’-এর পটভূমি গুজরাটের ২০০২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পরবর্তী সময়। সহিংসতা থেমেছে, কিন্তু মানুষের মনের ভয় থামেনি। ঘর হারানো মানুষ, অনাথ শিশু, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত সংগীতশিল্পী—বিভিন্ন চরিত্রের জীবনে থেকে গেছে অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তা। তাদের গল্পগুলোকে পাশাপাশি এনে নন্দিতা দেখেছেন বিপর্যস্ত মানুষের সম্পর্ক ও বেঁচে থাকার সংকট। নাসিরুদ্দিন শাহ, দীপ্তি নাভাল ও পরেশ রাওয়াল অভিনীত ছবিটির চিত্রনাট্য তিনি লিখেছেন শুচি কোঠারির সঙ্গে।

প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের এক দশক পর আসে ‘মান্টো’। উর্দু কথাসাহিত্যিক সা’দত হাসান মান্টোর জীবনের চারটি অস্থির বছর নিয়ে নির্মিত ছবিটির প্রিমিয়ার হয় ২০১৮ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘আঁ সার্তেঁ রিগার’ বিভাগে। মান্টোর চরিত্রে অভিনয় করেন নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী। অন্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন রসিকা দুগাল ও তাহির রাজ ভাসিন।

প্রিয় শহর বোম্বে ছেড়ে লাহোরে যাওয়া, দেশভাগের অভিঘাত, আর্থিক অনটন, লেখার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ—এসবের মধ্যে নিজের স্বাধীন সত্তা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন মান্টো । সময়ের নিষ্ঠুর বাস্তবতা লিখতে গিয়ে একজন লেখককে কী মূল্য দিতে হয়, তা বুঝতে চেয়েছেন নন্দিতা। ছবিটি তৈরির ছয় বছরের অভিজ্ঞতা পরে লিখেছেন ‘মান্টো অ্যান্ড আই’ বইয়ে ।

ঢাকায় লিট ফেস্টে মান্টো দেখানোর পর কথা বলছেন নন্দিতা দাস। ছবি: প্রথম আলো

তৃতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য ‘জুইগাটো’য় তাঁর মনোযোগ শহরের শ্রমজীবী মানুষের দিকে। কারখানার চাকরি হারিয়ে মানস খাবার সরবরাহের কাজ নেয়। সংসার চালাতে তাকে ছুটতে হয় অ্যাপের নির্দেশনা মেনে। গ্রাহকের রেটিং ও বাড়তি আয়ের শর্তের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে প্রতিদিনই নতুন পরীক্ষার মুখে পড়ে সে। স্ত্রী প্রতিমাও উপার্জনের সুযোগ খুঁজতে শুরু করে। এই দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন কপিল শর্মা ও শাহানা গোস্বামী।

ওডিশার ভুবনেশ্বরে ধারণ করা ছবিটিতে আয়রোজগারের অনিশ্চয়তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দাম্পত্য, আত্মমর্যাদা ও নারীর স্বাধীনতার প্রশ্ন। নন্দিতা জানিয়েছেন, অতিমারির সময় ছবিটির ভাবনা আসে। খাবার সরবরাহকারীদের ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ছিল, অথচ তাঁদের সংগ্রাম আড়ালেই থেকে যাচ্ছিল। ২০২২ সালে টরন্টোতে বিশ্ব প্রিমিয়ারের পর বুসান ও কেরালার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয় ‘জুইগাটো’। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ২০২৩ সালের ১৭ মার্চ।

নিজের ভাবনার চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নন্দিতা দাস ইনিশিয়েটিভস’। প্রতিষ্ঠানটি ‘মান্টো’ ও ‘জুইগাটো’র সহপ্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত। ছোট পরিসরের কাজেও তাঁর সামাজিক ভাবনার প্রকাশ রয়েছে। ২০১৯ সালের দুই মিনিটের সংগীতচিত্র ‘ইন্ডিয়াস গট কালার’ গায়ের রং নিয়ে বৈষম্যকে প্রশ্ন করে। মানুষের ত্বকের রঙের বৈচিত্র্য উদ্‌যাপনের এই কাজে তাঁর সহযোগী ছিলেন মহেশ মাথাই ও অঙ্কুর তিওয়ারি।

পরের বছর ‘লিসেন টু হার’-এ তুলে ধরেন লকডাউনে নারীর ওপর বেড়ে যাওয়া কাজের চাপ ও পারিবারিক সহিংসতা । নিজের বাসায় ছেলেকে সহশিল্পী করে সীমিত উপকরণে ছবিটি ধারণ করেন। প্রায় সাত মিনিটের কাজটির নির্মাণে সহায়তা দেয় ইউনেসকো, ইউএনএফপিএ, ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন ও সাউথ এশিয়া ফাউন্ডেশন। নারীদের কথা বলতে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের কথা শোনার আবেদনও ছিল ছবিটিতে।

নন্দিতা দাস। ছবি: এএফপি

বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ
বাংলাদেশের দর্শকের সঙ্গে নন্দিতার সম্পর্ক পর্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মঞ্চনাটক ও সাহিত্য উৎসবের সূত্রেও একাধিকবার ঢাকায় এসেছেন তিনি।
২০১২ সালের নভেম্বরে নিয়ে আসেন ‘বিটুইন দ্য লাইনস’। স্বামী সুবোধ মাসকারার সঙ্গে নাটকটিতে অভিনয় করেন; নির্দেশনাও ছিল তাঁর। শিক্ষিত ও সচ্ছল এক দম্পতির সম্পর্কে আধুনিকতা ও প্রচলিত ধ্যানধারণার টানাপোড়েন ছিল নাটকের বিষয়।

২০১৮ সালে আবার আসেন ঢাকা লিট ফেস্টে। উৎসবে ‘মান্টো’ প্রদর্শিত হয়, ছবিটি নিয়ে আলোচনায়ও অংশ নেন নন্দিতা । সেই সফরে ৯ নভেম্বর সোনারগাঁও হোটেলে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজের চলচ্চিত্রভাবনা ব্যাখ্যা করেন।

কলেজজীবনে মান্টোর ছোটগল্প পড়েছিলেন তিনি। পরে লেখকের প্রবন্ধ পড়ে নতুন করে আকৃষ্ট হন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় সংঘাত ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে মান্টোর ভাবনায় নিজের সময়ের সংকটের মিল খুঁজে পান। অতীতের একজন লেখককে নিয়ে ছবি বানাতে গিয়েও তাই তাঁর চোখ ছিল বর্তমানের দিকে।
বাংলাদেশে নিজের সামাজিক কাজের প্রতিধ্বনিও শুনেছিলেন নন্দিতা। গায়ের রং নিয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে ‘ডার্ক ইজ বিউটিফুল’ প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত তিনি। ওই সাক্ষাৎকারে জানান, এর অনুপ্রেরণায় বাংলাদেশে ‘সুন্দর মানে ফরসা নয়’ উদ্যোগের কথা শুনে আনন্দিত হয়েছেন।

নন্দিতা দাস। এক্স থেকে

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
অভিনয় ও নির্মাণ—দুই ক্ষেত্রেই দেশের সীমানা পেরিয়ে স্বীকৃতি পেয়েছেন নন্দিতা। মৃণাল সেনের ‘আমার ভুবন’-এ অভিনয়ের জন্য কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। ‘বাওয়ান্ডার’-এর অভিনয় তাঁকে এনে দেয় সান্তা মনিকা চলচ্চিত্র উৎসবের সেরা অভিনেত্রীর সম্মান। ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির দর্শকের কাছেও তাঁর চরিত্রগুলো পৌঁছে গেছে।
নির্মাতা হিসেবেও প্রথম ছবিতেই সাড়া পান তিনি। ২০০৮ সালে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ারের পর ‘ফিরাক’ বিভিন্ন দেশের উৎসবে প্রদর্শিত ও পুরস্কৃত হয় । ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি অনুযায়ী, ছবিটি ৫০টির বেশি উৎসবে অংশ নিয়েছে এবং ২০টির বেশি পুরস্কার পেয়েছে। ভারতের ৫৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘ফিরাক’-এর সম্পাদনার জন্য এ শ্রীকর প্রসাদ এবং শিল্পনির্দেশনার জন্য গৌতম সেন পুরস্কৃত হন।

সিনেমার দৃশ্যে নন্দিতা দাস। আইএমডিবি

নন্দিতার ব্যক্তিগত সম্মাননার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফরাসি সরকারের ‘নাইট অব দ্য অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স’। শিল্প ও সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান পান তিনি। ২০১১ সালে ইন্টারন্যাশনাল উইমেনস ফোরামের ‘হল অব ফেম’-এ অন্তর্ভুক্ত হন। ২০১৪ সালে নির্বাচিত হন ইয়েল ওয়ার্ল্ড ফেলো হিসেবে। শিল্পচর্চার পাশাপাশি নারী, শিশু ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে তাঁর কাজও এসব আন্তর্জাতিক পরিচিতিতে গুরুত্ব পেয়েছে।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবগুলো তাঁকে বিচারকের দায়িত্বও দিয়েছে। ২০০৫ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতার বিচারকমণ্ডলীতে ছিলেন নন্দিতা। ২০১৩ সালে আবার আমন্ত্রণ পান একই উৎসবের সিনেফঁদাসিওঁ ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগের বিচারক হিসেবে। এর মধ্যে ২০০৭ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের কার্লোভি ভেরি এবং পরে ২০১৫ সালে স্পেনের সান সেবাস্তিয়ান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল বিচারকমণ্ডলীতে দায়িত্ব পালন করেন।

সাম্প্রতিক সংযোজন ২০২৫ সালের বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। উৎসবের ৩০তম আসরে নতুনভাবে চালু হওয়া প্রতিযোগিতা বিভাগের সাত সদস্যের বিচারকমণ্ডলীতে ছিলেন নন্দিতা। কোরীয় নির্মাতা না হং-জিনের নেতৃত্বাধীন এই দলে তাঁর সঙ্গে ছিলেন টনি লিয়াং কা-ফাই, মারজিয়ে মেশকিনি ও কোগোনাদার মতো চলচ্চিত্রব্যক্তিত্ব।

এবার সম্পর্কের ভেতরে
নন্দিতার পরিচালনায় সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘জুইগাটো’। অভিনয়ে সাম্প্রতিক কাজের মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালের তেলেগু ছবি ‘বিরাট পর্বম’। এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের। বিষয় সম্পর্ক, বিয়ে, বিচ্ছেদ ও মাতৃত্ব। নিজের ওয়েবসাইটে একে এখন পর্যন্ত তাঁর সবচেয়ে ব্যক্তিগত ছবি বলে উল্লেখ করেছেন।

২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত ইন্ডিয়া কারেন্টসের সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, নতুন ছবির অর্থসংস্থানের উদ্যোগ এবার নিজেই নিচ্ছেন। আগের তিন ছবির বিপণন ও পরিবেশনার অভিজ্ঞতা তাঁর পুরোপুরি সন্তোষজনক ছিল না। তাঁর মনে হয়েছে, এসব ছবির দর্শক যতটা ভাবা হয়, তার চেয়ে বেশি। কিন্তু আগ্রহী দর্শকের কাছেও অনেক সময় ছবি পৌঁছায় না। নতুন কাজের শুরু থেকেই সেই বিষয়টি বিবেচনায় রাখছেন।

এই ছবিতে তিনি বুঝতে চান, প্রথা ও আধুনিকতার মাঝখানে মানুষ কীভাবে সম্পর্ক সামলায়। সমান বলে বিবেচিত দুজনের মধ্যেও কীভাবে সূক্ষ্ম বৈষম্য থেকে যায়। কাউকে খলনায়ক বানানো কিংবা বিবাহপ্রতিষ্ঠানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো তাঁর উদ্দেশ্য নয়। বরং সম্পর্কের জটিলতাকে কাছ থেকে দেখা।

‘ফিরাক’-এর বিপর্যস্ত জনপদ থেকে ‘জুইগাটো’র ব্যস্ত শহর ঘুরে এবার নন্দিতা তাকাতে চাইছেন সম্পর্কের অন্তরঙ্গ পরিসরে। সেখানেও তাঁর খোঁজ মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং পরস্পরকে বোঝার সম্ভাবনা।

সূত্র: নন্দিতা দাসের নিজস্ব ওয়েবসাইট, প্রথম আলোয় প্রকাশিত মতিউর রহমানের নেওয়া সাক্ষাৎকার, ইন্ডিয়া কারেন্টস, ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট।