বিকিনি আর বদলে যাওয়া বলিউড, সত্তরের দশকের নায়িকারা যেভাবে পাল্টে দিয়েছিলেন হিন্দি সিনেমা

একটা সময় ছিল, যখন হিন্দি ছবিতে নায়িকাদের আবেদনময় উপস্থিতি ছিল অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ। প্রেম মানেই ফুলের আড়ালে মুখ লুকানো, নায়ক-নায়িকার আলিঙ্গনের বদলে দুটো পাখির ওড়াউড়ি কিংবা ঢেউয়ের আছড়ে পড়া। চুম্বন বা অন্তরঙ্গ দৃশ্য তো দূরের কথা, নায়িকার পোশাকেও ছিল রক্ষণশীলতার স্পষ্ট ছাপ। কিন্তু সত্তরের দশকে এসে সেই পরিচিত বলিউড যেন আচমকাই বদলে যেতে শুরু করল। রুপালি পর্দায় দেখা গেল বিকিনি, শরীরী আবেদনের প্রকাশ, সাহসী রোমান্স, এমনকি যৌনতা নিয়ে সরাসরি কথা বলারও চেষ্টা।

এই পরিবর্তন রাতারাতি ঘটেনি। এর পেছনে ছিল সমাজের বদলে যাওয়া রুচি, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব, নগরজীবনের প্রসার, নতুন প্রজন্মের দর্শকের চাহিদা এবং এমন কিছু অভিনেত্রী, যাঁরা প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে দ্বিধা করেননি। তাঁদের কেউ প্রশংসা পেয়েছেন, কেউ কটাক্ষের শিকার হয়েছেন, আবার কেউ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও সময়ের সঙ্গে হয়ে উঠেছেন বলিউডের আইকন।

সত্তরের দশকে বিকিনি, একটি ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গন কিংবা একটু খোলামেলা পোশাকই জাতীয় বিতর্কের জন্ম দিত। সংবাদপত্রে সম্পাদকীয় লেখা হতো, সংসদ পর্যন্ত প্রশ্ন উঠত, সেন্সর বোর্ড দৃশ্য কেটে দিত, আবার সেই বিতর্কই সিনেমার ব্যবসাও বাড়িয়ে দিত। এই এক দশকই বদলে দিয়েছিল বলিউডে নারীর উপস্থাপনা, গ্ল্যামারের সংজ্ঞা এবং দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি।

ষাটের দশকের শেষেই শুরু হয়েছিল ঝড়
ভারত তখনো স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্র গঠনের পথে। সামাজিক মূল্যবোধে পরিবার, সংস্কার ও শালীনতার প্রভাব ছিল প্রবল। ফলে সিনেমাতেও সেই প্রতিফলন দেখা যেত। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে নায়িকারা সাধারণত শাড়ি কিংবা সালোয়ার-কামিজেই সীমাবদ্ধ থাকতেন। প্রেমের দৃশ্যেও শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলতেন পরিচালকেরা। ভারতীয় সেন্সর বোর্ডও কঠোর অবস্থানে ছিল। চুম্বন, অতিরিক্ত শরীর প্রদর্শন কিংবা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য সহজে ছাড়পত্র পেত না।

তবে পৃথিবী তখন বদলাচ্ছিল। ইউরোপ ও আমেরিকায় যৌনবিপ্লব, হিপ্পি সংস্কৃতি, রকসংগীত, নতুন ফ্যাশন—সবকিছুর প্রভাব ধীরে ধীরে ভারতের শহুরে তরুণদের মধ্যেও পৌঁছাতে শুরু করে। বলিউডও বুঝতে পারে, নতুন দর্শককে আকর্ষণ করতে হলে নতুন ভাষায় গল্প বলতে হবে।

‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’–এ শর্মিলা ঠাকুর। আইএমডিবি

বলিউডে বিকিনি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল আসলে ষাটের দশকের মাঝামাঝি। সেই সময় পরিচালক শক্তি সামন্ত তাঁর ১৯৬৭ সালের ছবি ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’–এ শর্মিলা ঠাকুরকে বিকিনিতে হাজির করেন। ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় একজন প্রথম সারির নায়িকার এমন উপস্থিতি ছিল নজিরবিহীন।

ছবি মুক্তির আগেই পোস্টার নিয়ে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। অনেকেই মনে করেছিলেন, একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের শিক্ষিত অভিনেত্রীর এমন পোশাক গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু শর্মিলা ঠাকুর পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে জানান, বিকিনি পরার সিদ্ধান্তটি পরিচালকের চাপ নয়; বরং তিনিই মনে করেছিলেন, বিদেশে অবকাশযাপনের গল্পে বিকিনি স্বাভাবিক পোশাক। বিতর্কের মধ্যেই ছবি ব্যবসায়িক সাফল্য পায়। আর শর্মিলা হয়ে ওঠেন ভারতীয় সিনেমার আধুনিকতার নতুন প্রতীক।

সেই সময় ভারতের সংসদেও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সংবাদপত্রে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল। রক্ষণশীল সমাজ বলেছিল, ভারতীয় সংস্কৃতি বিপন্ন। অথচ যাঁকে ঘিরে এত বিতর্ক, সেই অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর পরে অবলীলায় বলেছিলেন, ‘বিকিনি পরার সিদ্ধান্তটা আসলে আমারই ছিল।’

১৯৬৬ সালের এক দুপুর। মুম্বাইয়ের একটি স্টুডিওতে চলছে একটি ফটোশুট। আলোকচিত্রী ধীরেন চাওড়া ক্যামেরা ঠিক করছেন। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তখনকার উঠতি তারকা শর্মিলা ঠাকুর। হাতে একটি টু-পিস বিকিনি। আলোকচিত্রীই নাকি প্রথমে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন। ‘আপনি কি নিশ্চিত?’—শর্মিলাকে প্রশ্ন করেছিলেন তিনি। শর্মিলার উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত—হ্যাঁ।

সেই কয়েকটি ছবি শুধু একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ বদলায়নি; বদলে দিয়েছিল ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির ইতিহাসও। ১৯৬৬ সালে ফিল্মফেয়ারের সেই বিকিনি প্রচ্ছদ প্রকাশের পর গোটা দেশে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। এক বছর পর শক্তি সামন্তের ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’ ছবিতে সুইম স্যুট পরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সেই বিতর্ককে আরও বড় করে তোলেন শর্মিলা।

দীর্ঘ কয়েক দশক পর ফিরে তাকিয়ে শর্মিলা ঠাকুর সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে বিস্ময়ই প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, ‘ছবিগুলো তোলার সময় আমার কোনো দ্বিধা ছিল না। পরে মানুষ যখন এত তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করল, তখন আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি তো ভেবেছিলাম, আমাকে সুন্দরই দেখাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে ভাবলেন, আমি ইচ্ছা করেই প্রচারের জন্য করেছি। বিষয়টা মোটেও তা ছিল না। হয়তো তরুণ বয়সে একটু অন্য রকম কিছু করার ইচ্ছা ছিল।’

‘ববি’ বদলে দিল অনেক কিছু
১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি শুধু একটি প্রেমের গল্প ছিল না; এই ছবিতের ডিম্পল কাপাডিয়ার সাহসী পোশাক, খোলামেলা রোমান্টিক দৃশ্য সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কিশোরী বয়সে ডিম্পল কাপাডিয়ার সাহসী উপস্থিতি দর্শকদের বিস্মিত করেছিল। অনেকে ছবিটির প্রশংসা করেন, আবার অনেকে অভিযোগ তোলেন—হিন্দি সিনেমা অতিরিক্ত সাহসী হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিতর্ক থামেনি, বরং ছবিটি বিশাল ব্যবসাসফল হয়। এরপর প্রযোজকেরা আরও বেশি সাহসী গল্প নির্মাণে উৎসাহ পান।

‘ববি’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

সেন্সর বোর্ডের সঙ্গে টানাপোড়েন
সেই সময় ভারতের সেন্সর বোর্ড বহু দৃশ্য কেটে দিত। কোনো দৃশ্যে ক্যামেরা কতক্ষণ থাকবে, পোশাক কতটা খোলামেলা হবে কিংবা আলিঙ্গন কত দীর্ঘ হতে পারবে—এসব নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা চলত। অনেক পরিচালক অভিযোগ করতেন, আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা বানাতে গেলে এমন কঠোর নিয়ম বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে সেন্সর বোর্ডের যুক্তি ছিল, ভারতীয় সমাজের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ রক্ষা করা তাদের দায়িত্ব। এই টানাপোড়েন দশকজুড়েই চলেছিল।

অন্তরঙ্গ দৃশ্যের নতুন ভাষা
সত্তরের দশকের চলচ্চিত্রে শুধু পোশাক নয়, রোমান্টিক দৃশ্য নির্মাণের ধরনও বদলে যায়। আগে যেখানে ফুল, বৃষ্টি কিংবা পাহাড় দিয়ে প্রেম বোঝানো হতো, সেখানে ধীরে ধীরে হাত ধরা, আলিঙ্গন, কাছাকাছি বসা কিংবা আবেগঘন মুহূর্তগুলো আরও বাস্তবভাবে দেখানো শুরু হয়।

তবে আজকের মানদণ্ডে সেই দৃশ্যগুলো খুবই সংযত বলেই মনে হবে। কিন্তু সে সময় এগুলোই ছিল বড় সাহসিকতার পরিচয়।

এ পরিবর্তনই পরবর্তী দশকে বলিউডকে সম্পূর্ণ নতুন পথে নিয়ে যায়।
এ সময়েই ছবির পোস্টারে নায়িকার আবেদনময় উপস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়। আগে যেখানে নায়ক ছিলেন প্রচারণার মূল মুখ, সেখানে ধীরে ধীরে নায়িকার গ্ল্যামারও ব্যবসার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে। অবশ্য এর বিরোধিতাও কম ছিল না। সমাজের একাংশের অভিযোগ ছিল, হিন্দি সিনেমা ধীরে ধীরে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ করছে। আবার অনেক চলচ্চিত্র সমালোচক বলেছিলেন, একজন নারীকে শুধুই আকর্ষণের বস্তু হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এই বিতর্ক আজও পুরোপুরি থামেনি।

‘জুলি’: প্রেম, মাতৃত্ব এবং সামাজিক ট্যাবু
১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জুলি’ সেই সময়ের অন্যতম আলোচিত ছবি। অবিবাহিত নারীর গর্ভধারণ, আন্তধর্মীয় প্রেম এবং সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে নির্মিত এই সিনেমা রক্ষণশীল দর্শকদের একাংশকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। ছবিতে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ছিল, তবে তার চেয়েও বেশি আলোচনায় আসে বিষয়বস্তু। কারণ, ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় তখনো যৌনতা বা অবিবাহিত মাতৃত্ব নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা খুবই বিরল ছিল।
সমালোচনা যেমন হয়েছে, তেমনি ছবিটি ব্যবসায়িকভাবেও সফল হয়। ফলে প্রমাণিত হয়, দর্শক শুধু বিনোদনই নয়, নতুন ধরনের গল্পও গ্রহণ করতে প্রস্তুত।

‘সত্যম শিবাম সুন্দরম’ সিনেমায় শশী কাপুর ও জিনাত আমান। আইএমডিবি

‘সত্যম শিবম সুন্দরম’: নান্দনিকতা নাকি অশ্লীলতা
১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি নিয়ে বিতর্ক যেন চরমে পৌঁছায়। ছবিতে জিনাত আমানের পোশাক, ক্যামেরার ভাষা ও শরীরী আবেদন নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। কেউ ছবিটিকে নারীর সৌন্দর্যের নান্দনিক উদ্‌যাপন বলেছিলেন, আবার কেউ একে অপ্রয়োজনীয় শরীর প্রদর্শনের উদাহরণ হিসেবে দেখেছিলেন। পরিচালকের বক্তব্য ছিল, বাহ্যিক সৌন্দর্য আর অন্তরের সৌন্দর্যের দ্বন্দ্বই ছবির মূল বিষয়। কিন্তু বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে নায়িকার পোশাক। অনেক শহরে ছবিটি নিয়ে বিক্ষোভ হয়, সেন্সর বোর্ডও আপত্তি তোলে। অথচ সব বিতর্ক পেরিয়ে ছবিটি ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত সৃষ্টি হয়ে ওঠে।

সেই সময়ের নায়িকারা
যদি একজন অভিনেত্রীর নাম বলতে হয়, যিনি সত্তরের দশকে বিকিনিকে বলিউডে স্বাভাবিক করে তুলেছিলেন, তবে তিনি জিনাত আমান।

১৯৭১ সালে ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ ছবিতে তিনি একেবারে অন্য ধরনের আধুনিক ভারতীয় নারীর প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেন। যদিও সেখানে বিকিনি প্রধান বিষয় ছিল না, কিন্তু তাঁর পর্দার ব্যক্তিত্ব ভারতীয় নায়িকার প্রচলিত ধারণা বদলে দেয়। এরপর ‘ইয়াদোঁ কি বারাত’, ‘ধর্ম বীর’, ‘হীরা পান্না’, ‘ডন’, ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’—একের পর এক ছবিতে পশ্চিমা পোশাক, সুইম স্যুট কিংবা বিকিনিতে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের কাছে নতুন বাস্তবতা হয়ে ওঠে।

জিনাত আমান। আইএমডিবি

জিনাতের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল, তিনি বিকিনিকে শুধু গ্ল্যামারের উপাদান বানাননি; বরং আত্মবিশ্বাসী, স্বাধীনচেতা নারীর চিত্রও গড়ে তুলেছিলেন। যাঁকে বলিউড ‘সেক্স সিম্বল’ বানিয়েছিল, তিনি নিজে সেই পরিচয়ে কখনোই স্বস্তি পাননি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জিনাত আমান বলেন, ‘কেউ আমার চিন্তাশক্তি বা সৃজনশীলতা নিয়ে আগ্রহী ছিল না। তারা আরও ক্লিভেজ, আরও বৃষ্টিতে নাচ দেখতে চাইত।’ তাঁর আক্ষেপ, পরিচালকেরা প্রায়ই তাঁর অভিনয়ের চেয়ে গ্ল্যামারকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
জিনাত আমানের সঙ্গে প্রায় সমান্তরাল সময়েই উঠে আসেন পারভীন ববি। তিনি ছিলেন বলিউডের প্রথম দিকের সেই নায়িকাদের একজন, যাঁর পর্দার উপস্থিতি ছিল আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। বিকিনি, শর্টস, ওয়েস্টার্ন গাউন—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ। ‘অমর আকবর অ্যান্থনি’, ‘সুহাগ’, ‘শান’, ‘কালিয়া’, ‘নমক হালাল’—এ ধরনের ছবিতে তাঁর পোশাকের ধরন ভারতীয় সিনেমায় নতুন ফ্যাশনের সূচনা করে। পারভীন ববির জনপ্রিয়তা দেখিয়ে দেয়, দর্শক এখন আধুনিক নায়িকাকেও গ্রহণ করতে প্রস্তুত।

১৯৭৩ সালে ‘ববি’ মুক্তির পর ডিম্পল কাপাডিয়া রাতারাতি জাতীয় তারকায় পরিণত হন। পরিচালক রাজ কাপুর তাঁর ছবিতে কিশোর প্রেমের গল্পের সঙ্গে আধুনিক পোশাকের ব্যবহার করেন। বিকিনি ও সুইমওয়্যারের দৃশ্য নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছিল। অনেকেই অভিযোগ করেছিলেন, অল্প বয়সী নায়িকাকে অতিরিক্ত আবেদনময় করে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি ছিল, ছবির চরিত্রের সামাজিক অবস্থান ও জীবনযাত্রার সঙ্গে সেই পোশাক মানানসই। বিতর্ক সত্ত্বেও ‘ববি’ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সফল চলচ্চিত্রে পরিণত হয়।

পারভীন ববি। আইএমডিবি

রাজ কাপুর ও অন্যান্য
রাজ কাপুরকে অনেকেই বলিউডের সবচেয়ে সাহসী নির্মাতাদের একজন মনে করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সৌন্দর্য ও প্রেমকে শিল্পের অংশ হিসেবে দেখানো যায়। তাই তাঁর ছবিতে বারবার নারীদেহের নান্দনিক উপস্থাপন দেখা গেছে। ‘ববি’, পরে ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’, আরও পরে ‘রাম তেরি গঙ্গা ম্যায়লি’—প্রতিটি ছবিই মুক্তির সময় বিতর্কের জন্ম দেয়। সমালোচকেরা তাঁকে অশ্লীলতার অভিযোগে অভিযুক্ত করলেও তাঁর সমর্থকদের মতে, তিনি ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় সাহসী ভিজ্যুয়াল ভাষা তৈরি করেছিলেন।

পরিচালক নাসির হুসেইনের ছবিগুলোয় ষাট ও সত্তরের দশক থেকেই আধুনিক ফ্যাশনের প্রভাব দেখা যায়। বিদেশি লোকেশন, সমুদ্রসৈকত, ক্যাবারে, ওয়েস্টার্ন পোশাক—সব মিলিয়ে তাঁর ছবিগুলো তরুণ দর্শকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছিল। জিনাত আমানকে তিনি যেভাবে উপস্থাপন করেন, তা পরবর্তী নির্মাতাদেরও প্রভাবিত করে।

সত্তরের শেষ দিকে ফিরোজ খান বলিউডে হলিউড ঘরানার গ্ল্যামার নিয়ে আসেন। বিদেশে শুটিং, বিলাসবহুল জীবনযাপন, খোলামেলা পোশাক—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর সিনেমাগুলো অন্যদের থেকে আলাদা ছিল। পরে ‘কুরবানি’ ছবিতে এই ধারা আরও জনপ্রিয় হয়, যদিও সেটি আশির দশকের শুরু।

শুধু পোশাক নয়, বদলে যাচ্ছিল নারীর চরিত্রও
বিকিনি বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এটি। আগের দশকের নায়িকারা ছিলেন মূলত লাজুক, ঘরোয়া ও ত্যাগী চরিত্রের প্রতীক। সত্তরের দশকে তাঁদের জায়গায় আসতে শুরু করেন আত্মবিশ্বাসী, শিক্ষিত, স্বাধীনচেতা নারীরা। জিনাত আমান কিংবা পারভীন ববি শুধু পোশাকের জন্য আলোচিত হননি; তাঁরা এমন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যারা নিজের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়। অর্থাৎ বিকিনি ছিল বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের দৃশ্যমান প্রতীক মাত্র।

টাইমস অব ইন্ডিয়া, ফিল্মফেয়ার, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে