কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ। ক্যাম্পাসে সহিংসতার ঘটনা ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি অভিযোগ করেছেন, ভবিষ্যতের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রভাবিত ও ভয় দেখানোর চেষ্টা চলছে।
ভারতের কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের (এসআরএফটিআই) শিক্ষার্থীরা ১২ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। ক্যাম্পাসে সহিংসতার ঘটনার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দাবিতে তাঁরা প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্য সন্তোষ আজমেরার পদত্যাগও দাবি করেছেন। তাঁদের আন্দোলনে এবার সংহতি জানালেন ৭৬ বছর বয়সী অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ।
২৪ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় নাসিরুদ্দিন শাহ ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর দলটি নিজেদের মতাদর্শ ও নীতির সঙ্গে একমত নন—এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ করছে।
এর সর্বশেষ শিকার চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন দেখা এসআরএফটিআইয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁর ভাষ্যে, ‘বাংলার নির্বাচনে কারসাজির মাধ্যমে জয় পাওয়ার পর বিজেপি এখন তাদের মতাদর্শ ও নীতির সঙ্গে একমত নন—এমন সবার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে উঠে পড়ে লেগেছে বলে মনে হচ্ছে।’
ভিডিও বার্তায় অভিনেতা বলেন, প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি তাঁদের হোস্টেল ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাসিরুদ্দিন শাহর ভাষ্য, নিজেদের পক্ষে প্রচার চালানোতেই বিজেপি সন্তুষ্ট নয়; ভবিষ্যতের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মগজধোলাই করার কিংবা ভয় দেখানোর চেষ্টাও চলছে। তবে এমন চেষ্টা সফল হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এই তরুণেরাই ভবিষ্যতে নিজেদের দেশ, সমাজ ও সময়ের বাস্তবতা তুলে ধরবেন।
ভিডিওর শেষে এসআরএফটিআইয়ের শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানাতে সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান অভিনেতা।
কী ঘটেছে এসআরএফটিআইয়ে
চলতি বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর কলকাতার এই চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের (এবিজিপি) সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংগঠনটি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওই ঘটনার পর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এরপর ৪ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির ফটকের কাছে বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সদস্যদের আয়োজিত এক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেও উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের দাবি, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এসব ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
১৬ অক্টোবর এসআরএফটিআই কর্তৃপক্ষের এক বিজ্ঞপ্তিতে চলচ্চিত্র, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়া বিভাগের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখার কথা জানানো হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হোস্টেল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের দপ্তরের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতার ঘটনায় প্রশাসনের জবাবদিহি এবং শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
পাশে দাঁড়িয়েছেন পায়েল কাপাডিয়াও
এসআরএফটিআইয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা পায়েল কাপাডিয়া। তাঁর নির্মিত ‘অল উই ইমাজিন অ্যাজ লাইট’ ২০২৪ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে গ্রাঁ প্রি পুরস্কার জিতেছিল। ক্যাম্পাসের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নাসিরুদ্দিন শাহ দীর্ঘদিন ধরেই অভিনয়ের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন। এবার চলচ্চিত্রের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তাঁর সমর্থন ক্যাম্পাসের পরিস্থিতিকে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই এই সমর্থন এসেছে। তবে বিজেপির বিরুদ্ধে নাসিরুদ্দিন শাহর
প্রতিশোধপরায়ণতা ও শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করার অভিযোগ তাঁর নিজস্ব বক্তব্য; সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ছাড়া এসব অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।
এএনআই অবলম্বনে