
মুম্বাইয়ের ছোট্ট এক কামরার বাসা। সেখানে বাবার কিনে দেওয়া টেলিভিশন, গ্যাস আর একটি গদি। নিজের খাটও ছিল না। পরে প্রথম উপার্জনের টাকা দিয়ে সেই খাট কিনেছিলেন ওয়ামিকা গাব্বি।
মুম্বাইয়ে থাকার সময় একদিন কেনাকাটার জন্য বাবার কাছে ১৫ হাজার রুপি চেয়েছিলেন। বাবা টাকা দিয়েছিলেন। অনেক বছর পর ওয়ামিকা জানতে পারেন, মেয়েকে দেওয়ার সেই টাকা ধার করেছিলেন বাবা।
সেই ওয়ামিকাই আজ বলিউডের পরিচিত মুখ। হিন্দির পাশাপাশি পাঞ্জাবি, তামিল, তেলেগু ও মালয়ালম ভাষার ছবিতে কাজ করেছেন। ওটিটিতেও তৈরি করেছেন আলাদা পরিচিতি। কিন্তু এই জায়গায় পৌঁছানোর পথটা মোটেও সহজ ছিল না।
২৯ সেপ্টেম্বর জন্মদিন ওয়ামিকা গাব্বির। ১৯৯৩ সালের এই দিনে চণ্ডীগড়ে জন্ম তাঁর।
১৩ বছরেই পর্দায়
অভিনয়ের সঙ্গে ওয়ামিকার পরিচয় খুব ছোটবেলায়। ২০০৭ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ইমতিয়াজ আলীর ‘জব উই মেট’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। কারিনা কাপুর অভিনীত গীতের কাজিনের চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে।
এরপর ‘লাভ আজ কাল’, ‘মৌসম’সহ কয়েকটি ছবিতে ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। ২০১৩ সালে ‘সিক্সটিন’ ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। কিন্তু শিশুশিল্পী হিসেবে পর্দায় আসার পরও হিন্দি সিনেমায় দ্রুত বড় সুযোগ পাননি।
বরং পাঞ্জাবি সিনেমায় ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন। পরে তামিল, তেলেগু ও মালয়ালম ছবিতেও কাজ করেন। ‘গোধা’ ছবিতে কুস্তিগিরের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। আঞ্চলিক সিনেমায় কাজ করলেও হিন্দি সিনেমায় বড় সুযোগের অপেক্ষা চলছিল।
বাবার ধার করা ১৫ হাজার
মুম্বাইয়ের শুরুর দিনগুলোর গল্প বলতে গিয়ে ওয়ামিকা তাঁর বাবার কথা বারবার বলেছেন।
২০২৫ সালে ‘কার্লি টেলস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মুম্বাইয়ে থাকার সময় একবার কেনাকাটার জন্য বাবার কাছে ১৫ হাজার রুপি চেয়েছিলেন। বাবা দিয়েছিলেন। অনেক বছর পর জানতে পারেন, সেই রুপি বাবা ধার করে দিয়েছিলেন।
ঘটনাটি তখন জানতেন না ওয়ামিকা। পরে বুঝেছিলেন, বাবা চাইলে তাঁকে না-ও বলতে পারতেন। কিন্তু মেয়ের প্রয়োজন মেটাতে অন্যভাবে টাকা জোগাড় করেছিলেন তিনি। ওয়ামিকার কাছে ঘটনাটি হয়ে ওঠে বাবার সমর্থনের বড় প্রমাণ।
সেই সময়ের আরেকটি স্মৃতিও মনে রেখেছেন তিনি। মুম্বাইয়ের ইয়াড়ি রোডের কাছে একটি এক শয্যার বাসায় থাকতেন ওয়ামিকা। বাবা তাঁর জন্য কিনে দিয়েছিলেন টেলিভিশন, একটি গদি আর গ্যাস। পরে নিজের প্রথম উপার্জনের টাকা দিয়ে প্রথম খাট কেনেন তিনি।
লাখ টাকার কাজও করেননি
মুম্বাইয়ে যাওয়ার আগে বড় পারিশ্রমিকের প্রস্তাবও পেয়েছিলেন ওয়ামিকা গাব্বি। সনির একটি ধারাবাহিকে প্রধান চরিত্রের প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। ‘কার্লি টেলস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাজটি করলে মাসে প্রায় চার লাখ রুপি আয় করতে পারতেন ওয়ামিকা। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। কারণ তাঁর লক্ষ্য ছিল সিনেমায় কাজ করা।
সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। সামনে ছিল নিশ্চিত আয়। অন্যদিকে সিনেমার ক্যারিয়ার তখনো অনিশ্চিত। তবু বাবা তাঁকে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। ওয়ামিকার কথায়, তাঁর পরিবার কখনো তাঁকে স্বপ্ন থেকে সরে এসে নিরাপদ পথ বেছে নিতে চাপ দেয়নি।
একসময় অভিনয়ই ছাড়তে চেয়েছিলেন
অর্থের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি লড়াই ছিল আত্মবিশ্বাস নিয়েও। একসময় একের পর এক অডিশন দিয়েও বাদ পড়ছিলেন ওয়ামিকা। কখনো অডিশনের পর, কখনো চূড়ান্ত হওয়ার পরও কাজ হাতছাড়া হয়েছে। ২০১৯ সালে এসে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি।
‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’কে ওয়ামিকা বলেন, সে সময় পাঁচ-ছয়টি ছবিতে কাজ করলেও তিনি খুশি ছিলেন না। মনে হচ্ছিল, হয়তো অভিনেত্রী হওয়াটা তাঁর জন্য নয়। তাই অভিনয় ছেড়ে কিছু টাকা জমিয়ে ভ্রমণ করার কথা ভাবছিলেন।
এরপর আসে বিশাল ভরদ্বাজের ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’-এর অডিশন। এতবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন যে এবারও নির্বাচিত হবেন বলে খুব একটা আশা করেননি। কিন্তু অডিশনটি তাঁকে আবার অভিনয়ের প্রেমে ফেলে।
তিন দিনের কর্মশালার অভিজ্ঞতাও বদলে দেয় তাঁর ভাবনা। প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। তবে ওই অভিজ্ঞতা নতুন দরজা খুলে দেয় তাঁর সামনে।
‘জুবিলি’তে নতুন বাঁক
এরপর ‘গ্রহণ’, ‘মাই’, ‘মডার্ন লাভ মুম্বাই’সহ বেশ কিছু কাজ করেন ওয়ামিকা। কিন্তু ২০২৩ সাল তাঁর ক্যারিয়ারে বড় বাঁক নিয়ে আসে।
‘জুবিলি’তে নীলুফার চরিত্রে অভিনয় করে নতুন করে আলোচনায় আসেন। মজার ব্যাপার, এই চরিত্রের অডিশনেও প্রথমবার তাঁকে নেওয়া হয়নি। অডিশন ও স্ক্রিন টেস্ট দেওয়ার পর তাঁকে জানানো হয়েছিল, তাঁকে আর নেওয়া হচ্ছে না। পরে আবার যোগাযোগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত নীলুফার চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
এরপর বিশাল ভরদ্বাজের ‘খুফিয়া’। ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। ‘খুফিয়া’র জন্য ফিল্মফেয়ার ওটিটি পুরস্কারও পান ওয়ামিকা।
সেখান থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ‘বেবি জন’, ‘ভুল চুক মাফ’-এর পর ২০২৬ সালে ‘ডিসি’ ছবিতে চন্দ্রা চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ছবিটি পরিচালনা করেছেন অরুণ মাথেশ্বরন। এতে লোকেশ কানাগরাজের বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে ওয়ামিকাকে।
সামনে আরও নানা চরিত্র
ওয়ামিকার সামনে এখন একাধিক নতুন কাজ। তেলেগু স্পাই-থ্রিলার ‘জি২’-এ অভিনয় করছেন তিনি। ‘টিকি টাকা’ ছবিতে আসিফ আলীর সঙ্গে দেখা যাবে তাঁকে। হিন্দিতেও ব্যস্ততা কমছে না।
‘প্রহার: দ্য উজ্জ্বল নিকম স্টোরি’ ছবিতে রাজকুমার রাওয়ের সঙ্গে অভিনয় করেছেন ওয়ামিকা। সামনে আছে ‘দিল কা দরওয়াজা খোল না ডার্লিং’। বিকাশ বহাল পরিচালিত ছবিটিতে তাঁর সহশিল্পী সিদ্ধার্থ চতুর্বেদী ও জয়া বচ্চন। ‘কুকু কি কুন্ডলি’ ছবিতে দেখা যাবে তাঁকে।
তামিল সিনেমাতেও ফিরছেন ওয়ামিকা। ‘জিনি’ ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। অন্যদিকে প্রশান্ত বর্মার প্যান-ইন্ডিয়া পৌরাণিক ছবি ‘জয় হনুমান’-এও যুক্ত হয়েছেন অভিনেত্রী। ছবিতে ঋষভ শেঠির সঙ্গে তাঁকে দেখা যাবে।
কার্লি টেলস, ফিল্মফেয়ার অবলম্বনে