ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে কিছু নির্মাতা আছেন, যাঁদের কাজ শুধু জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি, বরং পুরো চলচ্চিত্রের ভাষাকেই বদলে দিয়েছে। সেই তালিকার একেবারে সামনের সারিতে থাকবেন মণিরত্নম। আজ ২ জুন তাঁর ৭০তম জন্মদিন। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এমন সব সিনেমা নির্মাণ করেছেন, যেখানে বিনোদন, রাজনীতি, প্রেম, ইতিহাস, সমাজবাস্তবতা ও মানবিক অনুভূতি এক অনন্য মিশ্রণে ধরা পড়েছে।
গোপালরত্নম সুব্রামানিয়াম—এটাই তাঁর আসল নাম। তবে সারা বিশ্বের দর্শকের কাছে তিনি পরিচিত ‘মণিরত্নম’ নামেই। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার থেকে শুরু করে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’—অসংখ্য স্বীকৃতিতে সম্মানিত হয়েছেন তিনি। ২০২২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী প্রদান করে। তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক সেই নির্মাতাকে, যিনি ভারতীয় সিনেমাকে বারবার নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান, কিন্তু টান ছিল সিনেমার প্রতি
১৯৫৬ সালের ২ জুন ভারতের মাদুরাইয়ে জন্ম মণিরত্নমের। তাঁর পরিবার ছিল চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট। বাবা এস. গোপালরত্নম ছিলেন চলচ্চিত্র পরিবেশক। কিন্তু ছোটবেলায় সিনেমা পরিচালকের হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি তিনি। বরং ব্যবসা প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং কিছুদিন করপোরেট চাকরিও করেছেন।
তবে রক্তে যে সিনেমা ছিল, তা শেষ পর্যন্ত মণিরত্নমকে টেনে আনে চলচ্চিত্র জগতে। আশির দশকের শুরুতে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে মন দেন। ১৯৮৩ সালে কন্নড় ভাষার পল্লবী অনু পল্লবী দিয়ে পরিচালনায় অভিষেক ঘটে তাঁর। ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন অনিল কাপুর।
শুরুর কয়েকটি চলচ্চিত্র মণিরত্নমকে পরিচিতি দিলেও প্রকৃত সাফল্য আসে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে।
‘নায়কান’: ভারতীয় সিনেমার এক মাইলফলক
মণিরত্নমের নাম উচ্চারণ করলে যে সিনেমার কথা সবার আগে আসে, সেটি ‘নায়কান’ (১৯৮৭)। কমল হাসান অভিনীত এই চলচ্চিত্র মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন বরদারাজন মুদালিয়ারের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। এক সাধারণ মানুষের অপরাধজগতের ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার গল্পকে অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছিলেন মণিরত্নম। কমল হাসানের অভিনয়, পি.সি. শ্রীরামের ক্যামেরার কাজ এবং মণিরত্নমের গল্প বলার ধরন—সব মিলিয়ে নায়কান ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক ক্ল্যাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আজও এটি সর্বকালের সেরা ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলোর তালিকায় জায়গা করে নেয়।
‘রোজা’: প্রেম, দেশপ্রেম ও এ আর রহমানের জন্ম
১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রোজা’ শুধু একটি সিনেমা ছিল না; এটি ছিল এক নতুন যুগের সূচনা। কাশ্মীরের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে নির্মিত এই প্রেমের গল্প দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ছবিতে অভিনয় করেন অরবিন্দ স্বামী ও মধু। তবে এই সিনেমার আরেকটি ঐতিহাসিক দিক ছিল—এটি ছিল সংগীত পরিচালক এ আর রহমানের অভিষেক। রহমানের সুর করা গানগুলো রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রসংগীতে নতুন বিপ্লবের সূচনা করে। জাতীয় সংহতির ওপর নির্মিত সেরা চলচ্চিত্রসহ তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেয় ‘রোজা’। আর মণিরত্নম হয়ে ওঠেন জাতীয় পর্যায়ের এক তারকা নির্মাতা।
‘বোম্বে’: ভালোবাসার মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে
১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বোম্বে’ ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র। এক হিন্দু যুবক ও মুসলিম তরুণীর প্রেমের গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতা তুলে ধরেন। সে সময় এমন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সিনেমা নির্মাণ ছিল সাহসী পদক্ষেপ। চলচ্চিত্রটি দর্শক ও সমালোচক—উভয় মহলের প্রশংসা কুড়ায়। এ আর রহমানের সংগীতও ছবিটিকে কালজয়ী করে তোলে।
‘ইরুভার’: রাজনীতি, বন্ধুত্ব ও ইতিহাস
১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ইরুভার’ মণিরত্নমের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী চলচ্চিত্রগুলোর একটি। তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে অনুপ্রাণিত এই সিনেমায় অভিনয় করেন মোহনলাল। আর এ ছবির মাধ্যমেই অভিনয়ে অভিষেক ঘটে ঐশ্বরিয়া রাইয়ের। বন্ধুত্ব, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতার লড়াই এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্পকে অসাধারণ নান্দনিকতায় তুলে ধরেছিলেন মণিরত্নম। যদিও মুক্তির সময় ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে খুব বড় সাফল্য পায়নি, পরে এটি ক্ল্যাসিক মর্যাদা অর্জন করে।
‘দিল সে’: শাহরুখ-মণিরত্নমের জাদু
১৯৯৮ সালে মণিরত্নম প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ হিন্দি তারকা শাহরুখ খানকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘দিল সে’। শাহরুখ খান ও মনীষা কৈরালার এই প্রেমের গল্প একদিকে যেমন সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নির্মিত, অন্যদিকে এটি এক অসাধারণ রোমান্টিক ট্র্যাজেডি। ছবির গান ‘ছাইয়া ছাইয়া’ আজও ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় গান হিসেবে বিবেচিত।
‘গুরু’: স্বপ্ন, ব্যবসা ও সাফল্যের গল্প
২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া গুরু ছিল আরেকটি আলোচিত কাজ। অভিষেক বচ্চন ও ঐশ্বরিয়া রাই অভিনীত এই চলচ্চিত্রে এক উচ্চাভিলাষী ব্যবসায়ীর উত্থানের গল্প তুলে ধরা হয়। অনেকেই মনে করেন, চরিত্রটি শিল্পপতি ধীরুভাই আম্বানির জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। ছবিটি সমালোচক ও দর্শক উভয়ের প্রশংসা পায় এবং অভিষেক বচ্চনের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্বপ্নের প্রকল্প ‘পোন্নিয়িন সেলভান’
দীর্ঘদিন ধরে তামিল সাহিত্যের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পোন্নিয়িন সেলভান’ চলচ্চিত্রে রূপ দিতে চেয়েছিলেন মণিরত্নম। বহু বাধা পেরিয়ে অবশেষে ২০২২ সালে মুক্তি পায় ‘পোন্নিয়িন সেলভান: পার্ট ১’ এবং ২০২৩ সালে পার্ট ২। চোল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার লড়াই ও রাজকীয় ইতিহাস নিয়ে নির্মিত এই মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র ভারতীয় সিনেমার অন্যতম বৃহৎ প্রযোজনা হিসেবে বিবেচিত হয়। ছবিটি চারটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেয়, যার মধ্যে ছিল সেরা তামিল চলচ্চিত্রের পুরস্কার।
সিনেমার ভাষা বদলে দেওয়া নির্মাতা মণিরত্নমের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর গল্প বলার ধরন। তিনি কখনো সরাসরি বক্তৃতা দেন না; বরং চরিত্র, দৃশ্য, সংগীত ও আবহের মাধ্যমে দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলেন। তাঁর ছবিতে প্রেম যেমন থাকে, তেমনি থাকে রাজনীতি। ব্যক্তিগত সম্পর্কের গল্পের মধ্য দিয়েও তিনি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরেন। এ কারণেই ‘রোজা’, ‘বোম্বে’, ‘দিল সে’ কিংবা ‘ইরুভার’—সবগুলো ছবিই একই সঙ্গে ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক।
এ আর রাহমানের সঙ্গে কালজয়ী জুটি মণিরত্নম ও এ আর রাহমানের জুটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সফল নির্মাতা–সুরকার জুটি। ‘রোজা’ থেকে শুরু করে ‘বোম্বে’, ‘দিল সে’, ‘গুরু’, ‘ওকে কানমানি’, ‘পোন্নিয়িন সেলভান’—তাঁদের যৌথ কাজ অসংখ্য স্মরণীয় গান উপহার দিয়েছে। অনেকেই মনে করেন, রাহমানের প্রতিভাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার ক্ষেত্রে মণিরত্নমের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৭০ বছরেও থামেননি
সাত দশক বয়সেও মণিরত্নমের সৃজনশীলতা কমেনি। নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা এখনো তাঁকে অনুসরণ করেন। তাঁর সিনেমা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয়, চলচ্চিত্র বিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। মণিরত্নমকে আজ ‘প্যান-ইন্ডিয়ান সিনেমার পথিকৃৎ’ বলা হয়। কিন্তু মজার বিষয় হলো, তিনি নিজে এই তকমা মানতে খুব একটা রাজি নন। তাঁর মতে, একজন নির্মাতা কখনোই ‘সারা দেশের জন্য’ সিনেমা বানাতে বসেন না; তিনি শুধু একটি ভালো সিনেমা বানাতে চান। আর সিনেমাটি যদি মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারে, তাহলে সেটি নিজেই ভাষা ও ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে যায়। তাঁর ভাষ্যে, ‘প্যান-ইন্ডিয়া নিয়ে আমরা এখন অনেক কথা বলি। কিন্তু সিনেমা শুরু করার সময় আমার একটাই উদ্দেশ্য থাকে—একটা ভালো সিনেমা বানানো। যদি সেটা দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে, তাহলে সিনেমা নিজেই ভ্রমণ করবে।’
সাম্প্রতিক ছবি ‘থাগ লাইফ’-এ তিনি আবারও কাজ করেছেন অভিনেতা কমল হাসানের সঙ্গে। এর আগে ১৯৮৭ সালে দুজন একসঙ্গে করেছিলেন আলোচিত সিনেমা ‘নায়কান’–এ। মণিরত্নমের ভাষায়, ‘কমল তখনো অসাধারণ শিল্পী ছিলেন, এখনো আছেন। তিনি বলেন, ‘যেকোনো চরিত্র তাঁকে দিলে তিনি সেটার ভেতরে ঢুকে যান।’
মণিরত্নমের চলচ্চিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো বাস্তবতার অনুভূতি তৈরি করা। ‘নায়কান’-এর জন্য চেন্নাইয়ে ধারাভির পরিবেশ পুনর্নির্মাণ কিংবা আলাইপায়ুথে-তে আলাদা বাড়ি তৈরি—সবকিছুর পেছনে ছিল গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা। তাঁর মতে, ‘খুঁটিনাটি শুধু দেখানোর জন্য নয়, গল্পের জগৎকে বাস্তব করে তুলতেই দরকার।’
চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে হয়তো এটি বিস্ময়কর শোনাবে। কিন্তু মণিরত্নম স্বীকার করেছেন, তিনি নিজের পুরোনো সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন না। কারণ, সেগুলো দেখলে তাঁর চোখে শুধু ভুলগুলোই ধরা পড়ে। ‘একটা সিনেমা শেষ হয়ে গেলে আমার কাছে সেটা শেষ। পরে দেখলে শুধু ভুলই দেখি,’ বলেছেন তিনি।
ফ্রি প্রেস জার্নাল, আইএমডিবি ও দ্য উইক অবলম্বনে