
বলিউড তারকা সালমান খানকে ঘিরে আবারও নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলির ঘটনার তদন্তে নতুন তথ্য পেয়েছে মুম্বাই পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হামলাকারীদের প্রথম লক্ষ্য ছিলেন সালমান। তাঁর বাড়ির আশপাশে নজরদারিও চালানো হয়েছিল। কিন্তু কড়া নিরাপত্তার কারণে পরিকল্পনা বদলে টাইগারকে নিশানা করা হয়। যদিও সালমানই মূল লক্ষ্য ছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ। এদিকে নির্মাতা রোহিত শেঠির বাড়িতে গুলিবর্ষণ, রণবীর সিংকে হুমকি এবং টাইগারের ওপর হামলার ঘটনায় বলিউডে তারকাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। তখন পুষ্পা নারসি মাঠে ফুটবল খেলে ফিরছিলেন অভিনেতা। মোটরসাইকেলে আসা তিন সন্দেহভাজনের মধ্যে দুজন গুলি চালান বলে পুলিশের দাবি। টাইগার অক্ষত থাকলেও তাঁর গাড়িচালক ও এক অটোরিকশাচালক আহত হন। হামলার পর মোটরসাইকেলে পালিয়ে যান অভিযুক্ত ব্যক্তিরা।
এ ঘটনায় মুম্বাইসহ ভারতের একাধিক রাজ্যে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে সন্দেহভাজন তিন হামলাকারীকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। তাঁদের নাম রেহান আনসারি, ফুল সিং ও ঋত্বিক।
সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা মুম্বাইয়ে এসে প্রথমে সালমানের বান্দ্রার গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের আশপাশে যান। সেখানে পুলিশ ও সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতি দেখে তাঁরা পরিকল্পনা বদলে থাকতে পারেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।
সালমানকে ঘিরে কী তথ্য পেল পুলিশ
এনডিটিভি ও ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা মুম্বাইয়ে এসে প্রথমে সালমানের বান্দ্রার গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের আশপাশে যান। সেখানে পুলিশ ও সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতি দেখে তাঁরা পরিকল্পনা বদলে থাকতে পারেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।
পরে তাঁদের নজর পড়ে টাইগার শ্রফের ওপর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনেতা ও তাঁর ভক্তদের পোস্ট করা ভিডিও দেখে তাঁরা জানতে পারেন, টাইগার নিয়মিত জুহুর একটি মাঠে ফুটবল খেলতে যান। সেখানে তাঁর সঙ্গে তুলনামূলক কম নিরাপত্তারক্ষী থাকেন বলেও ধারণা করেন সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর অনুযায়ী, হামলার অন্তত ১০ দিন আগে থেকে মাঠটির আশপাশে নজরদারি চালানো হয়েছিল। ১১ অক্টোবরও সেখানে গিয়েছিলেন সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা। কিন্তু সেদিন টাইগার মাঠে না আসায় হামলা হয়নি। এক সপ্তাহ পর, ১৮ অক্টোবর, তাঁর গাড়িতে গুলি চালানো হয়।
তবে সালমানকে নিশানা করার বিষয়টি নিয়ে তদন্ত এখনো চলছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তি মুম্বাইয়ে অবস্থানকালে সালমান ছাড়াও আমির খান ও রণবীর সিংয়ের বাড়ির আশপাশে গিয়েছিলেন। পুলিশ খতিয়ে দেখছে, তাঁদের হামলার লক্ষ্য হিসেবে এসব তারকার নাম দেওয়া হয়েছিল, নাকি অন্য কারণে তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, গুগলে তারকাদের বাড়ির ঠিকানা খুঁজতেন সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা। এরপর অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলে সেসব এলাকায় যেতেন। তাঁদের এই চলাফেরার উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য অন্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে জানতে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তি মুম্বাইয়ে অবস্থানকালে সালমান ছাড়াও আমির খান ও রণবীর সিংয়ের বাড়ির আশপাশে গিয়েছিলেন। পুলিশ খতিয়ে দেখছে, তাঁদের হামলার লক্ষ্য হিসেবে এসব তারকার নাম দেওয়া হয়েছিল, নাকি অন্য কারণে তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন।
অস্ত্র এল কোথা থেকে
হামলার তদন্তে অস্ত্র সরবরাহ ও অর্থ লেনদেনের একটি চক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অমৃতসর থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহের পর তা দিল্লিতে নেওয়া হয়। সেখান থেকে রাধা ভার্মা ও ববিতা রাও নামের দুই নারী অস্ত্রটি মুম্বাইয়ে পৌঁছে দেন বলে অভিযোগ।
পুলিশ জানিয়েছে, অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহের কাজে কয়েকজনের আলাদা ভূমিকা ছিল। সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা যাতে একে অপরের পরিচয় না জানতে পারেন, সে জন্য অস্ত্র হস্তান্তরে বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
অর্থের উৎসও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, হামলাকারী ও তাঁদের সহযোগীদের কাছে প্রায় দুই লাখ রুপি পৌঁছানোর তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এর মধ্যে ২৫ হাজার রুপিতে একটি পুরোনো মোটরসাইকেল কেনা হয় বলে পুলিশের দাবি। অর্থের কিছু অংশ ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল।
হামলার পর ব্যবহৃত অস্ত্র ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করছে পুলিশ। সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মুঠোফোনও নষ্ট করা হয়েছে। ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্য উদ্ধার করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সালমান আগে থেকেই ওয়াই-প্লাস নিরাপত্তা পান। তাঁর চলাফেরার সময় সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা সঙ্গে থাকেন। তিনি কোনো অনুষ্ঠানে গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশও বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে।
বিষ্ণোই গ্যাংয়ের যোগসূত্র
হামলার পরিকল্পনায় অনিল পণ্ডিত নামের এক ব্যক্তির সম্ভাব্য ভূমিকা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তাঁর সঙ্গে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ। তদন্তে গ্যাংটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত শুভম লোঙ্কারের নামও উঠে এসেছে। টাইগারের গাড়িতে গুলির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে নিজেকে অনিল পণ্ডিত পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি হামলার দায় স্বীকার করেন। সালমানের সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিদেরও হুমকি দেওয়া হয় ওই বার্তায়। তবে বার্তাটির সত্যতা এবং বক্তার পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তদন্তকারীরা এখন জানার চেষ্টা করছেন, হামলাকারীদের সঙ্গে সন্দেহভাজন পরিকল্পনাকারীদের যোগাযোগ কীভাবে হয়েছিল। তাঁদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোনো তারকাকে আক্রমণ করা, নাকি বলিউডজুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো—সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
সালমানের বাড়িতে কড়া পাহারা
নতুন তথ্য সামনে আসার পর সালমানের নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়েছে। এনডিটিভি জানিয়েছে, তাঁর গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে অত্যাধুনিক সাবমেশিনগানসহ বিশেষ কমান্ডো মোতায়েন করা হয়েছে। বাড়ির আশপাশেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
সালমান আগে থেকেই ওয়াই-প্লাস নিরাপত্তা পান। তাঁর চলাফেরার সময় সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা সঙ্গে থাকেন। তিনি কোনো অনুষ্ঠানে গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশও বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে।
সালমানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের কাছ থেকে হুমকি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর। ২০২৪ সালে বান্দ্রায় তাঁর গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে গুলি চালানো হয়।
সালমানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের কাছ থেকে হুমকি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর। ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল বান্দ্রায় তাঁর গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে গুলি চালানো হয়। ওই বছরের ১২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে গুলিতে নিহত হন সালমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকি। দুটি ঘটনাতেই বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।
টাইগারের ওপর হামলার আগে চলচ্চিত্র নির্মাতা রোহিত শেঠির বাড়িতে গুলিবর্ষণ এবং অভিনেতা রণবীর সিংকে চাঁদা চেয়ে হুমকির অভিযোগ সামনে আসে। এবার নতুন করে কয়েকজন তারকার বাড়ির আশপাশে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের যাতায়াতের তথ্য পাওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বলিউডে বাড়ছে উদ্বেগ
টাইগারের ওপর হামলার আগে চলচ্চিত্র নির্মাতা রোহিত শেঠির বাড়িতে গুলিবর্ষণ এবং অভিনেতা রণবীর সিংকে চাঁদা চেয়ে হুমকির অভিযোগ সামনে আসে। এবার নতুন করে কয়েকজন তারকার বাড়ির আশপাশে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের যাতায়াতের তথ্য পাওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ীও। তাঁর মতে, চলচ্চিত্রজগৎ দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধী চক্রের সহজ লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
টাইগারের গাড়িতে হামলার ঘটনায় তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, অস্ত্রের উৎস শনাক্ত ও অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাই চলছে। একই সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, অন্য তারকাদের ওপর হামলার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সালমানসহ বলিউডের একাধিক তারকাকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ কাটছে না।