২০০৬ সালের ২৬ মে মুক্তি পেয়েছিল ‘ফানা’। আজ সিনেমাটি মুক্তির দুই দশক পূর্ণ হলো। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দুই দশক। সময়ের হিসেবে ২০ বছর। কিন্তু প্রেম, প্রতারণা, দেশপ্রেম আর ট্র্যাজেডির মিশেলে তৈরি এই ছবির আবেগ এখনো বলিউডপ্রেমীদের মনে একই রকম তাজা। একদিকে আমির খানের রহস্যময় আকর্ষণ, অন্যদিকে কাজলের আবেগঘন অভিনয়—সব মিলিয়ে ‘ফানা’ ছিল ২০০০–এর দশকের অন্যতম আলোচিত ও সফল চলচ্চিত্র।
দুই দশক পরও কেন বিশেষ ‘ফানা’
‘ফানা’ শুধু একটি প্রেমের গল্প ছিল না, এটি ছিল প্রেম আর আদর্শের সংঘাতের গল্প। বলিউডে তখন রোমান্টিক ছবির অভাব ছিল না, কিন্তু ‘ফানা’ দর্শকদের সামনে এমন এক নায়ককে হাজির করেছিল, যিনি একই সঙ্গে প্রেমিক, কবি এবং সন্ত্রাসী। সেই সময়ের মূলধারার বলিউডে এমন ধূসর চরিত্র খুব বেশি দেখা যেত না।
ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন কুনাল কোহলি। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছিল যশরাজ ফিল্মস। আর ছবির গান, সংলাপ, কাশ্মীরি আবহ আর আবেগঘন নির্মাণ দ্রুতই এটিকে কাল্ট মর্যাদা এনে দেয়।
প্রেম, মিথ্যা আর বিশ্বাসঘাতকতার জটিলতা
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র রেহান কাদরি, যার ভূমিকায় ছিলেন আমির খান। দিল্লির এক পর্যটক গাইড রেহান নিজেকে পরিচয় দেয় হাসিখুশি, রোমান্টিক এক তরুণ হিসেবে। তার প্রেমে পড়েন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কাশ্মীরি তরুণী জুনি চরিত্রে কাজল।
দিল্লিতে কয়েক দিনের পরিচয় দ্রুতই প্রেমে রূপ নেয়। কিন্তু সম্পর্কের ঠিক পরপরই ঘটে বিস্ফোরণ। সবাই জানতে পারে, রেহান আসলে একজন জঙ্গি, যে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত। জুনির জীবন ভেঙে পড়ে।
এরপর গল্প এগোয় বহু বছর পর। সবাই ধরে নেয় রেহান মারা গেছে। কিন্তু এক দুর্ঘটনার পর আহত অবস্থায় সে আশ্রয় নেয় জুনির বাড়িতেই—যেখানে জুনি এখন এক সন্তানের মা। রেহান নিজের পরিচয় গোপন রাখে। কিন্তু ধীরে ধীরে পুরোনো প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা আর সত্য একসঙ্গে সামনে আসতে থাকে।
‘ফানা’র সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এখানেই—এটি শুধু প্রেমের গল্প নয়, বরং নৈতিক দ্বন্দ্বের গল্প। একজন মানুষ কি একই সঙ্গে ভালোবাসতে এবং ধ্বংস ডেকে আনতে পারে? এই প্রশ্নই ছবিটিকে অন্য মাত্রা দেয়।
আমির–কাজল জুটির জাদু
ছবিটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল আমির খান ও কাজলের প্রথম জুটি। নব্বইয়ের দশকে কাজল তখন বলিউডের অন্যতম শীর্ষ অভিনেত্রী। কিন্তু বিয়ের পর তিনি অনেকটাই পর্দা থেকে দূরে ছিলেন। ‘ফানা’ ছিল তাঁর বড় প্রত্যাবর্তন।
অন্যদিকে আমির খান তখন পরীক্ষাধর্মী চরিত্রে ঝুঁকছেন। রেহানের চরিত্রে তিনি একই সঙ্গে আকর্ষণীয় ও বিপজ্জনক—যা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল।
দর্শক ও সমালোচকেরা বিশেষভাবে প্রশংসা করেছিলেন তাঁদের রসায়নের। ছবির আবেগঘন দৃশ্যগুলো আজও বলিউডের সেরা রোমান্টিক মুহূর্তের তালিকায় জায়গা পায়।
গানগুলো আজও জনপ্রিয়
‘ফানা’র গান ছিল ছবির আরেক বড় শক্তি। জতিন–ললিতের সুরে তৈরি গানগুলো তখন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।
বিশেষ করে ‘চাঁদ সিফারিশ’, ‘মেরে হাত মে’, ‘দেশ রংগিলা’ ও ‘দেখো না’—এই গানগুলো এখনো নস্টালজিয়ার অংশ।
‘চাঁদ সিফারিশ’ গানটি তো একসময় প্রায় প্রতিটি পুরস্কার জিতে নেয়। গানগুলোর ভিজ্যুয়াল, কাশ্মীরি লোকেশনের ব্যবহার এবং আবেগঘন কথাগুলো ছবির জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
মুক্তির আগে বিতর্ক
ছবিটি মুক্তির আগেই বড় বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন আমির খান। নর্মদা বাঁধ ইস্যুতে তাঁর একটি মন্তব্য ঘিরে ভারতের গুজরাটে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। এর প্রভাব পড়ে ‘ফানা’র ওপরও।
গুজরাটের অনেক সিনেমা হল ছবিটি প্রদর্শন করতে অস্বীকৃতি জানায়। সে সময় বলিউডে বিষয়টি বড় আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই মনে করেছিলেন, এই বিতর্ক ছবির ব্যবসায় বড় ক্ষতি করবে।
কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা ঘটে। বিতর্কের মধ্যেও ছবিটি বক্স অফিসে দুর্দান্ত সাফল্য পায়।
বক্স অফিসে ঝড়
‘ফানা’ মুক্তির পরপরই ভারত ও বিদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সে সময়কার হিসাবে এটি বছরের অন্যতম সর্বোচ্চ আয় করা বলিউড ছবিতে পরিণত হয়।
ভারতে ছবিটি ৫০ কোটির বেশি ব্যবসা করেছিল, যা তখন বিশাল অঙ্ক হিসেবে ধরা হতো। আন্তর্জাতিক বাজারেও ছবিটি ভালো ব্যবসা করে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আমেরিকায় ভারতীয় দর্শকদের মধ্যে ছবিটির জনপ্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো। সব মিলিয়ে সিনেমাটি বক্স অফিসে ১০৫ কোটি রুপির বেশি আয় করে।
পর্দার পেছনের কিছু গল্প
ছবির শুটিংয়ের বড় অংশ হয়েছিল পোল্যান্ড ও ভারতে। কাশ্মীরের আবহ ফুটিয়ে তুলতে নির্মাতারা ইউরোপের কিছু তুষারাচ্ছন্ন লোকেশন ব্যবহার করেছিলেন।
আরেকটি মজার তথ্য হলো ছবিতে রেহানের চরিত্রটি নিয়ে শুরুতে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছিল। আমির খান চরিত্রটিকে আরও মানবিক ও বাস্তবসম্মত করতে চেয়েছিলেন। ফলে স্ক্রিপ্টে কয়েকবার পরিবর্তন আনা হয়।
কাজলও ছবিটির জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীর শরীরী ভাষা ও চোখের অভিব্যক্তি কীভাবে হবে, তা নিয়ে তিনি আলাদা করে কাজ করেছিলেন।
কী বললেন কাজল
এদিকে সিনেমাটি মুক্তির দুই দশক পূর্তিতে স্মৃতিকাতর কাজল। নিজের ফেসবুকে সিনেমাটির কিছু স্টিল ছবি শেয়ার করে অভিনেত্রী লিখেছেন, ‘“ফানা”র ২০ বছর…তখন আমার মেয়ের বয়স ছিল মাত্র আড়াই বছর, আর আমি ছিলাম...। তবে সবচেয়ে বেশি যা মনে পড়ে, তা হলো অপূর্ব সুন্দর পোল্যান্ড। মাইনাস ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, দারুণ সব বন আর ফুটপাতে চলা স্লেজ। আর অবশ্যই, সেই সময় সবাই যখন মোটা গুজ ডাউন জ্যাকেট পরে ঘুরছিল, তখন আমি পাতলা সালোয়ার–কামিজ পরে শুটিং করছিলাম। সত্যিই, কী দারুণ এক স্মৃতি!’
আইএমডিবি ও বলিউড হাঙ্গামা অবলম্বনে