
রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে শুরু, সহ-অভিনেতার সঙ্গে প্রেম-বিয়ে, এরপর বিচ্ছেদ—সামান্থা রুথ প্রভুর জীবন ঘটনাবহুল। ‘পাশের বাড়ির মেয়ের’ ইমেজ থেকে বেরিয়ে ‘পুষ্পা’র আইটেম গানে নাচ, অ্যাকশন সিরিজে অভিনয়, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা ভুলে আবার জটিল রোগের সঙ্গে লড়াই—তাঁর জীবন যেন সিনেমার মতোই। আজ ২৮ এপ্রিল অভিনেত্রীর জন্মদিন। এ উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ার।
সামান্থা ও নাগা চৈতন্যকে টলিউডের ‘পারফেক্ট কাপল’ হিসেবে ধরা হতো। তবে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘোষিত হওয়ার পরই সবাই ভেবেছিলেন, কী কারণে এ সম্পর্ক শেষ হলো। অনেকের মতে, সামান্থার সাহসী চরিত্রের কারণেই সম্পর্কের অবসান ঘটেছে।একটি সূত্রে জানা যায়, সামান্থার ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান ২’ সিরিজের দৃশ্যটি নাগা ও তাঁর পরিবারের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। যদিও সিরিজটির জন্য আরেকটি অন্তরঙ্গ দৃশ্যের শুটিং করেন সামান্থা, কিন্তু পরে সেটা সম্পাদনায় বাদ পড়ে। কিন্তু যে দৃশ্যটি প্রচারিত হয়, সেটা নিয়েও আপত্তি ছিল। নাগা তো বটেই, তাঁর সাবেক শ্বশুর নাগার্জুনেরও আপত্তি ছিল। তবে সামান্থা এই ‘পিতৃতান্ত্রিক’ মানসিকতা মানতে অস্বীকার করেন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁদের বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাধারণ পরিবার থেকে স্বপ্নের শুরু
১৯৮৭ সালের ২৮ এপ্রিল চেন্নাইয়ে জন্ম সামান্থার। তাঁর পরিবার ছিল একেবারেই সাধারণ—বাবা তেলেগু, মা মালয়ালি। ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি দুই সংস্কৃতির মিশ্রণে বড় হয়েছেন। অর্থনৈতিক দিক থেকে খুব সচ্ছল ছিলেন না। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের খরচ চালাতে মডেলিং শুরু করেন। এ সময়টাই তাঁকে শেখায়—নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে লড়াই করতেই হবে।
মডেলিং করতে করতেই সামান্থা নজরে পড়েন পরিচালক গৌতম বাসুদেব মেননের। তাঁর হাত ধরেই সামান্থার চলচ্চিত্রে অভিষেক—‘ইয়ে মায়া চেসাভ’। রোমান্টিক সিনেমাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়, বিভিন্ন ভাষায় রিমেক হয়। ছবির জন্য সেরা নবাগত শিল্পী হিসেবে ফিল্মফেয়ার জিতে নেন।
ক্যারিয়ারের উত্থান
দারুণ শুরুর পর সামান্থা যেন থামতেই জানেননি। একের পর এক হিট ছবি তাঁকে নিয়ে যায় দক্ষিণ ভারতের শীর্ষ নায়িকাদের কাতারে। উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘ইগা’, ‘নিথানে এন পোনভাসানথাম’, ‘থেরি’, ‘মার্সেল’, ‘সুপার ডিলাক্স’ ইত্যাদি। তিনি তামিল ও তেলেগু—দুই ইন্ডাস্ট্রিতেই সমানভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, যা খুব কম অভিনেত্রীর ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
বলিউড ও ওটিটি: নতুন দিগন্ত
সামান্থার ক্যারিয়ারে বড় বাঁক আসে ওয়েব সিরিজ ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’-এর দ্বিতীয় মৌসুম। রোমান্টিক নায়িকার খোলস ছেড়ে তিনি অ্যাকশন চরিত্র ‘রাজি’ দিয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। এই সিরিজের মাধ্যমে তিনি শুধু দক্ষিণেই নন, সর্বভারতীয় ও আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠেন। অনেকেই এটিকে তাঁর ক্যারিয়ারের ‘মোড় ঘোরানো’ মুহূর্ত বলে মনে করেন। এ ছাড়া ‘পুষ্পা’ সিনেমার সেই আলোচিত আইটেম গানে সামান্থার আবেদনময় উপস্থিতি কে ভুলতে পারে!
অন্তরঙ্গ দৃশ্যের কারণেই বিবাহবিচ্ছেদ
দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় জুটি ছিলেন নাগা চৈতন্য ও সামান্থা রুথ প্রভু। দীর্ঘ প্রেমের সম্পর্ককে পরিণয়ে রূপ দিতে ২০১৭ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন জনপ্রিয় এই জুটি। চার বছরের সংসারের পর ২০২১ সালে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন এই দম্পতি। জানা গেছে, বিচ্ছেদের মাত্র দুই মাস আগেও সন্তান নিতে চেয়েছিলেন সামান্থা। কিন্তু তখনই তাঁদের জীবনে তৃতীয় ব্যক্তি, অর্থাৎ সবিতার আগমনের গুঞ্জন রটে যায়। সেই গুঞ্জন সত্যি করে পরে বিয়ে করেন নাগা-সবিতা। তবে বিচ্ছেদের পরও সামান্থা ও নাগাকে নিয়ে আলোচনা শেষ হয়নি। বরং দুজনই পরোক্ষভাবে নিজেদের তিক্ত সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন।
অবশ্য সম্পর্ক নিয়ে সামান্থা-নাগার আগে বিভিন্ন মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে চলেছে বিচার-বিশ্লেষণ। এক সাক্ষাৎকারে নাগা স্বীকার করেছিলেন যে সম্পর্কে থাকার সময়ে সামান্থার সঙ্গে প্রতারণা করেছিলেন তিনি। এ বিষয়ে মুখ খুলেছিলেন সামান্থাও। জানান, সবার আগে নিজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
একটি কলেজে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সামান্থা বলেন, ‘সারা জীবনে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক কোনটা তোমরা জানো? নিজের সঙ্গে গড়ে তোলা সম্পর্ক সবচেয়ে দামি। মা-বাবা, প্রেমিক-প্রেমিকা, ভাই-বোনের সম্পর্ক নয়। জীবনে যখন খুব দুঃসময় আসে, তখন বুঝতে পারবে। এখন তোমাদের মনে হয়, পরীক্ষাই সবচেয়ে কঠিন বিষয়। বিশ্বাস করো, এটা তো সূচনামাত্র। জীবনে সবচেয়ে কঠিন সময় যখন আসবে, নিজের পাশে নিজেকেই খুঁজে পাবে। নিজের প্রিয় বন্ধু নিজেই হয়ে ওঠো।’
‘কফি উইথ করণ’-এ গিয়েও তাঁদের বিয়ের ভয়ানক তিক্ততা নিয়ে কথা বলেন সামান্থা। তিনি সে সময় বলেছিলেন, ‘আমাদের এই বিয়ের অভিজ্ঞতা এতটাই তিক্ত যে আপনি যদি আমাদের এক ঘরে বন্ধ করে দেন, তাহলে অবশ্যই সেখানে ধারালো কোনো জিনিস না রাখাই ভালো।’
তবে নাগার বিচ্ছেদ নিয়ে তাঁর বাবা দিয়েছিলেন ভিন্ন তথ্য। ছেলের বাগ্দানের সুখবর দিয়ে দক্ষিণি তারকা নাগার্জুন আক্কিনেনি জানান, সামান্থা রুথ প্রভুর সঙ্গে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন তাঁর ছেলে। কিন্তু জীবনে সবিতার আগমনে এখন খুব খুশি নাগা চৈতন্য।
সামান্থা ও নাগা চৈতন্যকে টলিউডের ‘পারফেক্ট কাপল’ হিসেবে ধরা হতো। তবে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘোষিত হওয়ার পরই সবাই ভেবেছিলেন, কী কারণে এ সম্পর্ক শেষ হলো। অনেকের মতে, সামান্থার সাহসী চরিত্রের কারণেই সম্পর্কের অবসান ঘটেছে।
একটি সূত্রে জানা যায়, সামান্থার ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান ২’ সিরিজের দৃশ্যটি নাগা ও তাঁর পরিবারের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। যদিও সিরিজটির জন্য আরেকটি অন্তরঙ্গ দৃশ্যের শুটিং করেন সামান্থা, কিন্তু পরে সেটা সম্পাদনায় বাদ পড়ে। কিন্তু যে দৃশ্যটি প্রচারিত হয়, সেটা নিয়েও আপত্তি ছিল। নাগা তো বটেই, তাঁর সাবেক শ্বশুর নাগার্জুনেরও আপত্তি ছিল। তবে সামান্থা এই ‘পিতৃতান্ত্রিক’ মানসিকতা মানতে অস্বীকার করেন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁদের বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
‘পুষ্পা’ ছবিতে সামান্থা রুথ প্রভুর আইটেম গান ঝড় তোলে। কিন্তু এই আইটেম গানে নাচার আগে তাঁকে অনুরোধ করা হয়েছিল না করার জন্য। একটি সাক্ষাৎকারে সামান্থা জানান, ‘বিচ্ছেদের সময় আমি এই প্রস্তাব পেয়েছিলাম। সবাই বলেছিল, এখন বসে থাকো, আইটেম সং কোরো না। কিন্তু আমি শুনেই রাজি হই।’ সামান্থার ভাষ্যে, ‘আমি কিছু ভুল করিনি। কেন লুকাব? বিচ্ছেদ হয়ে গেছে, কিন্তু আমি নিজের প্রতি দোষারোপ করতে যাচ্ছি না।’
নাগা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি সব ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি, তবে যদি তা পরিবারকে লজ্জিত করে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এমন চরিত্র নিতে চাই না, যা পরিবারের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে।’
জটিল রোগের সঙ্গে লড়াই
২০২২ সালে ইনস্টাগ্রামে নিজের বাঁ হাতের রক্তনালিতে ওষুধের নল লাগানো একটি ছবি প্রকাশ করেন অভিনেত্রী সামান্থা রুথ প্রভু। জানান, মায়োসাইটিস নামে একটি রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরে। ছবি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে সামান্থার সহকর্মী ও অনুরাগীদের একাংশের মধ্যে। নিজের পোস্টে অভিনেত্রী লিখেছেন, ‘কয়েক মাস আগে আমার একটি অটোইমিউন রোগ ধরা পড়ে। রোগটির নাম মায়োসাইটিস। ভেবেছিলাম, সুস্থ হওয়ার পরই সে কথা জানাব। কিন্তু যা ভেবেছিলাম, সুস্থ হতে তার তুলনায় বেশি সময় লাগছে।’
এই রোগের সঙ্গে কয়েক বছর ধরে লড়াই করেন। অনেক দিন ছবির শুটিং করতে পারেননি। নতুন ছবির প্রচারেও অংশ নিতে পারেননি। তবে নিজের রোগের কথা লুকাননি, ভালো মুহূর্ত থেকে দুর্বলতা জানিয়েছেন ভক্তদের। সামান্থা বলেছেন, তাঁর লড়াই অন্যদের কিছু অনুপ্রাণিত করতে পারলেই তিনি খুশি।
নতুন শুরু
২০২১ সালে নাগা চৈতন্যর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর সামান্থা জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যান। তখনই রাজ নিধিমুরু তাঁর জীবনে আসেন, প্রথমে পেশাদার সম্পর্ক হিসেবে।
অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর আলোচিত সিরিজ ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান ২’-এ কাজ করতে গিয়ে রাজ নিধুমুরুর সঙ্গে সামান্থার প্রথম দেখা। সিরিজটি পরিচালনা করেন রাজ। সিরিজে রাজি চরিত্রে দেখা গেছে সামান্থাকে। তবে সেটে দুজনের সম্পর্কটা পেশাদার ছিল, সম্পর্কটা তখনো ব্যক্তিগত পর্যায়ে গড়ায়নি।
‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান ২’-এর সাফল্যের পর আরেক সিরিজ ‘সিটাডেল: হানি বানি’-তে যুক্ত হন সামান্থা। সিরিজটি করতে গিয়ে দুজনের সম্পর্কটা গাঢ় হয়েছে। পরে গত বছরের ১ ডিসেম্বর বিয়ে করেন এই অভিনেত্রী ও নির্মাতা।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে