
আমির খান প্রযোজিত ও রাজকুমার সন্তোষী পরিচালিত ‘বাটওয়ারা ১৯৪৭’ দিয়ে আট বছর পর বড়পর্দায় ফিরেছেন প্রীতি জিনতা। ছবিটি বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাড়া না পেলেও সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে। সম্প্রতি মুম্বাইয়ের একটি পাঁচতারকা হোটেলে প্রীতি জিনতার সঙ্গে দীর্ঘ বিরতি, মাতৃত্ব, পরিবার ও নতুন ছবির অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর মুম্বাই প্রতিনিধি দেবারতি ভট্টাচার্য
২০১৬ সালে মার্কিন আর্থিক বিশ্লেষক জিন গুডএনাফকে বিয়ে করেন প্রীতি জিনতা। এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রেই আছেন। ২০২১ সালে যমজ সন্তানের মা-বাবা হন তাঁরা। বড় পর্দায় সর্বশেষ ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ভাইয়াজি সুপারহিট ছবিতে তাঁকে দেখা গেছে। দীর্ঘ বিরতির পর ফিরলেও ক্যামেরাকে খুব একটা মিস করেননি। জানালেন, ‘ক্যারিয়ারে যত অর্জনই থাকুক, আমার কাছে পরিবারই বড়। এখনো জীবনের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার পরিবার।’ দেশের বাইরে থাকার সময় অভিনয়ের চেয়েও ভারতকে বেশি মনে পড়েছে। অভিনয়ে ফেরার কোনো তাড়াও অনুভব করেননি। কেন? প্রীতির উত্তর, ‘এখন আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়—আমি একজন মা। সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। তাই অভিনয় থেকে দূরে থাকাটা কখনোই কষ্টের মনে হয়নি।’
কারও কাছে নয়না, কারও কাছে জারা
দীর্ঘ সময় পর সেটে ফেরার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে বিশেষ ঘটনা। অভিনয় থেকে দূরে থাকার সময় মা ও গৃহিণী হিসেবে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে ছবির চরিত্রটিকে বুঝতে সাহায্য করেছে। প্রীতি বলেন, ‘জীবনের এই পর্যায়ে এসে চরিত্রটির সঙ্গে নিজেকে সহজেই মেলাতে পেরেছি।’
মা হওয়ার পর জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে গেছে। আগে নিজের ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিলেও এখন প্রীতির কাছে সন্তানরাই সবার আগে। মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজের মাকেও নতুনভাবে বুঝতে শিখিয়েছে। হেসে প্রীতি বলেন, ‘ছোটবেলায় অনেক সময় মায়ের ফোন এড়িয়ে যেতাম। এখন বুঝতে পারি, তিনি কেন এত খোঁজ নিতেন। শুধু চাই, আমার সন্তানরা যেন আমার সঙ্গে সেই কাজ না করে।’ মা হিসেবে নিজের সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেন প্রীতি। তাঁর মতে, সন্তানের জীবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মা-বাবা হিসেবে কেবল নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করা যায়।
দীর্ঘ সময় বলিউড থেকে দূরে থাকলেও প্রীতির তারকাখ্যাতিতে ভাটা পড়েনি। তবে তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে তারকাখ্যাতির সংজ্ঞা বদলে গেছে। আগে দর্শকেরা অভিনয়শিল্পীদের মূলত পর্দার চরিত্রের মধ্য দিয়েই চিনতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছে। ‘এখন তারকারা কী খাচ্ছেন, কী পরছেন, কোথায় যাচ্ছেন—সবই দর্শকের জানা। পাশাপাশি ওটিটির প্রসারও বিনোদনের ধরন বদলে দিয়েছে। আগে সিনেমাই ছিল প্রধান মাধ্যম, এখন সেই জায়গা নানা প্ল্যাটফর্মের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে,’ বলেন প্রীতি।
তবে পুরোনো ছবির চরিত্রগুলো এখনো দর্শকের মনে রয়ে গেছে। প্রীতি বলেন, ‘এখনো খুব কম মানুষই আমাকে প্রীতি বলে ডাকেন। কেউ নয়না, কেউ জারা বলে ডাকেন। এত বছর পরও দর্শক চরিত্রগুলো মনে রেখেছেন, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
মানুষের গল্পই সবচেয়ে বড়
বাটওয়ারা ১৯৪৭–এ যুক্ত হওয়ার গল্পও বেশ আকর্ষণীয়। প্রীতি তখন যুক্তরাষ্ট্রে। জুম কলে ছবির প্রস্তাব পান। অনেক ছবির প্রস্তাব পেলেও কোনোটিই করতে চাইছিলেন না। তবে পরিচালক রাজকুমার সন্তোষীর নাম শুনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ‘যখন জানলাম ছবিটি রাজ স্যার পরিচালনা করছেন, চিত্রনাট্য শুনতে আগ্রহ হলো। অবশ্য প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো কোনো কমেডি ছবি। আমিরও আমাকে ফোন করে অন্তত একবার গল্পটা শুনতে বলেছিল। চিত্রনাট্য শোনার পর হ্যাঁ বলতে আর দেরি করিনি,’ বলেন তিনি।
বহু বছর পর সানি দেওলের সঙ্গে কাজ করলেন প্রীতি। তাঁর চোখে সানি এখনো আগের মতোই উৎসাহী, শান্ত ও কাজের প্রতি নিবেদিত। ছবিতে সানির একটি আবেগঘন দৃশ্য বিশেষভাবে মনে গেঁথে আছে, ‘চরিত্রের আবেগে সানি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁর অভিনয় দেখে আমরা সবাই মুগ্ধ হয়েছিলাম।’ দীর্ঘ বিরতির পর সেটে ফিরে সানিকেই নিজের ‘সেফ স্পেস’ মনে হয়েছে প্রীতির। প্রথম দিন কঠিন একটি দৃশ্যের শুটিং করতে গিয়ে নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন। তখন বারবার তাঁকে সাহস জুগিয়েছেন সানি।
এমনিতেই অবশ্য দেওল পরিবারের সঙ্গে প্রীতির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে একটি ছবিতে অভিনয় করলেও সেটি মুক্তি পায়নি। ববি দেওল ও অভয় দেওল তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। প্রীতি বলেন, ‘দেওল পরিবারের বাড়িতে যতবার গিয়েছি, ভালোবাসা, সম্মান ও আন্তরিকতা পেয়েছি। তাঁদের আন্তরিকতা একেবারেই অকৃত্রিম।’
‘বাটওয়ারা ১৯৪৭’-এ হামিদা মির্জার চরিত্র করেছেন প্রীতি। চরিত্রটির জন্য প্রায় এক মাস উর্দু ও হিন্দি অনুশীলন করতে হয়েছে। দেশভাগের ঘটনায় তাঁকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ। তাঁর ভাষ্যে, ‘দেশভাগের সবচেয়ে বড় গল্প রাজনীতি নয়, মানুষের গল্প। কঠিন পরিস্থিতিতেও মানুষ প্রথমে নিজের পরিবারকে বাঁচানোর চেষ্টা করে।’
ছবিটি করতে গিয়ে ১৯৪৭ সালের নারীদের জীবন নিয়েও নতুনভাবে ভাবার সুযোগ হয়েছে। সে সময় নারীদের জীবন মূলত পরিবার, স্বামী ও সন্তানকে ঘিরেই আবর্তিত হতো। নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও ছিল সীমিত। প্রীতি বলেন, ‘শুটিং শেষে বাড়ি ফিরে মনে হয়েছে, আজকের সময়ে ভারতে জন্মেছি বলে আমি সত্যিই ভাগ্যবান। এখন নারীরা নিজের পছন্দে জীবন গড়তে পারে, নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ছবিটি আমাকে আরও শিখিয়েছে।’
এখন কি তাঁকে নিয়মিত সিনেমা বা সিরিজে দেখা যাবে? জানতে চাইলে মিষ্টি হেসে প্রীতি জানান, ভালো গল্প ও চ্যালেঞ্জিং চরিত্র পেলে অবশ্যই আরও কাজ করতে চান। তবে আপাতত কোনো সিরিজে অভিনয়ের পরিকল্পনা নেই, ‘একটি সিরিজের শুটিংয়ে ছয় থেকে আট মাস সময় লাগে। আমার সন্তানরা এখনো খুব ছোট। এত দিন তাদের ছেড়ে থাকতে চাই না। আমার স্বামী কাজের ব্যাপারে সব সময় সহযোগিতা করেন। তবু এই মুহূর্তে পরিবারই আমার প্রথম অগ্রাধিকার,’ বলেন প্রীতি।