পরিচালক অনুভব সিনহার সঙ্গে আবারও জুটি বাঁধলেন বলিউড অভিনেত্রী তাপসী পান্নু। নতুন ছবি ‘আশশি’-তে একজন সরকারি আইনজীবীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। এর আগে অনুভব সিনহার ‘মুল্ক’ ও ‘থাপ্পড়’ ছবিতেও কাজ করেছিলেন তাপসী। নতুন ছবিতে ‘রাভি’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় ইতিমধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে। সম্প্রতি সংবাদ সংস্থা আইবিএনএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নতুন ছবি ছাড়াও বদলে যাওয়া সিনেমার ধারা, নারীর অবস্থান এবং দক্ষিণি চলচ্চিত্রে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এই অভিনেত্রী।
তিনি জানান, সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘আশশি’-তে ভারতে যৌন সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। শিরোনামের মধ্যেই রয়েছে প্রতীকী ইঙ্গিত—দেশটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০টি ধর্ষণের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়। ছবিতে এমন অপরাধের মানসিক, আইনি ও সামাজিক পরিণতি দেখানো হয়েছে।
‘মুল্ক’ ছবিতেও আইনজীবীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তাপসী। আবার একই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে দ্বিধা হয়েছিল কি না, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি ভাবার আগেই অনুভব সিনহা নিশ্চয় ভেবেছিলেন। কারণ, তিনিই আমাকে “মুল্ক”-এ পরিচালনা করেছিলেন। আমি নিশ্চিত ছিলাম, রাভি চরিত্রটি আলাদাভাবে লেখা হবে। তিনি জানতেন, একই অভিনেত্রীকে আবার আইনজীবীর ভূমিকায় নিচ্ছেন। তাই পার্থক্যটা স্পষ্ট রাখবেন। আমি নিরাপদ হাতে আছি, এই বিশ্বাস ছিল।’
তাপসী জানান, ‘মুল্ক’ ছবিতে তিনি নিজের পরিবারের হয়ে লড়েছিলেন। কিন্তু ‘আশশি’-তে তাঁর চরিত্র একজন সরকারি আইনজীবীর। যিনি নিয়মিত এমন মামলার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর ভাষায়, ‘একই পেশার চরিত্র হলেও ব্যক্তিত্ব ও জীবনযাত্রায় বড় পার্থক্য রয়েছে। একজন অভিনেত্রী হিসেবে এই চ্যালেঞ্জটা আমার কাছে রোমাঞ্চকর ছিল।’
চরিত্রটি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলতে তাপসী দিল্লির পাতিয়ালা হাউস আদালতেও গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘বাস্তব আদালতের পরিবেশ আর হিন্দি ছবিতে দেখানো আদালত একেবারেই আলাদা। ভয়াবহ মামলাগুলোর মধ্যেও একধরনের শীতলতা ও বিশৃঙ্খলা থাকে। তা কাছ থেকে দেখেছি। সে অভিজ্ঞতাই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি।’
রাভি চরিত্রে আবেগের ওঠানামা কীভাবে সামলেছেন—এ প্রশ্নে তাপসী বলেন, ‘দর্শক আমাকে আত্মবিশ্বাসী, কঠোর ও দক্ষ আইনজীবী হিসেবে দেখবেন। আদালতের ভেতরে রাভি আবেগতাড়িত নয়। তবে ক্লাইম্যাক্সে এমন একটি মুহূর্ত আসে, যখন সমাজের ওপর তার ভরসা নড়বড়ে হয়ে যায়। সেখানেই আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে। বাকি সময় চরিত্রটি সংযত ও পেশাদার।’
অনুভব সিনহা ছাড়াও অনুরাগ কশ্যপ ও সুজয় ঘোষের মতো নির্মাতার সঙ্গে কাজ করেছেন তাপসী। পরিচালকদের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তাপসী বলেন, ‘আমি পরিচালকদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখি। বিশেষ করে যাঁদের সঙ্গে একাধিকবার কাজ করেছি। তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা না থাকলে নিজেকে তাঁদের হাতে সঁপে দিতাম না। শুটিংয়ের সময় আমি মনিটরও দেখি না। পুরোপুরি পরিচালকের ওপর বিশ্বাস রাখি।’
‘আশশি’ ছবির কেন্দ্রে রয়েছেন অভিনেত্রী কানি কুসরুতি। গল্প মূলত তাঁর চরিত্রকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। তাই ছবিতে তাপসীর উপস্থিতি তুলনামূলক কম। তবে এতে তিনি মোটেও অনিশ্চিত নন। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘বেবি’, ‘মিশন মঙ্গল’ কিংবা ‘খেল খেল মে’-তেও তাঁর পর্দায় উপস্থিতি ছিল সীমিত। তাপসীর ভাষায়, ‘আমি অনিরাপদ নই। কেউ বেশি মনোযোগ পেলে তাতে আমার ভয় নেই। “আশশি”-তে কানির চরিত্রই মূল। আমি তাকে সমর্থন করেছিমাত্র। তবে পর্দায় সময় যত কমই হোক, নিজের উপস্থিতি দর্শককে টের পাইয়ে দিতে পারি।’
বলিউড ছবির সাম্প্রতিক বক্স অফিস ব্যর্থতা নিয়েও কথা বলেন তাপসী। তাঁর মতে, ‘হিন্দি সিনেমার বৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতি শুক্রবার যদি একই ধরনের ছবি মুক্তি পায়, মান নষ্ট হবেই। দর্শক ধীরে ধীরে আগ্রহ হারাবে, এটাই স্বাভাবিক।’
সমসাময়িক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে খোলামেলা মত প্রকাশ করা কতটা কঠিন—এ প্রশ্নে তাপসীর জবাব, ‘যেসব মানুষ নির্ভয়ে নিজের মত প্রকাশ করেন, তাঁদের সবাই পছন্দ করে না। বিশেষ করে যদি তিনি নারী হন। আমাদের সমাজ এখনো পিতৃতান্ত্রিক। তাই নারীর আত্মসচেতনতা অনেক সময় গ্রহণযোগ্য হয় না। আমি সেই ধাঁচে নিজেকে মানাই না। তাই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারি।’
দক্ষিণি চলচ্চিত্রে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়েও কথা বলেছেন তাপসী। তাঁর দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে অভিনেত্রীদের চেহারা ও উপস্থিতির ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘দক্ষিণি ছবিতে আকর্ষণীয় দেখাতে বিশেষ ধরনের পোশাক পরতে বলা হতো। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। সেটে নায়িকাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার মতো নারী সদস্য খুব কম থাকতেন। পরিচালক সরাসরি না বলে সহকারী পরিচালকের মাধ্যমে বার্তা দিতেন। সেটি আবার হেয়ার বা স্টাইলিং টিমের কাউকে জানানো হতো। অনেক সময় মনে হয়েছে, অভিনয়ের চেয়ে চেহারার দিকেই বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে। যেন নায়িকাদের উপস্থিতি দর্শকের কল্পনা পূরণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। দক্ষিণের ইন্ডাস্ট্রিতে বহু ক্ষেত্রে অভিনেত্রীদের শারীরিক সৌন্দর্যের ওপরই বেশি জোর দেওয়া হয়। নির্মাতাদের ধারণা, এতে ছবির প্রতি দর্শকের আকর্ষণ বাড়ে। কিন্তু এই মানসিকতা বদলানো প্রয়োজন।’