
নিজের সময়ের অন্যতম সেরা অভিনেতা ছিলেন দিলীপ কুমার। নতুন প্রজন্ম হয়তো তাঁর অধিকাংশ কাজের সঙ্গে খুব পরিচিত নয়, তবে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’-এ সেলিম চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও অমর। এই ছবিতেই তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন তৎকালীন প্রেমিকা মধুবালা। পর্দায় তাঁরা ছিলেন প্রেমে ব্যর্থ দুই মানুষ, আর বাস্তব জীবনেও ছবির শুটিং চলাকালেই তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। এমনকি ছবির সবচেয়ে রোমান্টিক দৃশ্যগুলোর সময়ও তাঁরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলতেন না।
একসময় এই দুই তারকা বিয়ের কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু সেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণার মধ্যেই দিলীপ কুমারের জীবনে আসে আরেকটি গভীর আঘাত, ‘মুঘল-ই-আজম’-এর পরিচালক কে আসিফের বিশ্বাসভঙ্গ।
দিলীপ কুমার একসময় কে আসিফকে নিজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মানুষ বলে মনে করতেন। প্রায় এক দশক ধরে তিনি আসিফের স্বপ্নের এই ছবির পাশে ছিলেন। কিন্তু পরে তিনি জানতে পারেন, বিবাহিত কে আসিফ তাঁর ছোট বোন আখতারের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন এবং দুজন পালিয়ে বিয়ে করেছেন। বিষয়টি জানার পর দিলীপ কুমার এতটাই মর্মাহত হন যে তিনি বোন ও পরিচালকের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং আর কখনো তাঁদের সঙ্গে দেখা না করার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথমে সেলিম চরিত্রে বাতিল হয়েছিলেন দিলীপ কুমার
আজ যে সেলিম চরিত্রে দিলীপ কুমারের অভিনয়কে তাঁর সেরা কাজগুলোর একটি বলা হয়, সেই চরিত্রের জন্য প্রথম দিকে তিনি নির্বাচিতই হননি। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে কে আসিফ তাঁকে বলেছিলেন, তিনি সেলিম চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ‘খুব বেশি তরুণ’।
‘তোমার মধ্যে রাজকীয় ভাব আছে, কিন্তু আমি চরিত্রটিকে আরও পরিণত চেহারায় চাই’—আসিফ তাঁকে এমনটাই বলেছিলেন।
এরপর আসিফ একই চরিত্র নিয়ে অন্য একটি ছবি শুরু করলেও অর্থনৈতিক সংকটে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক বছর পর যখন ‘মুঘল-ই-আজম’ নতুন করে শুরু হয়, তখন দিলীপ কুমার তত দিনে বড় তারকা। তখন আসিফের চোখে তিনিই হয়ে ওঠেন সেলিম চরিত্রের জন্য একেবারে উপযুক্ত মানুষ।
আসিফ ও আখতারের সম্পর্ক
‘মুঘল-ই-আজম’ নির্মাণের সময় দিলীপ কুমার ও কে আসিফের বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়। মধুবালার সঙ্গে বিচ্ছেদের কঠিন সময়েও আসিফ তাঁর পাশে ছিলেন। এই সময়েই আসিফ নিয়মিত দিলীপ কুমারের বাড়িতে যাতায়াত করতেন। কিন্তু দিলীপের অজান্তেই তাঁর ছোট বোন আখতারের সঙ্গে পরিচালকের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
সমস্যা ছিল একাধিক। কে আসিফ তখন দুবার বিবাহিত, প্রথমে তিনি সিতারা দেবীকে বিয়ে করে বিচ্ছেদ করেন, পরে ‘মুঘল-ই-আজম’-এর অভিনেত্রী নিগার সুলতানাকে বিয়ে করেন। আখতারের বয়স ছিল তাঁর অর্ধেকেরও কম।
নিজের আত্মজীবনী ‘দিলীপ কুমার: দ্য সাবট্যান্স অ্যান্ড দ্য শ্যোডো’-এ দিলীপ কুমার লেখেন, ‘আখতার ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে মেধাবী সদস্যদের একজন। তাঁর পড়াশোনার জন্য পঞ্চাশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল, সবকিছুই তাঁর সহায়তায়।’
তিনি লেখেন, ‘আমি জানতামই না যে আখতার আর আসিফের মধ্যে প্রেম গড়ে উঠেছে এবং তারা আমার সম্মতি ছাড়াই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা জানত, আমি কখনোই আমার সবচেয়ে শিক্ষিত বোনকে এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে মেনে নেব না, যিনি দ্বিবার বিবাহিত, অনেক বেশি বয়সী এবং যার জীবনদর্শন আমাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
এ ঘটনার পর তিনি আখতার ও আসিফ—দুজনের সঙ্গেই বহু বছর দূরত্ব বজায় রাখেন।
প্রিমিয়ারে যাননি দিলীপ কুমার
কে আসিফ যখন ‘মুঘল-ই-আজম’ শুরু করেন, তখন তিনি সিতারা দেবীর স্বামী ছিলেন। ছবির কাজ চলাকালেই তিনি নিগার সুলতানাকে বিয়ে করেন, এরপর আখতারের সঙ্গে পালিয়ে যান। এই ঘটনায় দিলীপ কুমার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
দিলীপ কুমারের আত্মজীবনীতে সিতারা দেবী লেখেন, এই বিশ্বাসভঙ্গ তাঁকে ‘সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছিল’।
এই যন্ত্রণার কারণেই ছবির কাজ শেষ হওয়ার পর দিলীপ কুমার মুক্তির আগে কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেননি, এমনকি প্রিমিয়ারেও যাননি। সিতারা দেবীর ভাষায়, ‘আসিফ তাঁর বিশ্বাস ভেঙেছিল বলেই দিলীপ ভাই প্রিমিয়ারে যাননি এবং ট্রায়াল শোতেও ছবিটি দেখতে অস্বীকার করেছিলেন।’
সিতারা দেবী দিলীপ কুমারকে ছোট ভাইয়ের মতো দেখতেন এবং ‘ভাইজান’ বলে ডাকতেন। তিনি বলেন, ‘আমি আসিফকে অভিশাপ দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, দিলীপ ভাইকে প্রতারণা করার এই পাপের জন্য সে অল্প বয়সেই মারা যাবে।’
১৯৭১ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে কে আসিফের মৃত্যু হলে সিতারা দেবীর মনে হয়, তাঁর সেই অভিশাপই সত্যি হয়েছে।
সাইরা বানু মিলিয়ে দেন ভাই-বোনকে
আখতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর বহু বছর কেটে যায়। এই সময় দিলীপ কুমার বিয়ে করেন অভিনেত্রী সাইরা বানুকে। সংসারে নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও তিনি আখতারের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখেননি, এমনকি আসিফের মৃত্যুর পরও নয়।
পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আখতার দিলীপ কুমারের সঙ্গে দেখা করতে চান। দিলীপ প্রথমে রাজি হননি।
আত্মজীবনীতে তিনি লেখেন, ‘আমি সাইরাকে স্পষ্ট বলেছিলাম-আমি যাব না। কিন্তু সাইরা আমাকে বোঝান, সে আমার বোন এবং খুব অসুস্থ।’
শেষ পর্যন্ত সাইরার উদ্যোগেই হাসপাতালে গিয়ে বোনের সঙ্গে দেখা করেন দিলীপ কুমার। ধীরে ধীরে আখতার আবার পরিবারের অংশ হয়ে ওঠেন।
২০২১ সালে ৯৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন কিংবদন্তি অভিনেতা দিলীপ কুমার।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে