‘অসসি’ সিনেমায় তাপসী পান্নু। আইএমডিবি
‘অসসি’ সিনেমায় তাপসী পান্নু। আইএমডিবি

২০ মিনিটে এক ধর্ষণ! ভারতে ধর্ষণের ভয়াবহতা মনে করিয়ে দিল ‘অসসি’

আর্টিকেল ১৫’, ‘মুল্ক’ এবং ‘থাপ্পড়’-এর মতো সামাজিক বার্তাবহী ছবির জন্য পরিচিত পরিচালক অনুভব সিনহা। এবার তিনি ‘অসসি’ ছবির মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছেন সমাজের এক গুরুতর বিষয়। দিল্লির পটভূমিকায় নির্মিত এই ছবির গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং সেই আতঙ্কের গল্প, যা সমাজে প্রতিটি নারী প্রতিমুহূর্তে অনুভব করেন।

একনজরেসিনেমা: ‘অসসি’পরিচালক: অনুভব সিনহাচিত্র্যনাট্য: অনুভব সিনহা ও গৌরব সোলাঙ্কিঅভিনয়: তাপসী পান্নু, মোহাম্মদ জিশান আয়ুব, কানি কুসরুতি, কুমুদ মিশ্রা, রেবতী, মনোজ পাহওয়া

কাহিনি
‘অসসি’—ভারতে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া ধর্ষণের আনুমানিক সংখ্যার দিকেই এই নাম ইঙ্গিত করে। ছবির শুরুতেই এক গা শিউরে ওঠা দৃশ্য। এক রাতে দিল্লির সুনসান এক মেট্রো স্টেশনের বাইরে থেকে পরিমা নামের (কানি কুসরুতি) এক স্কুলশিক্ষিকাকে একদল উচ্ছৃঙ্খল যুবক গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর চলন্ত গাড়ির মধ্যে অত্যন্ত নির্মমভাবে একে একে ধর্ষণ করে তাকে। এমনকি কার মধ্যে পুরুষত্ব বেশি, তা নিয়ে তাদের মধ্যে জোর প্রতিযোগিতা চলেছিল সেই অভিশপ্ত রাতে। এরপর তারা সেই শিক্ষিকাকে অর্ধনগ্ন অবস্থায় রেললাইনে ফেলে চলে যায়। পরদিন সকালে স্থানীয় এক যুবক ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় অচেতন পরিমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে গল্প ফিরে যায় অতীতে।

স্বামী বিনয় (মোহাম্মদ জিশান আয়ুব) ও ছেলে ধ্রুবকে নিয়ে সুখে সংসার করছিল পরিমা। বিনয় এক সুপারমার্কেটে কাজ করে। পরিমার সাজানো–গোছানো সংসারে আর্থিক প্রাচুর্য না থাকলেও ভালোবাসা আর আস্থা ছিল ভরপুর। তাই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্ত্রী পরিমার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিল বিনয়। স্ত্রীর শরীর এবং মনের দগদগে ক্ষতকে ভালোবাসা দিয়ে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিল বিনয়। এদিকে একরত্তি ধ্রুবের শিশুমন হয়তো বুঝেছিল তার মায়ের সঙ্গে চরম অন্যায় কিছু হয়েছে। তাই সে তার বাবাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছিল। ছোট্টো ধ্রুব এক রাতেই যেন অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল। এরপর শুরু হয় তদন্ত। ধর্ষণকারীদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশকে বেশি বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু তাদের আদালতে দোষী প্রমাণ করাটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পরিমার পাশে এসে দাঁড়ায় আইনজীবী রাভি (তাপসী পান্নু)।

‘অসসি’ সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবি

আইনি যুদ্ধে উঠে আসে সমাজব্যবস্থার আসল এবং ঘৃণ্য চেহারা। কাহিনি যত এগোয়, তত উঠে আসে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, পুলিশি ব্যবস্থার দুর্নীতি, ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির অপব্যবহার এবং সমাজের অসংবেদনশীলতাসহ আরও অনেক দিক। ছবির শুরুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য আছে, যেখানে বিনয় তার ছেলেকে মেয়েদের সম্মান করার শিক্ষা দেয়। এই বার্তাটিতে স্পষ্ট যে সঠিক শিক্ষা থেকেই গড়ে ওঠে সংবেদনশীল সমাজ।

ধর্ষণে অভিযুক্ত যুবকদের মধ্যে একজনের বাবা কীভাবে নিজের অর্থবল ব্যবহার করে সিস্টেমের সঙ্গে মিলেমিশে মামলাকে ভিন্ন খাতে ঘোরানোর চেষ্টা করে, তা দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে আদালতে নির্যাতিতার পক্ষে লড়তে গিয়ে রাভিকে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বারবার পরাজয়ের মুখে পড়তে হয়।

ক্ষমতার কাছে ন্যায় যেন বারবার মাথা নত করে। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতার সেই বাক্যটি আপনাকে বারবার মনে করিয়ে দেবে, ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’। তবে আদালতের ভেতর এমন কিছু সত্য সামনে আসে, যার সামনে শুধু নির্যাতিতার পরিবারই নয়, আদালতও সঠিক বিচার করতে নিজেকে অসহায় মনে করে। এদিকে রাভির সঙ্গে তার ভগ্নিপতি কার্তিকের (কুমুদ মিশ্রা) এক সমান্তরাল কাহিনি ছবির সঙ্গে এগোয়। কার্তিকের এক অন্ধকার অতীত আছে। এক পথ দুর্ঘটনায় তিনি তার স্ত্রীকে চিরতরে হারিয়েছে। ‘হিট অ্যান্ড রান’ মামলায় দোষীরা কেউ ধরা পড়েনি। তবে পরিচালক অনুভব সিনহা কার্তিকের স্ত্রীর ঘটনাটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেননি। আদালতের সামনে রাভি যখন অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করতে বারবার হোঁচট খাচ্ছে, তখন এক ছাতাধারী ব্যক্তির আবির্ভাব হয়। ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত যুবকদের মধ্যে কয়েকজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে সেই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি। ছাতার আড়ালে তিনি একের পর এক ধর্ষণকারীকে হত্যা করে। ছাতার আড়ালের ব্যক্তিটি কে, আর রাভি কি পারবে দোষীদের আইনি সাজা দিতে, পরিমা কি পাবে সঠিক বিচার, এসব প্রশ্নের জবাব পেতে দেখতে হবে ‘অসসি’। অনুভব সিনহা ও গৌরব সোলাঙ্কি লিখিত এই গল্প বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় নির্মিত।

‘অসসি’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

ভালো-মন্দ
দীর্ঘদিন পর আবার এক শক্তিশালী চরিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় ফিরছেন তাপসী পান্নু। তিনি ‘রাভি’র চরিত্রটি দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। ছবিতে জিশান আয়ুবের চরিত্রে গভীরতা রয়েছে। তবে তাঁর মতো অভিনেতাকে আরও ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারতেন পরিচালক। কোথাও কোথাও জিশানের চরিত্রে আবেগ কম মনে হয়েছে। কানি কুসরুতির অভিনয় প্রশংসনীয়। তিনি এক ধর্ষিতা নারীর মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। কুমুদ মিশ্রার চরিত্রটিও বেশ জটিল ও গম্ভীর, যা তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পর্দায় উপস্থাপন করেছেন। মনোজ পাহওয়া এবং রেবতীর অভিনয় চরিত্র অনুযায়ী যথাযথ। তবে নাসিরুদ্দিন শাহর মতো অভিজ্ঞ অভিনেতাকে অতিথি শিল্পীর ভূমিকাতে আরও সুন্দর করে ব্যবহার করা যেত। তার চরিত্রটি অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে। ‘অসসি’ ছবির কাহিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেঁধে রাখবে। তবে কাহিনি কখনো কখনো বিক্ষিপ্ত এবং অস্পষ্ট মনে হয়েছে। বেশ কিছু চরিত্র এবং সম্পর্ক স্পষ্টভাবে খোলাসা করেননি পরিচালক। অনুভব সিনহার মতো দক্ষ পরিচালকের থেকে আরও দক্ষ পরিচালনা আশা করা হয়েছিল। কাহিনি কোথাও কোথাও অস্পষ্ট মনে হয়েছে।  

শেষ কথা
‘অসসি’ শুধু বিনোদনের জন্য নয়, এটি ভারতে নারী নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। ছবিটি শেষে একাধিক প্রশ্ন রাখে, কবে সেই সময় আসবে, যখন নারীরা যেকোনো সময় নিঃসংকোচে সমাজে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে পারবে এবং নিরাপদ বোধ করবে? ভারতে প্রতি ২০ মিনিটে একটি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়, এই সত্যটি পুরো ছবিজুড়ে দর্শককে মনে করিয়ে দেওয়া হয়। অনুভব সিনহার ‘অসসি’ নারী-পুরুষ সবার অন্তরাত্মাকে নাড়িয়ে দেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই ছবির গল্পের মাধ্যমে তিনি সমাজের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। কথায় আছে, চলচ্চিত্র সমাজের আয়না, আর তার প্রভাব ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য হওয়া উচিত। এই ছবি ঠিক সেটাই করতে চেয়েছে। ‘অসসি’ ২০ ফেব্রুয়ারি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে।

‘অসসি’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি