
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে খুব কম মানুষই ভার্চ্যুয়াল জগৎ থেকে বাস্তবের তারকাখ্যাতির মঞ্চে পৌঁছাতে পারেন। সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি নাম ধর্না দুর্গা। ইনস্টাগ্রামের মজার ভিডিও থেকে শুরু করে বলিউডে মাধুরী দীক্ষিত ও তৃপ্তি দিমরির মতো তারকাদের সঙ্গে অভিনয়—ধর্নার যাত্রা যেন এক আধুনিক রূপকথা। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে সংগ্রাম, শোক আর কঠিন বাস্তবতার গল্প।
দিল্লির এক সাধারণ মেয়ের স্বপ্ন
ধর্না দুর্গার বেড়ে ওঠা দিল্লিতে। ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি নাচ ও নাটকের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। বিশেষ করে অভিনয়ের প্রতি তাঁর টান ছিল প্রবল। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে হঠাৎই বাধা হয়ে দাঁড়ায় করোনা মহামারি।
লকডাউনের কারণে কলেজের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। মঞ্চে অভিনয় বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও হারিয়ে ফেলেন তিনি। তখনই নিজের সৃজনশীলতাকে অন্যভাবে প্রকাশ করার পথ খুঁজতে শুরু করেন।
মজার বিষয় হলো, ধর্না নিজেই একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সময় নষ্টের মাধ্যম মনে করতেন। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে মজার ছলে বিভিন্ন চরিত্রের অনুকরণ করে ভিডিও পাঠানোর অভ্যাস তাঁর জীবন বদলে দেয়।
বন্ধুরা ধর্নাকে পরামর্শ দেন, ভিডিওগুলো অনলাইনে পোস্ট করতে। ২০২০ সালের মে মাসে তিনি প্রথম ভিডিও প্রকাশ করেন। ধীরে ধীরে তাঁর অভিনয়, অভিব্যক্তি ও বাস্তব জীবনের চরিত্রগুলোকে নিখুঁতভাবে তুলে ধরার দক্ষতা দর্শকদের নজর কাড়ে।
কীর্তনের আন্টি, বিউটি পার্লারের দিদি কিংবা আত্মীয়স্বজনের পরিচিত নানা চরিত্র—সবকিছুই তাঁর ভিডিওতে জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে।
দীপিকা পাড়ুকোন ও কোমল পান্ডের নজরে
ধর্নার জীবনের বড় মোড় আসে যখন জনপ্রিয় ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সার কমল পান্ডে তাঁর একটি ভিডিও শেয়ার করেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ নিয়ে তৈরি সেই ভিডিও লাখো দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়। এরপর আরেকটি বড় চমক আসে। বলিউড তারকা দীপিকা পাড়ুকোন তাঁর একটি ভিডিও নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে শেয়ার করেন। রাতারাতি ধর্নার পরিচিতি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
সাফল্যের আড়ালে গভীর শোক
ঠিক যখন ক্যারিয়ার গতি পাচ্ছিল, তখনই জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে বড় আঘাত। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ধর্না তাঁর বাবাকে হারান। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন বাবা। তাঁর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে ধর্না ও তাঁর মায়ের কাঁধে।
পরিবারের ব্যবসা সামলাতে শুরু করেন ধর্না। কিন্তু একজন নারী হিসেবে নানা অবিশ্বাস ও অবহেলার মুখে পড়তে হয়। অনেকেই মনে করতেন, তাঁরা ব্যবসা চালাতে পারবেন না।
পরে এক সাক্ষাৎকারে ধর্না বলেন, কনটেন্ট তৈরি করা তখন তাঁর কাছে আয়ের উৎস ছিল না, বরং শোক ও মানসিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসার আশ্রয় ছিল। ক্যামেরার সামনে হাস্যরসাত্মক চরিত্রে অভিনয় করলেও বাস্তবে তিনি লড়ছিলেন গভীর ব্যক্তিগত ক্ষতির সঙ্গে।
ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর
ক্রমে ধর্না ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। ২০২৩ সালে ফোর্বস ইন্ডিয়া তাঁকে দিল্লির শীর্ষ কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী সময়ে তিনি নেহা কক্কর, ভিকি কৌশল, রাজকুমার রাওসহ একাধিক তারকার সঙ্গে কাজ করেন। তবে তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও বড়।
স্বপ্ন ছিল বড় পর্দায়
থিয়েটারের ছাত্রী হিসেবে ধর্নার মূল স্বপ্ন ছিল অভিনেত্রী হওয়া। ২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তাঁর সবচেয়ে বড় ইচ্ছা হলো বড় পর্দায় অভিনয় করে মাকে নিজের সিনেমা দেখানো। সেই স্বপ্ন পূরণ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
২০২৫ সালে ‘সানি সংস্কৃতি কি তুলসি কুমারী’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক ঘটে তাঁর। ছবিতে অভিনয় করেন বরুণ ধাওয়ান ও জাহ্নবী কাপুর।
মাধুরী দীক্ষিতের সঙ্গে অভিনয়ের সুযোগ
এরপর আসে আরও বড় সুযোগ। ‘মা বেহেন’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান ধর্না। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী মাধুরী দীক্ষিত ও তৃপ্তি দিমরি। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সের মুক্তির পর প্রশংসিত হচ্ছে সিনেমাটি।
ধর্না জানিয়েছেন, তাঁকে শুধু অনুসারীর সংখ্যা দেখে নেওয়া হয়নি। তিনি একাধিক অডিশন দেন, অভিনয়দক্ষতার পরীক্ষা দেন এবং চরিত্রের জন্য নিজেকে প্রমাণ করার পরই সুযোগ পান।
ধর্নার ভাষায়, ইনস্টাগ্রামে তিনি যা করেন, সেটিও অভিনয়। তবে সিনেমার জন্য তাঁকে আলাদা করে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে