‘আওয়ারাপন ২’ সিনেমায় দিশা পাটানি ও ইমরান হাশমি। আইএমডিবি
‘আওয়ারাপন ২’ সিনেমায় দিশা পাটানি ও ইমরান হাশমি। আইএমডিবি

৩ দিনেই ১৩০ কোটি আয়, ১৯ বছর আগের স্মৃতি ফিরিয়ে হিট ইমরান হাশমি

২০০৭ সালে মুক্তির পর ‘আওয়ারাপন’ বক্স অফিসে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। প্রথম দিনে ছবিটির আয় ছিল মাত্র প্রায় ৭৯ লাখ রুপি, আর প্রথম সপ্তাহান্তে ভারতের নিট আয় দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২ কোটি ৮৮ লাখ রুপি। তখন ছবিটিকে ঘিরে ফ্র্যাঞ্চাইজি তৈরির সম্ভাবনাও ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় গল্প। টেলিভিশন, গান আর দর্শকের মুখে মুখে ‘আওয়ারাপন’ ধীরে ধীরে পেয়ে যায় কাল্ট মর্যাদা।

প্রায় দুই দশক পর সেই ছবির দ্বিতীয় কিস্তি ‘আওয়ারাপন ২’ মুক্তি পেয়েছে। আর অবাক করার মতো বিষয় হলো, মুক্তির মাত্র তিন দিনেই বিশ্বব্যাপী ছবিটির আয় ছাড়িয়েছে ১৩০ কোটি রুপি। তাহলে কী এমন করল ‘আওয়ারাপন ২’, যা পুরোনো একটি ব্যর্থ ছবির স্মৃতিকে নতুন করে দর্শকের মনে জাগিয়ে তুলল?

উত্তরটা সম্ভবত এক শব্দে—নস্টালজিয়া।
তবে শুধু পুরোনো ছবির নাম ব্যবহার করলেই নস্টালজিয়া তৈরি হয় না। ‘আওয়ারাপন ২’-এর নির্মাতারা বুঝেছেন, দর্শকের মনে প্রথম ছবির কোন জায়গাগুলো এখনো জীবন্ত। সেই জায়গাগুলোই তাঁরা ফিরিয়ে এনেছেন—শিবম পণ্ডিত, পুরোনো গান, পরিচিত সংলাপ, আবেগঘন মুহূর্ত এবং ইমরান হাশমির সেই চেনা বিষণ্ন মুখ।

যে ছবি ভুলে যাওয়ার কথা ছিল
২০০৭ সালে মোহিত সুরি পরিচালিত ‘আওয়ারাপন’-এ ইমরান হাশমি অভিনয় করেছিলেন শিবম পণ্ডিত চরিত্রে। প্রেম, বিচ্ছেদ, অপরাধবোধ, আত্মত্যাগ আর বিষণ্নতায় ভরা চরিত্রটি ছিল ইমরানের পরিচিত ইমেজের সঙ্গে মানানসই। কিন্তু সেই সময় ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে পারেনি। তবে সিনেমা হলের বাইরে ছবিটির ভাগ্য বদলাতে শুরু করে।

টেলিভিশনে বারবার প্রচার, শ্রোতাপ্রিয় গান এবং দর্শকের মুখে মুখে ছবিটি নতুন করে পরিচিতি পায়। বিশেষ করে ‘তোহ ফির আও’ ও ‘তেরা মেরা রিশতা’ গান দুটি ছবিকে টিকিয়ে রাখে। একই সঙ্গে শিবম পণ্ডিত হিসেবে ইমরানের তীব্র অভিনয় দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

অর্থাৎ ‘আওয়ারাপন’ বক্স অফিসে ব্যর্থ হলেও দর্শকের স্মৃতিতে ব্যর্থ হয়নি। এই জায়গাটিই ‘আওয়ারাপন ২’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি।

নতুন নায়ক নয়, ফিরলেন শিবম
‘আওয়ারাপন ২’-এর নির্মাতারা চাইলে সম্পূর্ণ নতুন গল্প, নতুন চরিত্র নিয়ে শুধু ‘আওয়ারাপন’ নামটি ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা তা করেননি। ফিরিয়ে এনেছেন ইমরান হাশমিকে শিবম পণ্ডিত হিসেবে। এ সিদ্ধান্তই হয়তো ছবিটির সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক চাল।

কারণ, দর্শক আসলে শুধু আরেকটি ‘আওয়ারাপন’ গল্পের জন্য অপেক্ষা করছিলেন না। তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন সেই শিবমকে আবার দেখার জন্য, যার সঙ্গে প্রায় ২০ বছর আগে তাঁরা আবেগের সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন।

ছবির শুরুতেই প্রথম কিস্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ফ্ল্যাশব্যাক ও নানা ইঙ্গিত দর্শককে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় শিবম ও আলিয়ার সেই পুরোনো জগতে। ফলে নতুন ছবিটি দেখার সময় দর্শককে নতুন করে চরিত্রটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হয় না। সম্পর্কটা আগে থেকেই তৈরি।

২০০৭ থেকে ২০২৬—দুই সময়কে যুক্ত করার সবচেয়ে শক্তিশালী সেতু তাই ইমরান হাশমির শিবম।

নস্টালজিয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র গান
‘আওয়ারাপন’-এর কথা উঠলে অনেক দর্শকের মনেই প্রথমে ভেসে ওঠে এর গান। ছবির গল্পের চেয়েও অনেকের কাছে গানগুলো দীর্ঘদিন বেঁচে ছিল।
‘তোহ ফির আও’ ও ‘তেরা মেরা রিশতা’ শুধু সিনেমার গান হয়ে থাকেনি; আলাদা করে শ্রোতাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। সেই জায়গাটিকে খুব ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছে দ্বিতীয় কিস্তি।

পুরোনো গানগুলো নতুনভাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ফলে পর্দায় গান শুরু হওয়ার আগেই দর্শকের মনে তৈরি হয়ে যায় পরিচিত আবেগ।
মূল ছবির গানগুলোর গায়ক পাকিস্তানি শিল্পী মুস্তাফা জাহিদকেও ‘আওয়ারাপন ২’-এর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যদিও ছবিতে তাঁর কণ্ঠ ব্যবহার করা হয়নি। এটিও ছিল নস্টালজিয়াকে কাজে লাগানোর একটি কৌশল।

‘আওয়ারাপন ২’ সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবি

প্রথম দৃশ্য থেকেই পুরোনোর সঙ্গে যোগাযোগ
‘আওয়ারাপন ২’-এর শুরুতেই প্রথম ছবির সঙ্গে একটি আবেগঘন যোগসূত্র তৈরি করা হয়। পরিচিত সেই পঙ্‌ক্তি—‘তু না আলগ হ্যায়, তু না জুদা হ্যায়, পর তুঝমে ভি খুদা হ্যায়’—শোনামাত্রই পুরোনো ছবির স্মৃতি ফিরে আসে।

এরপর গল্প যত এগোয়, শিবমের জগতের সঙ্গে দর্শকের আবেগও তত গভীর হয়।
স্পয়লার সতর্কতা: ছবির গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সামনে আসছে। শিবম যখন তাঁর প্রয়াত প্রেমিকা আলিয়ার নামে এক অচেনা শিশুর নাম রাখেন, তখন পুরোনো আবেগ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা, মুক্তি ও মানবতার প্রসঙ্গেও প্রথম ছবির পরিচিত সংলাপ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যেমন ‘কিসি মাজলুম কো আজাদ করনে কা মতলব হ্যায় পুরি ইনসানিয়াত কো আজাদ করনা’ কিংবা ‘দর্দ সে পুরানা রিশতা হ্যায়’—এসব সংলাপ পুরোনো দর্শকদের জন্য কেবল সংলাপ নয়, স্মৃতির দরজা খুলে দেওয়ার চাবি।

একই আবেগের পুনরাবৃত্তি, তবে নতুনভাবে
ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরেও ‘তেরা মেরা রিশতা’ ও ‘তোহ ফির আও’ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে গল্পের আবেগঘন মুহূর্তগুলোতে পুরোনো স্মৃতি বারবার ফিরে আসে।
বিশেষ করে গান দুটি যখন পর্দায় পূর্ণাঙ্গভাবে আসে, তখন সেটি শুধু গান শোনার মুহূর্ত থাকে না; হয়ে ওঠে একধরনের উদ্‌যাপন। পুরোনো ‘আওয়ারাপন’-এর দর্শকদের কাছে এসব দৃশ্য তাই বাড়তি আবেগ তৈরি করে।

আরও মজার বিষয় হলো, ‘তেরা মেরা রিশতা’ প্রথম ছবিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ব্যবহার করা হয়েছিল। আহত শিবমকে একটি মঠের কাছে সন্ন্যাসীরা উদ্ধার করার সময় গানটি বাজে। দ্বিতীয় ছবিতে সেই আবহকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
অর্থাৎ নির্মাতারা শুধু গান ফিরিয়ে আনেননি; গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিও ফিরিয়ে এনেছেন।

যখন ব্যর্থ ছবির সিক্যুয়েল বড় হিট
‘আওয়ারাপন ২’-এর সাফল্যের আরেকটি দিক হলো, এটি শুরু থেকেই নিশ্চিত বাণিজ্যিক সাফল্যের ছবি ছিল না। প্রযোজক বিশেষ ভাট আগেই জানিয়েছিলেন, এটি ‘ক্যাশ গ্র্যাব’ অর্থাৎ শুধু পুরোনো জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে টাকা বানানোর ছবি নয়। এমনকি শুরুতে ছবিটি নিয়ে পরিবেশকদের মধ্যেও আগ্রহ ছিল না।
কিন্তু মুক্তির পর পরিস্থিতি পুরো বদলে যায়।

সানি দেওলের তারকাবহুল দেশভাগের ছবি ‘বাটওয়ারা ১৯৪৭’-এর সঙ্গে একই সময়ে মুক্তি পেয়েও ‘আওয়ারাপন ২’ বক্স অফিসে এগিয়ে যায়। এখানেই ২০০৭ ও ২০২৬ সালের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

২০০৭ সালে ‘আওয়ারাপন’কে দর্শক খুঁজে নিতে হয়েছিল। ২০২৬ সালে ‘আওয়ারাপন ২’-এর ক্ষেত্রে দর্শক আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন।
প্রথম ছবিকে নিজের দর্শক তৈরি করতে হয়েছিল। দ্বিতীয় ছবিকে শুধু সেই পুরোনো দর্শকদের আবার সক্রিয় করে তুলতে হয়েছে।

‘আওয়ারাপন ২’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

নস্টালজিয়া মানেই পুরোনো জিনিসের স্তূপ নয়
‘আওয়ারাপন ২’-এর সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। নির্মাতারা ছবির মধ্যে জোর করে নস্টালজিয়া ঢোকাননি। বরং গল্প, চরিত্র, গান ও আবেগের স্বাভাবিক প্রবাহের মধ্যেই পুরোনো ছবির স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে এনেছেন।
ফলে নস্টালজিয়া এখানে গল্পের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো আলাদা উপাদান নয়; গল্প বলারই একটি অংশ।

আর দর্শকের জন্য এর প্রভাবও স্বাভাবিক—পরিচিত কোনো গান বাজে, পুরোনো সংলাপ ফিরে আসে, শিবমকে দেখা যায়; সঙ্গে সঙ্গে প্রায় দুই দশক আগের স্মৃতি জেগে ওঠে।

এ কারণেই ‘আওয়ারাপন ২’ শুধু একটি সিক্যুয়েল নয়, অনেক দর্শকের কাছে ২০০৭ সালের সেই সময়টিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ।

বক্স অফিসে নস্টালজিয়ার জয়
‘আওয়ারাপন ২’-এর সাফল্য তাই বলিউডের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কোনো ছবি মুক্তির সময় ব্যর্থ হলেই যে দর্শক সেটিকে ভুলে যান, এমন নয়।
কখনো কোনো সিনেমার বক্স অফিস ব্যর্থতা কেবল সেই সময়ের ফল। বছরের পর বছর গান, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দর্শকের ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্য দিয়ে ছবিটি নতুন জীবন পেতে পারে।

‘আওয়ারাপন’ ঠিক সেটিই করেছে। আর ‘আওয়ারাপন ২’ সেই জমে থাকা আবেগের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়েছে—পুরোনো গান নিয়ে, পুরোনো চরিত্র নিয়ে এবং সবচেয়ে বড় কথা, ইমরান হাশমির সেই চেনা শিবম পণ্ডিতকে নিয়ে।

প্রায় ১৯ বছর পর সেই স্মৃতিকে আবার বড় পর্দায় ফিরিয়ে এনে ছবিটি যেন প্রমাণ করল—বক্স অফিসে ব্যর্থ হওয়া আর দর্শকের মন থেকে হারিয়ে যাওয়া এক কথা নয়। কখনো কখনো দর্শক শুধু ফিরে আসার একটি কারণের অপেক্ষায় থাকেন।
‘আওয়ারাপন ২’ সেই কারণটি খুঁজে পেয়েছে।

ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে