
বলিউডে জাহ্নবী কাপুরের যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘স্টার কিড’ পরিচয় নিয়ে। অভিনেত্রী শ্রীদেবী ও প্রযোজক বনি কাপুরের মেয়ে হওয়ায় ক্যামেরার আলো তাঁর ওপর ছিল জন্ম থেকেই। কিন্তু গত আট বছরে জাহ্নবী শুধু অভিনয় নয়, নানা বিতর্কের কারণেও নিয়মিত শিরোনামে উঠে এসেছেন। কখনো নেপোটিজম–বিতর্ক, কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাহসী উপস্থিতি, আবার সম্প্রতি ‘পেড্ডি’ সিনেমায় তাঁর চরিত্র ও উপস্থাপনাকে ঘিরে নতুন সমালোচনা—সব মিলিয়ে তিনি আজ বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ অভিনেত্রীদের একজন।
‘পেড্ডি’–বিতর্ক: নারী চরিত্র নাকি ‘গ্ল্যামার অবজেক্ট’
সম্প্রতি ‘পেড্ডি’ ছবির প্রচারণা ঘিরে নতুন বিতর্কের মুখে পড়েন জাহ্নবী। ছবিতে তাঁর চরিত্রের কিছু পোস্টার, গান ও প্রচারণামূলক দৃশ্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচকদের একটি অংশ অভিযোগ তোলে যে তাঁকে অতিরিক্ত ‘গ্ল্যামারাইজ’ করা হয়েছে। অনেকের মতে, চরিত্রটির গভীরতার চেয়ে তাঁর শারীরিক আবেদনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতীয় বাণিজ্যিক ছবিতে নারী চরিত্রের উপস্থাপনাকে ঘিরে যে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, ‘পেড্ডি’ সেই আলোচনাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, একজন প্রতিভাবান অভিনেত্রীকে কেন এখনো অনেক ক্ষেত্রে ‘সাজসজ্জার উপাদান’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
যদিও ছবির নির্মাতারা দাবি করেছেন, পুরো সিনেমা না দেখে এমন মন্তব্য করা ঠিক নয় এবং চরিত্রটির গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরে নির্মাতা ক্ষমা চেয়েছেন। জানিয়েছেন, বিতর্কিত দৃশ্যগুলো সম্পাদনা করা হবে।
নেপোটিজম: ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ছায়াসঙ্গী
জাহ্নবীর সবচেয়ে বড় বিতর্ক নিঃসন্দেহে নেপোটিজম। ২০১৮ সালে ‘ধড়ক’ দিয়ে তাঁর অভিষেকের পর থেকেই অভিযোগ ওঠে যে সাধারণ শিল্পীদের তুলনায় তিনি অনেক বেশি সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে করণ জোহরের সমর্থন পাওয়ায় এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়।
২০২০ সালে সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর বলিউডে স্বজনপ্রীতি নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে জাহ্নবীও সমালোচনার মুখে পড়েন। যদিও তিনি সরাসরি কোনো বিতর্কে জড়াননি, তবু ‘স্টার কিড’ পরিচয়ের কারণে তাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ট্রলের শিকার হতে হয়।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জাহ্নবী বলেন, সুযোগ পাওয়া আর সেই সুযোগ ধরে রাখা এক বিষয় নয়। দর্শক গ্রহণ না করলে কোনো তারকাসন্তানই টিকে থাকতে পারে না।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে চর্চা
জাহ্নবীর ব্যক্তিগত জীবনও প্রায়ই সংবাদমাধ্যমের আলোচনার বিষয় হয়েছে। ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য শিখর পাহাড়িয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বহু বছর ধরে গুঞ্জন চলছে। কখনো তাঁদের একসঙ্গে ছুটি কাটাতে দেখা গেছে, কখনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।
যদিও দীর্ঘ সময় তাঁরা সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি, পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁদের ঘনিষ্ঠ উপস্থিতি সেই জল্পনাকে আরও জোরালো করে।
বলিউডে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। কিন্তু জাহ্নবীর ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই তাঁর কাজের চেয়ে বেশি সংবাদ শিরোনাম হয়েছে।
অ্যালকোহলে আসক্তি নিয়ে কথা বলে বিপাকে
এই বিতর্কের সূত্রপাত রাজ সামানির পডকাস্টে দেওয়া জাহ্নবীর এক মন্তব্য থেকে। সেখানে তিনি বলেছিলেন, জীবনের এক কঠিন অভিজ্ঞতার পর তিনি কিছু সময় নিয়মিত মদ্যপান করতেন। তবে জাহ্নবী পরিষ্কার করেন, ‘আমি বলব না যে আমি আসক্ত ছিলাম বা অ্যালকোহলের অপব্যবহার করতাম, কিন্তু তখন আমি প্রায়ই মদ্যপান করতাম।’
বিষয়টি বুঝে উঠতে সময় লেগেছিল অভিনেত্রীর। ক্রমে বুঝতে পারছিলেন, মদ্যপান তাঁর স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। সকালবেলায়ও অস্বস্তি হতো তাঁর।
জাহ্নবীর কথায়, ‘আমার স্বাস্থ্যের ওপর যে প্রভাব পড়ছিল, সেটা আমার ভালো লাগছিল না। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর যে অনুভূতি হতো, তা মোটেই সুখকর ছিল না। নিজের শরীর থেকেই এক অদ্ভুত গন্ধ বেরোত। এই গন্ধ আমার খুব পরিচিত ছিল। আমারই এক চেনা ব্যক্তি, যিনি নেশাগ্রস্ত থাকতেন, তাঁর শরীর থেকে এমন গন্ধ বেরোত।’ এভাবেই ক্রমে বুঝলেন, মদ্যপান মোটেই ঠিক নয় স্বাস্থ্যের জন্য। ক্রমে সেই অভ্যাস ত্যাগ করেন অভিনেত্রী।
এ বক্তব্য প্রকাশের পর ব্যাপক বিতর্কের মুখে পড়েন জাহ্নবী। পরে বিবৃতি দিয়ে নিজের অবস্থান স্পস্ট করেন। বলেন, মাদকাসক্তি নিয়ে নিজের মন্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
পোশাক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিতর্ক
জাহ্নবী কাপুরের ফ্যাশন সেন্স নিয়ে যেমন প্রশংসা হয়, তেমনি সমালোচনাও কম নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিভিন্ন ফটোশুট, জিম লুক কিংবা গ্ল্যামারাস উপস্থিতি নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক তৈরি হয়। রক্ষণশীল দর্শকদের একটি অংশ তাঁকে ‘অতিরিক্ত সাহসী’ বলে সমালোচনা করে।
অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি, একজন অভিনেত্রীর পোশাক বা ব্যক্তিগত স্টাইলকে কেন্দ্র করে বিচার করা অনুচিত। তাঁদের মতে, জাহ্নবী কেবল আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ট্রেন্ড অনুসরণ করছেন।
এই বিতর্ক বহুবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্কের জন্ম দিয়েছে।
‘মিলি’থেকে ‘উলাজ’: অভিনয় বনাম ইমেজ
ক্যারিয়ারের শুরুতে সমালোচকেরা অভিযোগ করতেন, জাহ্নবী অভিনয়ের চেয়ে নিজের তারকা পরিচয়ের ওপর বেশি নির্ভর করছেন।
তবে ‘গুঞ্জন সাক্সেনা: দ্য কারগিল গার্ল’, ‘মিলি’ ও ‘উলজ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাহ্নবী প্রশংসাও পেয়েছেন।
তবু অনেক সময় দেখা গেছে, তাঁর অভিনয় নিয়ে আলোচনা শুরুর আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পোশাক, সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়।
এটিও জাহ্নবীর ক্যারিয়ারের একটি বড় বাস্তবতা।
দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় প্রবেশ ও নতুন বিতর্ক
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাহ্নবী দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় নিজের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছেন। ‘দেবারা: পার্ট ১’ ও ‘পেড্ডি’র মতো বড় বাজেটের ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি নতুন দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছেছেন।
কিন্তু এখানেও সমালোচনা জাহ্নবীকে ছাড়েনি। কিছু সমালোচক অভিযোগ করেছেন, দক্ষিণ ভারতীয় বাণিজ্যিক ছবিতে তাঁকে অনেক সময় চরিত্রের চেয়ে তারকা আকর্ষণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ভক্তদের মতে, জাহ্নবী ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করছেন এবং বড় বাণিজ্যিক ছবির অংশ হওয়াও একজন অভিনেত্রীর ক্যারিয়ারের স্বাভাবিক ধাপ।
শ্রীদেবীর মেয়ে হওয়ার চাপ
জাহ্নবীকে ঘিরে প্রায় সব বিতর্কের পেছনে আরেকটি বিষয় কাজ করে—তিনি শ্রীদেবীর মেয়ে।
ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে শ্রীদেবীর মতো জনপ্রিয়তা খুব কম অভিনেত্রী পেয়েছেন। ফলে জাহ্নবীর প্রতিটি কাজই মায়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই তুলনা যেমন তাঁকে বাড়তি সুযোগ দিয়েছে, তেমনি বাড়তি চাপও তৈরি করেছে। একজন নতুন অভিনেত্রী হিসেবে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার আগেই তাঁকে কিংবদন্তি মায়ের উত্তরসূরি হিসেবে বিচার করা হয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে