‘মহানগর’ সিনেমায় জয়া। আইএমডিবি
‘মহানগর’ সিনেমায় জয়া। আইএমডিবি

সত্যজিতের ‘বাণী’ আজ ৭৮-এ পা দিলেন, জয়াকে কতটা চেনেন

শুরুটা সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে, ছোট একটা চরিত্রে। কিন্তু সেখানেও ঠিকই নিজের ছাপ রেখেছিলেন। পরে শুরু হয় হিন্দি সিনেমার যাত্রা, বলিউডের মহাতারকার সঙ্গে প্রেম, অতঃপর বিয়ে। অভিনয়ের বাইরে রাজনীতি করেছেন, স্পষ্টভাষী হিসেবে বিশেষ পরিচিতি আছে তাঁর। তিনি আর কেউ নন—জয়া বচ্চন। আজ ৯ এপ্রিল অভিনেত্রীর জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।

শুরুর গল্প
১৯৪৮ সালের ৯ এপ্রিল মধ্যপ্রদেশের জবলপুরে জন্ম জয়া ভাদুড়ীর (বিয়ের পর বচ্চন)। তাঁর বাবা তরুণ কুমার ভাদুড়ী ছিলেন খ্যাতিমান সাংবাদিক ও লেখক। সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা জয়ার মধ্যে ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়।

খুব অল্প বয়সেই জয়া ভর্তি হন ভারতের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ায়। সেখানে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স তাঁকে ‘গোল্ড মেডেল’ এনে দেয়, যা তাঁর প্রতিভার প্রথম বড় স্বীকৃতি।

একটা বিষয়ে আমি জয়াকে খুব সম্মান করি। বিয়ের পর জয়া সিনেমার চেয়েও পরিবারের প্রতি বেশি মনোনিবেশ করেছিল। এমন নয় যে এ বিষয়ে ওর ওপর কোনো বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু স্বেচ্ছায় ও এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
অমিতাভ বচ্চন

চলচ্চিত্রে উত্থান
জয়ার চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’-এ বাণী চরিত্র দিয়ে। তবে মূলধারার হিন্দি সিনেমায় তাঁর শক্তিশালী আগমন ঘটে ‘গুড্ডি’ ছবির মাধ্যমে। এই ছবিতে তিনি এক সরল, স্বপ্নবিলাসী এক স্কুলছাত্রীর চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয় জয় করেন।

জয়া বচ্চন। আইএমডিবি

এরপর একের পর এক ছবিতে জয়া নিজেকে প্রমাণ করেন—‘অভিমান’, ‘কোশিশ’, ‘মিলি’, ‘চুপকে চুপকে’ সিনেমায়। প্রতিটি ছবিতেই তাঁর অভিনয় ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, সংযত এবং গভীর।

বিশেষ করে ‘অভিমান’ ছবিতে এক গায়িকার আত্মসম্মান ও সম্পর্কের টানাপোড়েন যেভাবে জয়া ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা আজও অভিনয়ের পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

জানা-অজানা জয়া ১
জয়ার বাবা ছিলেন ভারতের খ্যাতিমান সাংবাদিক ও লেখক তরুণ কুমার ভাদুড়ী ও মা ইন্দিরা ভাদুড়ী। জয়া ভোপালের সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৬ সালে ভারতের সেরা এনসিসি ক্যাডেট সম্মানে সম্মানিত হন। ১৯৮৮ সালে বিখ্যাত বলিউড সিনেমা ‘শাহেনশাহ’-এর জন্য চিত্রনাট্য লিখেছিলেন জয়া বচ্চন, যেখানে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তাঁর স্বামী। ২০০২ সালে প্রকাশ পেয়েছিল ‘টু বি অর নট টু বি অমিতাভ বচ্চন’। এই বইয়ের মাধ্যমে নিজের স্বামী অমিতাভ বচ্চনকে তাঁর ৬০তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন জয়া।

অমিতাভের সঙ্গে সম্পর্ক: রূপকথা ও বাস্তবতা
জয়ার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় তাঁর দাম্পত্য জীবন। অমিতাভের সঙ্গে তাঁর প্রেম এবং পরে বিয়ে—বলিউডের ইতিহাসে এক ক্ল্যাসিক গল্প।

‘গুড্ডি’ ও ‘অভিমান’-এর সময় থেকেই অমিতাভ-জয়ার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। ১৯৭৩ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। বিয়ের পর ধীরে ধীরে জয়া অভিনয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন—পরিবারকে সময় দেওয়ার জন্য।

ভারতের সিনেজগতের ফার্স্ট কাপল বলা হয় অমিতাভ–জয়াকে। পাঁচ দশক পেরিয়েও এভারগ্রিন জুটি। বি-টাউনের এই গোল্ডেন জুটিকে নিয়ে ফ্যানদের আকর্ষণ এখনো আকাশচুম্বী।

অমিতাভ–জয়ার দাম্পত্য জীবন সব সময় মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে রেখাকে ঘিরে গুঞ্জন তাঁদের সম্পর্ককে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তবে জয়া সব সময় সংযমী থেকেছেন। তিনি কখনো প্রকাশ্যে বিতর্কে জড়াননি; বরং নীরব দৃঢ়তায় নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।

১৯৭৩ সালের জুনে অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জয়া। ফেসবুক থেকে

কিছুদিন আগে নাতনি নব্যা নাভেলি নন্দার পডকাস্টে নিজের প্রেম ও বিয়ে নিয়ে কথা বলেন জয়া। অমিতাভের সঙ্গে তাঁর প্রেম ও বিয়ে নিয়ে অকপট ছিলেন জয়া। জানালেন, তাঁদের বিয়ের আগেই অমিতাভ শর্ত দিয়ে রেখেছিলেন যে বিয়ের পর প্রতিদিন ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত কাজ করা যাবে না। তবে বিগ বি যে তাঁকে কাজ ছাড়তে বলেননি, তা-ও জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী।

জানা-অজানা জয়া ২
জয়া বচ্চন ২০০৪ সালে প্রথম সমাজবাদী পার্টি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত রাজ্যসভায় উত্তর প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০০৬ সালের জুনে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হন, ২০১০ সালের জুলাই পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। ২০১২ সালে তিনি তৃতীয় মেয়াদে এবং ২০১৮ সালে চতুর্থ মেয়াদে পুনর্নির্বাচিত হন।

বিয়ের দিনক্ষণ পরিবর্তন নিয়েও মুখ খুলেছেন জয়া। তাঁর কথায়, ‘প্রথমে ঠিক করেছিলাম আমরা অক্টোবরে বিয়ে করব। কারণ, ওই সময় আমার কাজের চাপ কম থাকবে। কিন্তু অমিতাভ জানায়, বিয়ের পরও আমি রোজ কাজ করি, সেটা ওর পছন্দ নয়।’ বিয়ের পর সিনেমায় কাজ করা প্রসঙ্গে অমিতাভ জয়াকে পরামর্শ দিয়ে জানান, তিনি যেন শুধু ভালো পরিচালক ও প্রযোজকদের সঙ্গেই কাজ করেন।
জয়া ও অমিতাভের দুই সন্তান অভিষেক বচ্চন ও শ্বেতা বচ্চন। একজন মা হিসেবে জয়া সব সময়ই ছিলেন কঠোর, কিন্তু যত্নশীল।

জয়া বচ্চন। আইএমডিবি

অভিষেকের ক্যারিয়ার গড়ার সময় জয়া পাশে থেকেছেন, আবার শ্বেতাকে মিডিয়ার অতিরিক্ত আলো থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। পরিবারই তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু—এ কথা তিনি বারবার বলেছেন।

বিরতি ও প্রত্যাবর্তন
১৯৮০-এর দশকে জয়া প্রায় পুরোপুরি অভিনয় থেকে সরে যান। এ প্রসঙ্গে ২০১৪ সালে অমিতাভ বলেছিলেন, ‘একটা বিষয়ে আমি জয়াকে খুব সম্মান করি। বিয়ের পর জয়া সিনেমার চেয়েও পরিবারের প্রতি বেশি মনোনিবেশ করেছিল। এমন নয় যে এ বিষয়ে ওর ওপর কোনো বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু স্বেচ্ছায় ও এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’ দীর্ঘ বিরতির পর তিনি আবার পর্দায় ফিরে আসেন ‘হাজার চুরাশি কি মা’ ছবির মাধ্যমে। এই ছবিতে একজন মায়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় নতুন প্রজন্মকেও মুগ্ধ করে।

পরবর্তী সময়ে ‘কাভি খুশি কাভি গাম’-এ জয়ার সংযত কিন্তু আবেগঘন অভিনয় তাঁকে আবারও জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে আসে।

জয়া ও রেখা
১৯৭৩ সালের জুনে অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
রেখার সঙ্গে অমিতাভের সম্পর্কের গুজবের সূত্র ধরে দুই নায়িকার সম্পর্কে অবনতি হয়। তবে তাঁর আগে রেখা ও জয়া ছিলেন ঘনিষ্ঠ। এই দুই নায়িকার জীবনে অমিতাভ বচ্চন আসার আগে জয়া আর রেখা ছিলেন একই অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দা। পরস্পরের প্রতিবেশী ছিলেন তাঁরা। এমনকি জয়ার ফ্ল্যাটেও বেড়াতে আসতেন রেখা। গল্প করতেন, চা খেতেন। হাতে করে নিয়ে আসতেন উপহারও। তবে এসবই ঢাকা পড়ে গেছে দুই নায়িকার তিক্ত সম্পর্কের আড়ালে। সত্তরের দশকের শুরুতে জয়া আর রেখা প্রাণের বান্ধবী ছিলেন। জানা যায়, দুজনের রোজকার জীবনে কী কী ঘটছে, তা নিয়েও আলোচনা করতেন দুই অভিনেত্রী। পরস্পরের মতামতকে সম্মানও জানাতেন।

রাজনীতিতে প্রবেশ: নতুন অধ্যায়
অভিনয়ের পাশাপাশি জয়া নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রাজনীতিতেও। তিনি সমাজবাদী পার্টির হয়ে রাজ্যসভায় একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন।
একজন সাংসদ হিসেবে জয়া নারীর অধিকার, চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নয়ন এবং সামাজিক নানা বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। সংসদে তাঁর বক্তব্য প্রায়ই স্পষ্ট ও দৃঢ়, যা তাঁকে একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক কণ্ঠে পরিণত করেছে।

জয়া বচ্চন

বিতর্ক ও সমালোচনা
জয়ার ব্যক্তিত্বের একটি দিক হলো তাঁর স্পষ্টভাষিতা। মিডিয়ার সামনে তিনি কখনো কখনো বিরক্তি প্রকাশ করেছেন, বিশেষ করে ব্যক্তিগত প্রশ্নে। তিনি প্রকাশ্যে এলে একেবারেই ক্যামেরাবন্দী হতে চান না। এ নিয়ে পাপারাজ্জিদের সঙ্গে বহুবার তাঁর বচসা হয়েছে। সব জায়গায় সব প্রশ্নও নিতে পারেন না জয়া। বিশেষ করে সামাজিক বা ব্যক্তিগত কোনো অনুষ্ঠানে তাঁর উদ্দেশে রাজনৈতিক প্রশ্ন উড়ে এলেই ক্ষুব্ধ হন জয়া।
শাহরুখ একবার ঐশ্বর্যের বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছিলেন। শুনে এতটাই রেগে গিয়েছিলেন জয়া, বলেছিলেন, তাঁর নিজের বাড়িতে শাহরুখ এ কথা বললে তিনি তাঁর গালে একটা থাপ্পড় মারতেন। শাসন করতেন নিজের ছেলের মতো করেই। তবে এই মন্তব্যের রেশ বেশিদিন ছিল না। দ্রুত তিক্ততা ভুলে শাহরুখকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন জয়া।
জয়ার মেজাজ নিয়ে তটস্থ থাকেন বচ্চন পরিবারও। একবার ‘কফি উইথ করণ’-এ এসে অভিষেক বলেছিলেন, সপরিবার ছুটি কাটাতে গেলে তাঁদের প্রার্থনা থাকে, যেন সেখানে কোনো পাপারাজ্জির মুখে পড়তে না হয়!

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে