
সিনেমা শেষ হয়েছে মিনিট পাঁচেক, কিন্তু দর্শকের করতালি তখনো শেষ হয়নি। সবাই দাঁড়িয়ে গেছেন। সিনেমাটি যে তাঁদের মুগ্ধ করেছে, বলাই বাহুল্য। গত ২৮ জুলাই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের সিনেমা ‘দেলুপি’র বিশেষ প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন বহু মানুষ, অনেকে আসন না পেয়ে সিঁড়িতে বসেই সিনেমা দেখেছেন। অথচ গত বছরের শেষে যখন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘দেলুপি’, খুব বেশি দর্শক পায়নি। ফলে কয়েক সপ্তাহ পরই হল থেকে নেমে যায়। এদিন ঢাকায় ছিল উন্মুক্ত প্রদর্শনী। কেবল বিনা মূল্যে দেখা যাবে বলেই কি এত ভিড়?
এক সপ্তাহ পিছিয়ে যাওয়া যাক। ১৭ জুলাই, ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য অডিসি’র সঙ্গে হলে মুক্তি পায় মোহাম্মদ নূরুজ্জামানের মাস্তুল’। অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনসহ অনেকেই সিনেমাটির প্রশংসা করেছেন। কিন্তু ফল একই—ঢাকার সবচেয়ে বড় মাল্টিপ্লেক্স চেইনে ছবিটি চলে এক সপ্তাহ। শেষ দিনে (২৩ জুলাই) নির্মাতা ফেসবুকে পোস্টও দেন, ‘আজই শেষ দিন, দেখলে দেখে আসুন।’
দেশে দেশে স্বাধীন ধারার সিনেমা নির্মাণ, বিপণন ও পরিবেশনার সংগ্রাম নতুন নয়। তবে বাংলাদেশে বিকল্প প্রদর্শনীতে নানা জটিলতা, প্রচারের অভাবসহ নানা কারণ স্বাধীন ধারার নির্মাতাদের যাত্রা আরও কঠিন করে তুলেছে।
বিকল্প প্রদর্শনীতে নানা ঝক্কি
মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম মনে করেন, স্বাধীন ধারার সিনেমা তো বটেই, বাংলাদেশে মূল ধারার সিনেমার পরিবেশনা, বিপণনের অবস্থাও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কারণ পরিবেশক কম, সিনেমা হলও কম। ফলে স্বাধীন ধারার অনেক নির্মাতাই বিকল্প উপায়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। একটা বিকল্প হতে পারে স্থায়ী কোনো প্রদর্শনীর জায়গা। কিন্তু এখানেও ঝামেলা। আইন অনুযায়ী, সার্টিফিকেশন সনদ পাওয়া সিনেমার প্রদর্শনী প্রেক্ষাগৃহের বাইরে করা যায় না। সিনেমা হলের বাইরে প্রদর্শনী করতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হয়। ‘দেলুপি’, ‘শাটিকাপ’ নির্মাতা এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশজুড়ে নানা জায়গায় চলচ্চিত্রের সংগঠন আছে। তারা যদি প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে সিনেমা দেখায়, তাহলে মানুষের সিনেমার প্রতি আগ্রহও তৈরি হবে। এভাবে একটা বিকল্প বিপণনের ব্যবস্থাও তৈরি হবে। এভাবে হয়তো বিকল্প বিপণনও মূল ধারার বিপণনের সমান্তরালে উঠে আসতে পারে।
‘সাঁতাও’ নির্মাতা খন্দকার সুমনও আইনে পরিবর্তন এনে বিকল্প প্রদর্শনী আরও সহজ করার তাগাদা দিলেন। ‘এই আইন ব্রিটিশরা করে গেছে। আমরা এত পরিবর্তনের কথা বলি, অথচ এ ধরনের আগ্রাসী আইন বদলের আকাঙ্ক্ষা দেখি না। ফলে দেশে এখন যা দুই-একটা চলচ্চিত্র উৎসব হয়, সেগুলোতেও নানাভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আপনি যখন একটি চলচ্চিত্রকে সার্টিফিকেশন বোর্ড থেকে প্রদর্শনের উপযোগী ঘোষণা করেছেন, তখন তো আর এটার প্রদর্শনীতে বাধা থাকার কথা নয়। এসব বিষয় ঠিক না হলে পরিবর্তন কঠিন। সিনেমা বানানো কঠিন, প্রদর্শনী করাও কঠিন। এই ইকোসিস্টেমটা তৈরি হয়নি।’
তিনি (তারেক মাসুদ) বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করতেন। আমিও কিন্তু আগের সিনেমায় (‘আম কাঁঠালের ছুটি’) ৫০টির বেশি প্রদর্শনী করেছি। এসব প্রদর্শনী থেকে বিনিয়োগের অনেকটাই উঠে এসেছে।মোহাম্মদ নূরুজ্জামান
গত কয়েক মাসে দেশজুড়ে ‘দেলুপি’র বিকল্প প্রদর্শনী করে ভালো সাড়া পাওয়ার কথা জানালেন তাওকীর। ‘দেশজুড়ে দারুণ সব দর্শক ছড়িয়ে আছেন। তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নিয়ে আমরা অর্থের বিনিময়েই শো করেছি। কোনো আসন খালি থাকে না। এমনও হয়েছে, নির্দিষ্টসংখ্যক প্রদর্শনী করার পর দর্শক আবার দেখতে চাচ্ছেন, কিন্তু সময় শেষ হয়ে গেছে,’ বলেন তিনি। শিল্পকলায় প্রদর্শনীর দিনে অনেক দর্শক আবার ‘দেলুপি’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির কথা বলেছেন। তাওকীর বলেন, সিনেমাটি নির্মাণের খরচ এখনো তুলতে পারেনি প্রযোজনা সংস্থা। শিল্পকলায় প্রদর্শনীর পর দর্শকের আগ্রহ দেখে তারাও সিনেমাটি নতুন করে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিতে চায়।
বিকল্প প্রদর্শনী নিয়ে প্রয়াত নির্মাতা তারেক মাসুদের উদাহরণ দিলেন আরেক নির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। ‘তিনি (তারেক মাসুদ) বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করতেন। আমিও কিন্তু আগের সিনেমায় (‘আম কাঁঠালের ছুটি’) ৫০টির বেশি প্রদর্শনী করেছি। এসব প্রদর্শনী থেকে বিনিয়োগের অনেকটাই উঠে এসেছে।’ এই নির্মাতা মনে করেন, নিজেদের উদ্যোগে প্রদর্শনী ছাড়াও বিভিন্ন বিকল্প প্রদর্শনীর ব্যবস্থা স্বাধীন চলচ্চিত্রের জন্য খুবই জরুরি। তিনি আশা করেন, ব্যাপকভাবে প্রদর্শনীর সুযোগ পেলে এ ধরনের সিনেমাও বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারবে।
শিল্পকলা কি সমাধান?
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির দেশজুড়ে অবকাঠামো আছে। মাসজুড়েই সেখানে সিনেমা প্রদর্শনীর প্রস্তাব নানা সময়ে উঠেছে। মোহাম্মদ নূরুজ্জামান বলেন, ‘আমি শিল্পকলাকে বারবার চিঠি দিয়েছি। তারা হয়তো এটাকে তাদের কাজ মনে করে না। যদি এটা করা যায় (শিল্পকলায় প্রদর্শনী), খুবই ভালো হয়। আমাদের হল তো সব জেলায় নাই, কিন্তু ৬৩টা জেলায় শিল্পকলার অডিটোরিয়াম আছে। যেখানে চাইলেই সিনেমা দেখানো যায়। শিল্পকলা নিজেও কিন্তু ৬৪ জেলায় একযোগে সিনেমা দেখানোর একটা উদ্যোগ নিয়েছিল। আমার সিনেমাও তখন দেখানো হয়েছিল। স্বাধীন ধারার নির্মাতাদেরও সিনেমা প্রদর্শনী করার মতো লোকবল থাকে না। খুবই ভালো হতো, তারা (শিল্পকলা একাডেমি) যদি সপ্তাহে কয়েকটা সিনেমা দেখানোর উদ্যোগ নিত।’ আরেক নির্মাতা খন্দকার সুমনও মনে করেন যে এ পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। শিল্পকলার অডিটোরিয়াম ভাড়া নেওয়া নির্মাতাদের পক্ষে সম্ভব নয়। উদ্যোগটা তাদের পক্ষ থেকেই আসতে হবে, বলেন তিনি।
একটা সময় ফিল্ম সোসাইটি খুব সক্রিয় ছিল। গত এক দেড় দশকে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন কিংবা চলচ্চিত্র সংসদের বড় ধরনের কর্মীবাহিনী গড়ে ওঠে নাই। ফলে বিকল্প প্রদর্শনীর জায়গাগুলো সীমিত হয়ে গেছে। বিকল্প প্রদর্শনী করতে গেলেও স্পনসর পাওয়া যায় না, বিনা মূল্যে দেখানো হয়। এটা বড় সংকট। দর্শকস্বল্পতায় হলেও বেশি দিন চলে না, প্রচারেরও অনেক খরচ। সে ক্ষেত্রে যেসব সিনেমা পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোয় যায়, সেগুলো শিল্পকলা দেখাতে পারে। সরকার এটা নিয়ে একটা নীতিমালাও করতে পারে। সরকার চাইলে এ ধরনের সিনেমাগুলোর প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে। কারণ, এসব সিনেমা হয়তো সেভাবে বাণিজ্যিকভাবে চলবে না, কিন্তু শিল্পের বিচারে গুরুত্বপূর্ণআবু শাহেদ ইমন
সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে আকাশ হকের প্রথম সিনেমা ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’। পরিচালনার সঙ্গে সিনেমাটি প্রযোজনা, চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনাও করেছেন আকাশ। তিনিও বলেন, স্বাধীন ধারার সিনেমা দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারি উদ্যোগ দরকার। প্রতিটি জেলা, উপজেলায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর জন্য যথাযথ প্রযুক্তিসহ শিল্পকলা একাডেমি উদ্যোগ নিতে পারে, বলেন তিনি।
‘পায়ের তলায় মাটি নাই’ সিনেমার প্রযোজক আবু শাহেদ ইমন অন্য একটা প্রস্তাবও দিলেন। একটা সময় ফিল্ম সোসাইটি খুব সক্রিয় ছিল। গত এক দেড় দশকে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন কিংবা চলচ্চিত্র সংসদের বড় ধরনের কর্মীবাহিনী গড়ে ওঠে নাই। ফলে বিকল্প প্রদর্শনীর জায়গাগুলো সীমিত হয়ে গেছে। বিকল্প প্রদর্শনী করতে গেলেও স্পনসর পাওয়া যায় না, বিনা মূল্যে দেখানো হয়। এটা বড় সংকট। দর্শকস্বল্পতায় হলেও বেশি দিন চলে না, প্রচারেরও অনেক খরচ। সে ক্ষেত্রে যেসব সিনেমা পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোয় যায়, সেগুলো শিল্পকলা দেখাতে পারে। সরকার এটা নিয়ে একটা নীতিমালাও করতে পারে। সরকার চাইলে এ ধরনের সিনেমাগুলোর প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে। কারণ, এসব সিনেমা হয়তো সেভাবে বাণিজ্যিকভাবে চলবে না, কিন্তু শিল্পের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ, বললেন তিনি।
‘আদিম’, ‘অতল’ নির্মাতা যুবরাজ শামীমও মনে করেন, সব শিল্পকর্মেরই কিছু না কিছু দর্শক থাকেন। কিন্তু দেখানোর ব্যবস্থা না থাকলে তাঁদের কাছেও পৌঁছানো সম্ভব হয় না।
শিল্পকলারও পরিকল্পনা আছে
নির্মাতাদের এসব দাবি নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। গত শনিবার তিনি জানান, আসন্ন শীত মৌসুমে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) এ ধরনের সিনেমা প্রদর্শনীর পরিকল্পনা করেছেন তাঁরা।
‘শৈল্পিক ধারার সিনেমাগুলো প্রেক্ষাগৃহে সেভাবে জায়গা পায় না। এ ধরনের ছবিগুলো প্রদর্শনের একটা ব্যবস্থা আমরা করতে চাই। সরকারি অনুদান পাওয়া সিনেমাগুলোও সেভাবে আলোর মুখ দেখে না। যেসব সিনেমা সামনে আসে না, আমরা বেছে বেছে সেগুলো শিল্পকলা একাডেমিতে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করব। কারণ, এসব ছবিতে আমাদের যাপিত জীবন ও সংগ্রাম উঠে এসেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান, আমাদের প্রতিটি আন্দোলন–সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছবিগুলো আমরা প্রাধান্য দেব,’ বললেন তিনি।
সিনেমা প্রদর্শনীর মাধ্যমে তরুণদের সংস্কৃতিমনা করার সরকারি উদ্যোগের কথাও বলেন তিনি, যেসব ছবি গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে তুলে আনে, সেগুলো তরুণদের দেখাতে হবে।’