বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের বরেণ্য অভিনয়শিল্পী শাবানা এবার ৭৪ বছর পেরিয়ে ৭৫–এ পা দিলেন। প্রায় তিন দশক অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও ভক্তদের ভালোবাসা যে একটুও কমেনি, এবারের জন্মদিনে সেটি আবার নতুন করে উপলব্ধি করলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে পরিবারের সঙ্গে জন্মদিন উদ্যাপনে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শুভেচ্ছা, স্মৃতিচারণা ও পুরোনো ছবি দেখে আবেগে কেঁদেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের এই বরেণ্য নায়িকা।
১৫ জুন জন্মদিনে শাবানার ঘরোয়া আয়োজনে কেটেছে। ছেলে–মেয়ে, ছেলের স্ত্রী ও নাতি–নাতনিরা তাঁর বাসায় এসে কেক কেটেছেন, শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। সবচেয়ে বড় উপহার ছিল ভক্তদের ভালোবাসা। কারণ, শাবানা নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার না করলেও পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ফেসবুকে প্রকাশিত নানা পোস্ট, ভিডিও ও শুভেচ্ছার বার্তা দেখিয়েছেন।
শাবানার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি সময় ১৫ জুন রাত ১০টায় যখন কথা হয় প্রথম আলোর, তখন নিউ জার্সির বাসায় স্বামীর সঙ্গে গল্প করছিলেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ এখনো এভাবে মনে রেখেছে, এতটা ভালোবাসে—এটাই সবচেয়ে বেশি আবেগাপ্লুত করে। পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরে আসে, মনে পড়ে যায় অভিনয়জীবনের অসংখ্য সুখের মুহূর্ত। মানুষের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার মতো ভাষা নেই। সবার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় তো আজকের শাবানা।’
জন্মদিনে বিশেষ কোনো উপহার পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে হাসতে হাসতেই স্বামী ওয়াহিদ সাদিকের কথা বলেন তিনি। শাবানার মতে, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হলো ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধা, যা তিনি সব সময় স্বামীর কাছ থেকে পেয়েছেন। সময় ও সুযোগ পেলে স্বামীর বানানো একটা খাবার বেশ মজা করে খান। জানালেন, উনি ডিম পোচ খুব ভালো করতে পারেন। আমার কাছেও তাঁর হাতের এটা মজাই লাগে।
বর্তমানে শাবানার সময় কাটছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে পরিবারকে ঘিরে। একসময় নিউইয়র্কে থাকলেও এখন স্বামী, সন্তান ও নাতি–নাতনিদের সঙ্গে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পর দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর কেটে গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। তবে দেশের প্রতি টান আজও অটুট। সুযোগ পেলেই বাংলাদেশে আসতেন, যদিও গত ছয় বছর নানা কারণে দেশে আসা হয়নি।
৭৫ বছর বয়সে নিজের জন্মদিন নিয়ে খুব বেশি ভাবেন না শাবানা; বরং এখন তাঁর আনন্দ নাতি–নাতনিদের জন্মদিন ঘিরেই। তিনি বলেন, নিজের জন্মদিনের কথা অনেক সময় মনেও থাকে না। পরিবারের সদস্যরাই দিনটিকে বিশেষ করে তোলেন।
১৯৫২ সালের ১৫ জুন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া শাবানা মাত্র আট বছর বয়সে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। তাঁর পারিবারিক নাম আফরোজা সুলতানা রত্না। প্রখ্যাত পরিচালক এহতেশাম সম্পর্কে শাবানার বাবার খালাতো ভাই। এহতেশামই তখন শাবানার বাবাকে বলেছিলেন, ‘তোর মেয়েটাকে আমি একটি ছবিতে নিতে চাই।’ শাবানার বাবা তখন নাকি এভাবেই বলেছিলেন, ‘আমার মেয়ে কীভাবে অভিনয় করবে! সে এত লাজুক, কারও সামনেই আসতে চায় না।’
নাছোড়বান্দা এহতেশাম বলেছিলেন, ‘তোর মেয়েটার মতো একটা মেয়েই আমি খুঁজছি। এরপর শাবানার বাবা রাজি হন।’ ওই ছবির নায়ক–নায়িকা ছিলেন রহমান–রওশান আরা। এহতেশামের ‘নতুন সুর’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করে পরে ‘চকোরী’ ছবির মাধ্যমে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। প্রায় চার দশকের অভিনয়জীবনে ২৯৯টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। শাবানা অভিনীত সর্বশেষ চলচ্চিত্র আজিজুর রহমান পরিচালিত ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’ মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে।
অভিনয়জীবনে আলমগীর, রাজ্জাক, ফারুক, জসীম ও সোহেল রানার সঙ্গে অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা উপহার দিয়েছেন শাবানা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০৬টি ছবিতে জুটি হয়েছেন আলমগীরের বিপরীতে। অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ শাবানা অর্জন করেছেন ১০টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং একবার আজীবন সম্মাননা। তবে আজকের শাবানার পরিচয় শুধু কিংবদন্তি অভিনেত্রী নয়, একজন পরিপূর্ণ মা, নানিও। বড় মেয়ে সুমী ইকবাল, ছোট মেয়ে ঊর্মি সাদিক ও ছেলে নাহিন সাদিক—সবার সাফল্য নিয়ে গর্বিত তিনি। পরিবারের সঙ্গেই এখন সবচেয়ে বেশি সময় কাটে তাঁর।