ফয়জুল ইয়ামিন। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে
ফয়জুল ইয়ামিন। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে

স্বপ্নের টানে ফিরে আসেন ইয়ামিন

ঈদে মুক্তি পাওয়া ওয়েব ফিল্ম ‘তাজমহল’–এ প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে আলোচনায় তরুণ অভিনেতা ফয়জুল ইয়ামিন। এর আগে ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন তিনি। তবে এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, অপেক্ষা ও সংগ্রামের গল্প। ইয়ামিনের পথচলার গল্প শুনেছেন নাজমুল হক

বিনোদন–দুনিয়ায় ইয়ামিনের যাত্রার শুরুটা যেন কোনো সিনেমার গল্প। ২০১১ সালে তিনি তখন এ–লেভেলের ছাত্র। একদিন কোচিংয়ে যাওয়ার পথে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার প্রতিনিধিদের নজরে পড়েন তিনি। তাঁরা ইয়ামিনের সঙ্গে কথা বলে মোবাইল অপারেটর কোম্পানির একটি ফটোশুটের প্রস্তাব দেন। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত সাক্ষাৎই পরবর্তী সময়ে তাঁর সামনে নতুন দরজা খুলে দেয়।

সেই দিনের স্মৃতিচারণা করে ইয়ামিন বলেন, ‘দুজন লোক এসে আমাকে বলেন, “সামনে আমাদের একটা ফটোশুট আছে। তোমার কিছু ছবি তুলে নিয়ে যাই। নম্বরটা দাও। যদি সিলেক্টেড হও, তাহলে তোমাকে ফোন দেব। আর ফটোশুটটা কালকেই।”’
পরদিনই ফোনে নির্বাচিত হওয়ার খবর জানতে পারেন। পরদিন ফটোশুট, সংবাদপত্রে বড় করে ছবি প্রকাশ হয় ইয়ামিনের—পরিবার, স্কুল ও বন্ধুমহলে বেশ সাড়া পড়ে যায়। তবে তখনো তিনি বুঝতে পারেননি যে এই পথই একদিন তাঁর পেশাগত পরিচয় হয়ে উঠবে।

বিলবোর্ডে উঠে আসার গল্প
২০১৩ সালে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নির্মাতা পিপলু আর খানের টিম থেকে ডাক পান ইয়ামিন। আরেকটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানির বিজ্ঞাপনের অডিশনে অংশ নেন। বিজ্ঞাপনটি প্রচারের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাঁর ছবিসংবলিত বিলবোর্ড দেখা যায়, যা তাঁকে নতুন পরিচিতি এনে দেয়।
ইয়ামিন বলেন, ‘ফটোশুটে সুযোগ পাওয়া আর নিজেকে বড় বড় বিলবোর্ডে দেখাটা সেই বয়সে খুবই গর্বের একটা মুহূর্ত ছিল। ভার্সিটিতে অনেকেই আমাকে দেখিয়ে বলতেন, “ও তো বিলবোর্ডে আছে।”’

ফয়জুল ইয়ামিন। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে

সংগ্রামের সময়
তবে পথটা সব সময় মসৃণ ছিল না। ২০১৪-১৫ সালের দিকে বেশ কিছু বিজ্ঞাপনের অডিশনে বাদ পড়তে হয় তাঁকে। কিন্তু ব্যর্থতা তাঁকে থামাতে পারেনি। ২০১৬ সালে আদনান আল রাজীবের পরিচালনায় আরেকটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানির বিজ্ঞাপনচিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। তবে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি আসে পরের বছর, একটি কোমল পানীয় ব্র্যান্ডের বড় ক্যাম্পেইনে যুক্ত হন। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর পোস্টার ও বিলবোর্ড। এরপর একের পর এক ব্র্যান্ড থেকে কাজের প্রস্তাব আসতে শুরু করে। কিন্তু ঠিক তখনই শুরু হয় আরেক সংগ্রাম—পরিবারের বাধা।

ইয়ামিন বলেন, ‘বাসা থেকে বলা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বাদ দিয়ে কোনো কাজ করা যাবে না। মিডিয়া নিয়ে মূল আপত্তি ছিল না, পড়াশোনার বাইরে গিয়ে মিডিয়ায় বেশি সময় দেওয়া নিয়ে আপত্তি ছিল। তবে সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও লুকিয়ে লুকিয়ে কাজ চালিয়ে গেছি।’

ফয়জুল ইয়ামিন। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে

প্রবাসজীবন, কিন্তু অভিনয় থেকে দূরে নন
২০১৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান ইয়ামিন। তবে মিডিয়ার প্রতি তাঁর টান এতটাই প্রবল ছিল যে প্রতিবছর ছুটিতে দেশে ফিরলে অন্তত দুই-তিন মাস কাজের জন্য সময় বরাদ্দ রাখতেন।

ইয়ামিন বলেন, ‘তত দিনে আমার ভেতরে একটা তাড়না কাজ করত—আমি মিডিয়াতেই থাকতে চাই। কিন্তু বাসায় সেটা বলার সাহস ছিল না। বিদেশে যাওয়ার পর প্রতিবছর যে ছুটিতে দেশে আসতাম, সেটা মূলত শুটিংয়ের জন্যই। পরিবারের সবাই হয়তো বুঝত না, কিন্তু আমি কাজের পরিকল্পনা করেই দেশে ফিরতাম।’
২০২১ সালে ভিকি জাহেদের ‘রেডরাম’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের মূল যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০২৩ সালে অমিতাভ রেজা চৌধুরীর পরিচালনায় ‘কাছে আসার গল্প’ প্রকল্পের টেকঅফ-এ পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন।

ফয়জুল ইয়ামিন। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে

অনিশ্চিত পথে
এরই মধ্যে পরিবারের সদস্যরা দেশের বাইরে স্থায়ী হলেও ২০২৫ সালের অক্টোবরে দেশে ফিরে আসেন ইয়ামিন। বিদেশের জীবন ছেড়ে যাত্রা করেন এক অনিশ্চিত পথে। বলা যায়, এর পর থেকেই তাঁর অভিনয়জীবনে নতুন গতি আসে। এবার আর পার্শ্বচরিত্রে নয়, ডাক পেতে থাকেন বড় চরিত্রে।

মঈনুদ্দিন সিয়ামের পরিচালনায় ‘কাছে আসার গল্প’ প্রকল্পের ‘পেজ টার্নার’-এ কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। পাশাপাশি বঙ্গ অরিজিনালের ‘নীলাঞ্জনা এক্সপ্রেস’ এবং ভিকি জাহেদের একটি অপ্রকাশিত প্রকল্পেও কাজ করেন।
তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে রায়হান রাফী পরিচালিত ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমার মাধ্যমে। ছবিতে শাকিল চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সংশ্লিষ্টদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ইয়ামিন বলেন, ‘“প্রেশার কুকার” আমার ক্যারিয়ারের একটি বড় ব্রেকথ্রু। রাফী ভাইয়ের মতো একজন নির্মাতার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ যেকোনো অভিনেতার আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দেয়।’

গল্পের টানে বদলে গেল পরিকল্পনা
‘প্রেশার কুকার”-এর পরই তাঁর কাছে আসে ‘তাজমহল’ ওয়েব ফিল্মের প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব। ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রে মা–বাবার কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু গল্প শুনেই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন।

ইয়ামিন বলেন, ‘যখন “তাজমহল”–এ অভিনয়ের প্রস্তাব পেলাম, তার তিন দিন পরই আমার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল। গল্প শোনার পর আমি এর প্রেমে পড়ে যাই। পরিচালক ওয়াহিদ আনাম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার পর মনে হয়েছিল, এই মানুষটার সঙ্গে আমি কাজ করতে চাই। আমার মনে হচ্ছিল, প্রধান চরিত্রে যাত্রা শুরু করার জন্য এটাই আমার সঠিক প্রজেক্ট।’ সিনেমাটির শুটিংয়ের জন্য তিন সপ্তাহের যুক্তরাষ্ট্র সফর সংক্ষিপ্ত করে মাত্র ১১ দিনের মধ্যেই দেশে ফিরে আসেন তিনি।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন
ইয়ামিন নিজেকে একজন শিল্পী হিসেবে ক্রমাগত সমৃদ্ধ করতে চান। তাঁর লক্ষ্য, প্রতিটি কাজেই নতুন ও ভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজেকে আবিষ্কার করা। দর্শকদের প্রত্যাশার বাইরে গিয়ে চমকে দিতে পারাকেই তিনি একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় সাফল্য মনে করেন। ইয়ামিন বলেন, ‘এমন সব চরিত্রে অভিনয় করতে চাই, যা আমাকে প্রতিবার নতুনভাবে চ্যালেঞ্জ করবে এবং দর্শকদের কাছে নতুনভাবে তুলে ধরবে।’