বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে যাঁর নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়—তিনি নায়করাজ রাজ্জাক। চার দশকের অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন তিনি। রুপালি পর্দায় তাঁর দাপট যতটা আলোচিত, ব্যক্তিজীবনের গল্পগুলো আড়াল। আজ তাঁর জন্মদিন। বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হতো ৮৪ বছর। এফডিসি হয়তো থাকত উৎসবমুখর, সহকর্মীদের ভিড় আর স্মৃতিচারণায় ভরা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন—নায়করাজ নেই। তাঁর শূন্যতার মাঝেই ফিরে তাকানো যায় সেই মানুষটির দিকে, যিনি সারা জীবন রাজ্জাকের পাশে থেকেছেন—স্ত্রী খায়রুন্নেসা লক্ষ্মী। নায়ক রাজ্জাকের জীবনে ‘লক্ষ্মী’ হয়ে আসার গল্পটা ঠিক কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো নয়; বরং খুবই সাধারণ, সহজ আর বাস্তব।
প্রথম দেখার সেই মুহূর্ত
কলকাতার নাকতলা এলাকায় রাজ্জাকের শৈশব–কৈশোর কেটেছে। তিন ভাই–বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন তিনি। ১৯৬২ সালের কোনো একদিন বাঁশদ্রোণী এলাকার এক পথেই জীবনের মোড় ঘুরে যায়। বাড়ির সামনে বাবার কেনা একটি খাসিকে গাছের পাতা খাওয়াচ্ছিলেন কিশোরী খায়রুন্নেসা। সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন রাজ্জাক আর তাঁর এক বন্ধু। হঠাৎই রাজ্জাক বলে বসেন,
—‘এই মেয়ে, তোমরা খাসিটা বিক্রি করবে নাকি?’ সেই এক প্রশ্নেই শুরু। খায়রুন্নেসা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, খাসি বিক্রি হবে না—বাবা কিনে এনেছেন। দু–এক কথা বলেই চলে যান রাজ্জাক। তখন তাঁরা একেবারেই অচেনা। কিন্তু সেই অচেনা মেয়েটিই যে তাঁর জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ হয়ে উঠবেন, তা হয়তো তখন রাজ্জাক নিজেও জানতেন না।
পরিবারে বলা, বিয়ের সিদ্ধান্ত
ঘরে ফিরে রাজ্জাক তাঁর ভাবিকে বলেন, ‘আমি এমন একটা মেয়ে দেখে আসছি, তোমরাও দেখতে পারো।’ সেই সময় রাজ্জাকের বয়স ১৯, খায়রুন্নেসার ১৬। প্রথম দেখার এক সপ্তাহের মধ্যেই রাজ্জাকের ভাই, ভাবি, চাচিসহ পরিবারের সদস্যরা খায়রুন্নেসাকে দেখতে যান। তখনকার সামাজিক বাস্তবতায় খুব বেশি আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই বিয়ের সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। এনগেজমেন্ট হয়, এরপর রাজ্জাক চলে যান বোম্বেতে (বর্তমানে মুম্বাই)—চলচ্চিত্রের কাজ শিখতে।
ফোনের যুগ নয়, নিয়মিত যোগাযোগও ছিল না। এক বছর কেটে যায়। অবশেষে পরিবারের উদ্যোগেই রাজ্জাক ফিরে আসেন কলকাতায়। এনগেজমেন্টের এক বছর পর বিয়ে হয় তাঁদের। বিয়ের পর আর বোম্বেতে যাননি তিনি। নাটক আর অভিনয়েই ডুবে থাকতেন, পাশাপাশি পরিবারের মেটালের ফ্যাক্টরিও দেখাশোনা করতেন।
ঢাকায় আসা—লক্ষ্মীর সাহসী সিদ্ধান্ত
রাজ্জাকের অভিনয়জীবনের প্রকৃত বিকাশ ঘটে ঢাকায়। তবে সেই যাত্রা সহজ ছিল না। কলকাতার জায়গাজমি বিক্রি করে ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এই সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন খায়রুন্নেসা লক্ষ্মী নিজেই। ১৯৬৪ সালে, আট মাস বয়সী প্রথম সন্তানকে নিয়ে তাঁরা ঢাকায় আসেন। শুরুতে খালার বাসায়, পরে কমলাপুরে ভাড়া বাসা। তখন রাজ্জাক বারবার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কথা বললেও লক্ষ্মী স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমি এখানে থাকতে চাই। আমার এখানে ভালো লাগছে।’ শেষ পর্যন্ত রাজ্জাক কলকাতার সব জমিজমা বিক্রি করে ঢাকাতেই থেকে যান। শুরু হয় এক নতুন সংগ্রাম, এক নতুন অধ্যায়।
নায়ক হওয়ার পথে সংসারের গল্প
ঢাকায় আবদুল জব্বার খান, পরে জহির রায়হানের হাত ধরে চলচ্চিত্রে পা রাখেন রাজ্জাক। ধীরে ধীরে ব্যস্ততা বাড়ে। রাত গভীর করে ফেরা, শুটিংয়ের চাপ—সবই ছিল। তবু দাম্পত্যে বড় কোনো ঝগড়া হয়নি। ছিল অভিমান, হাসি আর খুনসুটি। খায়রুন্নেসা স্মৃতিচারণায় বলেন, রাজ্জাক ইচ্ছা করেই শুটিংয়ের গল্প করে তাঁকে রাগাতেন। আবার নিজের অভিনীত দৃশ্যের ছবি এনে দেখাতেন। নায়িকাদের যাতায়াত ছিল ঘরে—কবরী এসে খেতেন পান্তাভাত, পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ। সংসার আর সিনেমা—দুটোই চলেছে পাশাপাশি। খায়রুন্নেসাই ছিলেন রাজ্জাকের প্রথম দর্শক। জোনাকী সিনেমা হলে বসে তাঁর প্রথম ছবি দেখেছিলেন তিনি। নায়ক হিসেবে রাজ্জাককে দেখার স্বপ্নও তিনিই দেখেছিলেন।
নায়করাজ রাজ্জাকের জীবনে অসংখ্য চরিত্র, খ্যাতি আর সম্মান এসেছে। কিন্তু এই দীর্ঘ পথচলায় নীরবে পাশে থাকা একজন মানুষ ছিলেন—খায়রুন্নেসা লক্ষ্মী। আলোচনার বাইরে থেকেও যিনি ছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে শক্ত ভিত। রাজ্জাক আজ নেই, কিন্তু তাঁর জীবনের গল্পে ‘লক্ষ্মী’র উপস্থিতি আজও ঠিক ততটাই জীবন্ত—যেমন ছিল নাকতলার সেই সরু পথে খাসিকে পাতা খাওয়ানোর মুহূর্তে। নায়করাজের জন্মদিনে তাই শুধু একজন কিংবদন্তি অভিনেতাকেই নয়, তাঁর জীবনের সেই ভালোবাসার গল্পকেও মনে করা যায় গভীর শ্রদ্ধায়।