রূপন্তী আকিদ। ছবি: অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে
রূপন্তী আকিদ। ছবি: অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

সিডনির রূপন্তী যখন জীবনানন্দের শোভনা

সিডনির প্রশান্ত মহাসাগরপারে বেড়ে ওঠা এক তরুণী ঢাকাই সিনেমার পর্দায় হয়ে উঠেছেন কবি জীবনানন্দ দাশের প্রথম প্রেম, শোভনা। সরকারি অনুদানে নির্মিত মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের চলচ্চিত্র ‘বনলতা সেন’-এ এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন রূপন্তী আকিদ। চরিত্রটির প্রস্তুতি, অভিনয়জীবন এবং বাংলাদেশ ঘিরে তাঁর টানের গল্প শোনালেন গেল বুধবার।

রূপন্তীর সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, সিডনিতে বড় হলেও বাংলাদেশের প্রতি টান তাঁর কখনো কমেনি। এর পেছনে তাঁর মা-বাবার অবদানই সবচেয়ে বড়, মনে করেন রূপন্তী, ‘সিডনিতে অনেক বাংলাদেশি পরিবার আছে। কিন্তু সবাই মা-বাবার কাছ থেকে নিজের পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা পান না। আমি ভাগ্যবান, মা-বাবা সব সময় আমাকে সমর্থন দিয়েছেন। বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ভাষা ও শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে তাঁরা কখনো বাধা দেননি, বরং উৎসাহ দিয়েছেন।’ তাঁর বিশ্বাস, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে যদি এমন পরিবেশ দেওয়া যায়, তাহলে তারা নিজেরাই বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখতে চাইবে।

শোভনা হয়ে ওঠা
শোভনা চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য। সিডনিতে বসেই অনলাইনে সংলাপ অনুশীলন ও মহড়া করেছেন রূপন্তী। হাসতে হাসতে বললেন, ‘শুটিং শুরুর আগেই মহড়ার মাধ্যমে যেন পুরো সিনেমাটা একবার করে ফেলেছিলাম।’ ঢাকায় আসার পর খায়রুল বাসার, সোহেল মণ্ডল ও মাসুমা রহমান নাবিলার সঙ্গে দৃশ্য ধরে ধরে আরও মহড়া করেন। সেই প্রক্রিয়া চরিত্রের গভীরে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে বলে মনে করেন তিনি।

শোভনা চরিত্রে রূপন্তী। ফেসবুক থেকে

আর শুধু মহড়ার ওপরই নির্ভর করেননি। নিজে থেকেও করেছেন বিস্তর গবেষণা। সেকালের নারীদের কথা বলার ধরন বোঝার জন্য দেখেছেন পুরোনো বাংলা চলচ্চিত্র। পড়েছেন জীবনানন্দ দাশের কবিতার অনুবাদ। তিনি বলেন, ‘অনলাইনে শোভনা সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য বা ছবি পাওয়া যায়নি। তাই বিভিন্ন লেখা পড়ে যতটুকু জেনেছি, তা দিয়েই চরিত্রটা নির্মাণ করার চেষ্টা করেছি।’ রূপন্তীর মতে, জীবনানন্দ দাশের জীবনে শোভনার প্রভাব ছিল গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। সেটাই পর্দায় তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। ‘আমি চেয়েছি, শোভনাকে খুব নিষ্পাপভাবে উপস্থাপন করতে, যাতে দর্শক বুঝতে পারেন, কেন সারা জীবন তাঁকে এতটা মনে রেখেছিলেন কবি,’ বলেন তিনি।
চলচ্চিত্রে খায়রুল বাসারের সঙ্গে রূপন্তীর কয়েকটি ঘনিষ্ঠ দৃশ্য রয়েছে। দৃশ্যগুলো নিয়ে তাঁর অবস্থান, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল দৃশ্যগুলো যেন কোনোভাবেই অপ্রয়োজনীয় বা অশ্লীল না লাগে। আমরা চেয়েছি, সেগুলো মিষ্টি, যুক্তিসংগত ও নান্দনিক হোক। দর্শক যেন চরিত্র দুটির প্রতি মায়া বোধ করেন,’ বলেন রূপন্তী।

‘আংটি’ দিয়ে শুরু
২০১৩ সালে সাগর জাহানের নাটক ‘আংটি ’দিয়ে রূপন্তীর অভিনয়জীবনের শুরু। পরে হ্যালো বাংলাদেশ, কেবলই রাত হয়ে যায়সহ বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করে দর্শকের নজরে আসেন। গত বছর শিহাব শাহীন পরিচালিত ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’ করেও প্রশংসা পেয়েছেন। এ ছাড়া ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র ‘হিন্দি ভিন্দি’তে কাজ করেছেন। রূপন্তী বলেন, ‘ভাষা আর সংস্কৃতিতে পার্থক্য থাকলেও অভিনয়ের ভাষা আসলে এক। আন্তর্জাতিক প্রযোজনায় কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। তবে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির গল্পে কাজ করার অনুভূতি আলাদা।’

রূপন্তী আকিদ। ছবি: অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘বনলতা সেন’ মুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোভনা চরিত্রে রূপন্তীর অভিনয় নিয়ে অনেক ইতিবাচক মন্তব্য এসেছে। কেউ লিখেছেন, চলচ্চিত্রের প্রথম অংশে তাঁর উপস্থিতি এতটাই প্রভাব ফেলেছে যে পরবর্তী সময়েও দর্শক তাঁকেই খুঁজে ফিরেছেন। কেউ আবার প্রশ্ন তুলেছেন, জীবনানন্দ কি সত্যিই সেই কলেজপড়ুয়া শোভনাকেই সারা জীবন খুঁজে গেছেন? এসব প্রতিক্রিয়া পড়ে রূপন্তীর মনে হয়েছে, শোভনা চরিত্রটিকে কিছুটা হলেও দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছেন। তবে নিজের কাজ নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন তিনি, ‘সব সময়ই মনে হয়, আরও ভালো করা যেত।’

অপেক্ষায় রূপন্তী
রূপন্তী শুনেছেন, ২৬ জুন অস্ট্রেলিয়ায় আসছে ‘বনলতা সেন’। তার অপেক্ষাতেই আছেন। সিডনিতে প্রতিটি শোতে উপস্থিত থাকার ইচ্ছা রয়েছে। মেলবোর্ন বা অ্যাডিলেডে প্রদর্শনী হলে সেখানেও যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া সরাসরি দেখতে পারেন।

শোভনা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। হয়তো এই আত্মবিশ্বাস ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন—দুই জায়গাতেই নিয়মিত কাজ করার সুযোগ তৈরি করবে। ‘সিডনিতে বিভিন্ন কাজের জন্য অডিশনের ডাক পাই, নিয়মিতই যাই। তবে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির কথা যদি বলি, এখনো নতুন কোনো কাজের প্রস্তাব পাইনি। কিন্তু অভিনয় নিয়ে আমি খুবই আগ্রহী। আবার কবে বাংলাদেশে আসব, কবে নতুন কোনো কাজের সুযোগ হবে—সেই অপেক্ষাতেই আছি।’

রূপন্তী আকিদ। ছবি: অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে