২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সিনেমা নির্বাচিত হয়েছে ‘সাঁতাও’
২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সিনেমা নির্বাচিত হয়েছে ‘সাঁতাও’

১০০ টাকার বিনিয়োগ থেকে যাত্রা—হল না পাওয়া সিনেমার বাজিমাত

কথিত তারকার অভাবে যে সিনেমা শুরুতে হলে জায়গা পাচ্ছিল না, গণ–অর্থায়নে নির্মিত সেই ছবিই শেষ পর্যন্ত উঠে এল জাতীয় স্বীকৃতির শীর্ষে। নানা বাধা, অবহেলা আর দীর্ঘ লড়াই পেরিয়ে ২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সিনেমা নির্বাচিত হয়েছে ‘সাঁতাও’। একই সঙ্গে ছবিটির নির্মাতা খন্দকার সুমন পেয়েছেন সেরা পরিচালকের পুরস্কার। ‘সাঁতাও’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাচ্ছেন আইনুন পুতুল, এবারই প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাচ্ছেন তিনি। স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

মানুষের গল্প বলার দায়
রংপুর অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও সংকটের গল্প নিয়ে ২০১৬ সালে সাঁতাও নির্মাণের ভাবনা শুরু করেন লালমনিরহাটের নির্মাতা খন্দকার সুমন। তিনি জানতেন, কথিত তারকা ছাড়া এমন বাস্তবধর্মী স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ সহজ নয়। তবু মানুষের কথা বলার দায় থেকেই এই কঠিন পথ বেছে নেন তিনি। চাইলে ভিন্ন ধারার, অপেক্ষাকৃত সহজ কোনো সিনেমা নির্মাণ করা যেত। কিন্তু জীবনঘনিষ্ঠ গল্প বলার তাগিদই তাঁকে এই পথে টেনেছে।

কোনো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে না আসায় সাধারণ মানুষের কাছেই গল্পটি তুলে ধরেন সুমন। প্রযোজকের কাছে যেভাবে সিনেমার গল্প বলতে হয়, ঠিক সেভাবেই তিনি মানুষকে বোঝান—এই সিনেমা কেন জরুরি। ১০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা—যে যেভাবে পেরেছে, সেই অর্থে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সাঁতাও। গণ–অর্থায়নের এই যাত্রা কেবল অর্থ সংগ্রহের গল্প নয়; এটি হয়ে ওঠে মানুষের বিশ্বাস, সহমর্মিতা আর অংশীদারত্বের দলিল।

রাতভর ঢাকার কারওয়ান বাজার, নীলক্ষেত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পোস্টার সাঁটিয়েছেন নির্মাতা সুমন

নির্মাণ শেষে শুরু আরেক যুদ্ধ
সিনেমার শুটিং শেষ হলেও সুমনের লড়াই থামেনি। সেন্সর ছাড়পত্র পেতে গিয়ে তাঁকে পড়তে হয় প্রশাসনিক জটিলতায়। এফডিসির অনাপত্তি সনদসহ নানা কাগজপত্র জোগাড় করতে গিয়ে জানতে হয় মোটা অঙ্কের খরচের কথা। কেন এই খরচ—তার যুক্তিসংগত ব্যাখ্যাও মিলছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি লেখেন। পরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে শুধু সরকারি ফি দিয়েই ছাড়পত্র পান নির্মাতা।

কিন্তু মুক্তির সময় এসে ধরা দেয় মুদ্রার আরেক পিঠ। কথিত তারকা না থাকায় একের পর এক সিনেমা হল ‘সাঁতাও’ চালাতে রাজি হয়নি। হতাশা, ক্ষোভ আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ প্যানোরমা বিভাগে সেরা সিনেমার পুরস্কার জিতে নেয় ছবিটি। সেই পুরস্কার মঞ্চেই দাঁড়িয়ে হল না পাওয়ার আক্ষেপ জানান নির্মাতা, যা স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে।

খুলতে শুরু করে দরজা
উৎসবের স্বীকৃতির পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। প্রথমে চট্টগ্রামের সুগন্ধা সিনেমা হল এগিয়ে আসে। এরপর একে একে ঢাকার বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্স, যমুনা ফিউচার পার্কের ব্লকবাস্টার সিনেমাস, রংপুরের শাপলা সিনেমা হল ছবিটি প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়। সীমিত পরিসরে হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দর্শকের সামনে আসে ‘সাঁতাও’।

‘সাঁতাও’ সিনেমার পোস্টার

প্রচারের ক্ষেত্রেও দেখা যায় ভিন্ন এক দৃশ্য। নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীরা নিজেরাই নেমে পড়েন রাস্তায়। কারওয়ান বাজার, নীলক্ষেত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাতভর পোস্টার সাঁটানো হয়। রংপুর অঞ্চলে চলে মাইকিং। বড় বাজেটের প্রচার নয়—নিজের হাতে, নিজের পায়ে হেঁটে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর এক আন্তরিক চেষ্টা।
গল্পের মাটি থেকেই নাম ‘সাঁতাও’। সাঁতাও নামটিও এসেছে গল্পের মাটি থেকেই। রংপুর অঞ্চলে টানা কয়েক দিনের বর্ষণকে বলা হয় ‘সাঁতাও’।

সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে কৃষকের সংগ্রামী জীবন, নারীর মাতৃত্বের সর্বজনীন অনুভব এবং প্রান্তিক মানুষের সুখ–দুঃখ, হাসি–কান্নাকে ঘিরে। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন আইনুন পুতুল ও ফজলুল হক। তাঁদের অভিনয়ে গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা পেয়েছে গভীর ও মানবিক এক রূপ।

‘সাঁতাও’ সিনেমার একটি দৃশ্য

শুধু একটি সিনেমা নয়
দেশ–বিদেশের নানা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়ে ইতিমধ্যে একাধিক অর্জন ঝুলিতে এনেছে ‘সাঁতাও’। সর্বশেষ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে ছবিটি যেন নিজের দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাল। বৃহস্পতিবার পুরস্কার ঘোষণার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা। সমালোচক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য অনুযায়ী, এই স্বীকৃতি শুধু একটি সিনেমার সাফল্য নয়; এটি স্বাধীন ধারার নির্মাতাদের জন্য এক সাহসী বার্তা—যে গল্প মানুষের কথা বলে, যে গল্প জীবনের কথা বলে, সেই গল্প থেমে থাকে না। অবহেলা, বাধা আর লড়াই পেরিয়েও সে গল্প শেষ পর্যন্ত নিজের জায়গা করে নেয়। ‘সাঁতাও’ সেই বিশ্বাসকেই নতুন করে প্রতিষ্ঠা করল।