
মঞ্চের পেছনে আঁকা খাঁচাবন্দী পাখি আর ভাঙা ডানা। সেই মঞ্চেই উঠে এল অভিবাসী নারীদের দুঃখ, নির্যাতন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। কখনো কান্না, কখনো দীর্ঘশ্বাসে প্রকাশ পেল তাঁদের না–বলা কথা। সিডনির ব্যাংকসটাউন আর্টস সেন্টারে মঞ্চস্থ নাটক ‘লেট মি ফ্লাই’ তুলে ধরল নানা সংস্কৃতির নারীদের জীবনসংগ্রাম ও পারিবারিক সহিংসতার অভিজ্ঞতা।
ইংরেজি সংলাপে মঞ্চস্থ নাটকটি স্থানীয় দর্শকদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। এর গল্প ও পরিবেশনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রযোজনাটির রচয়িতা ও নির্দেশক জন মার্টিন। সূত্রধরের ভূমিকায় ছিলেন মৌসুমী মার্টিন। মঞ্চায়নের পর নাটকের ভাবনা, প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন সিডনিপ্রবাসী এই নাট্য দম্পতি।
ঢাকার মঞ্চ থেকে সিডনিতে
একসময় ঢাকার নাট্যাঙ্গনের পরিচিত মুখ ছিলেন মৌসুমী মার্টিন। দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করলেও সংস্কৃতিচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রবাসের জীবন ও ব্যস্ততার মধ্যেও মঞ্চের সঙ্গে তাঁর যোগ অটুট। ‘লেট মি ফ্লাই’–এ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সূত্রধর হিসেবে যুক্ত ছিলেন তিনি। মৌসুমী মার্টিন বলেন, ‘অভিবাসী নারীদের না–বলা অনেক যন্ত্রণা থাকে। এই নাটকে আমরা তাঁদের মনের জমানো পাথর গলিয়ে ভাষা দিতে চেয়েছি। যে নারীরা মুখ খুলতে ভয় পান, তাঁদের কথা সাহসের সঙ্গে মঞ্চে যখন সত্য হয়ে ফোটে, সে দৃশ্য যেকোনো শিল্পীর জন্যই পরম প্রাপ্তি।’
নাটকে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির অভিবাসী নারীরা। তাঁদের অভিজ্ঞতার ভিন্নতা থাকলেও প্রযোজনার কেন্দ্রে এসেছে নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলা ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা।
পাঁচ মাসের প্রস্তুতি
জন মার্টিনেরও নাট্যচর্চার শুরু বাংলাদেশের মঞ্চে। ঢাকার পদাতিক নাট্যদলে কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। সিডনিতে এসে সেই চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। বাংলাদেশের মঞ্চে কাজের অভিজ্ঞতা ও প্রবাসের সমাজকে কাছ থেকে দেখার উপলব্ধি মিলিয়ে সাজিয়েছেন ‘লেট মি ফ্লাই’।
জন মার্টিন জানান, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও গবেষণার ভিত্তিতে টানা পাঁচ মাস ধরে নাটকটির কাঠামো তৈরি হয়েছে। বিষয়টি মঞ্চে আনার ক্ষেত্রে অভিবাসী নারীদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে নাটক করা মানে প্রার্থনায় বসা। টানা পাঁচ মাস বাস্তব অভিজ্ঞতা ও গবেষণা থেকে এ নাটকের কাঠামো তৈরি হয়েছে। মূলধারার সমাজ থেকে অভিবাসী সমাজে পারিবারিক নির্যাতনের সংকটটি একটু ভিন্ন। আমরা চেয়েছিলাম, নীতিনির্ধারকেরা যেন সরাসরি এই তীব্র মানবিক যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে পারেন।’
গল্পের সঙ্গে গান ও কবিতা
ব্যাংকসটাউন আর্টস সেন্টারে ‘লেট মি ফ্লাই’ মঞ্চস্থ হয়। প্রযোজনার পরিকল্পনায় গল্প বলার সঙ্গে সংগীত, কবিতা ও দর্শকের অংশগ্রহণকে যুক্ত করা হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতার পাশাপাশি অভিবাসনের মানসিক অভিঘাত ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতাও এর বিষয়। যেসব নারীর কথা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়, তাঁদের কণ্ঠ সামনে আনাই ছিল আয়োজনের লক্ষ্য।
মঞ্চসজ্জায়ও ফুটে উঠেছে বন্দিত্ব ও মুক্তির ভাবনা। খাঁচাবন্দী ও ডানা ভাঙা পাখির প্রতীকসংবলিত ব্যানার এঁকেছেন বাংলাদেশের শিল্পী কীরিটি রঞ্জন বিশ্বাস। কারিগরি সহায়তা দিয়েছেন সিডনির আনিসুর রহমান।
দর্শকের প্রতিক্রিয়া
বিভিন্ন দেশের প্রবাসী নাট্যপ্রেমীদের পাশাপাশি স্থানীয় নীতিনির্ধারকেরাও নাটকটি দেখতে এসেছিলেন। নারীদের অভিজ্ঞতা মঞ্চে তুলে ধরার ধরন ও মৌসুমীর পরিবেশনা দর্শকদের মন ছুঁয়েছে। সিডনিপ্রবাসী নাট্যব্যক্তিত্ব গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘মৌসুমী মার্টিনের বাচনভঙ্গি আর অভিবাসী নারীদের বাস্তব অভিনয় ভেতরের অনুভূতি নাড়িয়ে দিয়েছে।’
লেবানিজ মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ও ক্যান্টারবারি–ব্যাংকসটাউন কাউন্সিলের সহযোগিতায় নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। এতে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের পাশাপাশি আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসী নারীরাও অংশ নেন।
অভিনয় করেছেন আসনান নেহেরিন, ফয়জুন পল্লী, ওলায়িংকা অ্যাশলে, সাহানা অভিজিৎ, ঋষিতা মার্টিন, উম্মুল বানিন আব্দুল্লাহি, সাজেদা বিলকিস আব্দুল্লাহি, ফৌজিয়া নাফিসা প্রমুখ। ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতি থেকে আসা এই নারীদের নিয়েই মৌসুমী ও জন মঞ্চে তুলে ধরেছেন নির্যাতনের গণ্ডি পেরিয়ে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।