নাদিয়া আহমেদ। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে
নাদিয়া আহমেদ। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে

বাংলাদেশ বলার পরে আর্জেন্টাইনরা সঙ্গে সঙ্গে চিনেছে, বলেছে, ‘তোমরা আমাদের বন্ধু’

আর্জেন্টিনার সমর্থক নাদিয়া আহমেদ। প্রথমবারের মতো মেসির হ্যাটট্রিকের সাক্ষী হলেন। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে স্বামী এফএস নাঈমসহ খেলা দেখতে গিয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হলো নাদিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে হোয়াটসঅ্যাপে সেই অনুভূতিই প্রকাশ করলেন নাদিয়া। কথা বলেছেন মনজুরুল আলম

প্রশ্ন

কেমন আছেন?

নাদিয়া: ভাই ভালো আছি। কিন্তু এখন এখানে রাত তিনটা বাজে। কথা বলার মতো অবস্থা নাই—একে অনেক রাত, আবার গলা বসে গেছে। আমি একটু পরেই ফোন দিচ্ছি।

প্রশ্ন

(বেশ কিছু সময় পরে ফোন দিলেন নাদিয়া) আপনি কি আগে ফিফার কোনো ম্যাচ সরাসরি দেখেছেন?

নাদিয়া: আগে কোনো ম্যাচ দেখার সুযোগ হয়নি। এবারই প্রথম। খেলা দেখতে গিয়ে এতটাই এক্সসাইটমেন্ট ছিলাম যে বিশ্বাসই হচ্ছিল না আর্জেন্টিনার খেলা দেখছি। স্বপ্ন মনে হচ্ছিল।

নাদিয়া আহমেদ। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে
প্রশ্ন

যখন মাঠে গিয়ে বসলেন, সেই সময় কেমন লাগছিল?

নাদিয়া: এটা দারুণ এক অনুভূতি। খেলা শুরু হওয়ার বহু আগে এসেছিলাম। স্টেডিয়ামজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ। নাচ–গানে সবাই মেতে আছে। এর মাঝে আবার ভাবছিলাম গতবার প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা হেরেছিল। এবার কী যে হয়। কারণ, বড় দলগুলো তুলনামূলক ভালো করছে না। অনেক অঘটন ঘটছে। কিন্তু মেসিকে দেখতে এসেছি এটাই ভালো লাগছিল।

প্রশ্ন

এখন তো খেলা দেখে ইতিহাসের একটা অংশ হয়ে গেলেন...

নাদিয়া: হ্যাঁ, এখন তো একদমই ইতিহাসের অংশ। আর্জেন্টিনার এত অর্জনের একটা ম্যাচের সাক্ষী হয়ে রইলাম, এটা ভাবতেই ভালো লাগছে।

প্রশ্ন

স্টেডিয়ামে প্রবেশের পরে সবার উচ্ছ্বাস দেখে কী মনে হচ্ছিল?

নাদিয়া: সরাসরি খেলা না দেখলে এটা বোঝা যায় না। চারপাশে সবার অপেক্ষা মানুষটা কখন এসে দাঁড়াবেন, মানে মেসি। কখন খেলা শুরু হবে। আমরা তো অনেক আগে এসেছিলাম। স্টেডিয়ামে আসার জন্য লাইনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম। তখন থেকেই দেখছি সবাই উৎসব মুডে আছেন। মাঠে তো আরও বেশি উচ্ছ্বাস সবার। আর্জেন্টাইন অনেকের সঙ্গে কথা হলো। কথা বলে বুঝতে পারলাম তাঁরা খেলা নিয়ে অনেক বেশি ইমোশনাল।

নাদিয়া আহমেদ। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে
প্রশ্ন

কেন ‘ইমোশনাল’ মনে হলো?

নাদিয়া: তাঁরা খেলা শুরু হওয়ার আগে থেকেই একের পর এক দেশাত্মবোধক গান গাইছিলেন। এক পাশে পুরো আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা গানবাজনা নিয়ে মেতে ছিলেন। মেসির নাম নিয়েই; সবাই মেসিকে সম্মান জানাচ্ছিলেন। কখন মেসি আসবে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁরাও মেসির জন্য অস্থির থাকেন। আবার যখন খেলা শেষে নামছিলাম, তখন নামার সময় আমাদের পাশে থাকা রেলিংয়ে সবাই ঢোলের মতো তাল মিলিয়ে বাজনা তুলে গান গাইছিলেন। এসব অসাধারণ অনুভূতি।

প্রশ্ন

আর্জেন্টিনার মানুষ যখন জানতে পারলেন আপনি বাংলাদেশের, তখন প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? কারণ, তাঁরা জানেন বাংলাদেশে দেশটির অনেক সমর্থক রয়েছেন?

নাদিয়া: আমরা খেলা দেখব বলে অনেক আগেই বাসা থেকে বের হয়েছি। আমার সঙ্গে নাঈম ছিল। সে–ও মেসিকে পছন্দ করে। কিন্তু জার্মানির সমর্থক। স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর আগপর্যন্ত আমাদের অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। তাঁদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কোন দেশ থেকে এসেছি জানতে চেয়েছেন। বাংলাদেশ বলার পরে আর্জেন্টাইনরা সঙ্গে সঙ্গে চিনেছে, বলেছে, ‘তোমরা আমাদের বন্ধু।’ মাঠেও আমাদের পাশে অনেকে ছিলেন। তাঁরাও বলছিলেন তোমাদের সঙ্গে খেলা দেখে অনেক ভালো লাগল।

নাদিয়া আহমেদ। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে
প্রশ্ন

মাঠে মেসি যখন পা রাখেন, সেই মুহূর্তটা কেমন ছিল?

নাদিয়া: আমরা তো টেলিভিশনেই যখন খেলা দেখি, তখন মেসিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। চিল্লাচিল্লি শুরু করি মেসি বলে বলে—এখানেও সবাই আগে থেকেই চিল্লাচ্ছিল। সরাসরি মেসির এন্টি দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। সবাই বলছি, ‘এই এখন ঢুকবে মেসি।’ তখন শুরু হয়ে গেল স্টেডিয়ামজুড়ে কাউন্টডাউন। টেন থেকে ওয়ান পর্যন্ত গুনতে শুরু করে দিল। ওয়ান বলার সঙ্গে মেসি এসে দাঁড়াল। মেসি এসে দাঁড়ানোর পরে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম, চিল্লায়ে আমার গলার স্বরই বেসে গেছে। মেসি মাঠে এলে কী অবস্থা হয় এটা সরাসরি দেখার অনুভূতি জীবনেও ভুলব না।

প্রশ্ন

কবে আর্জেন্টিনার খেলা দেখার পরিকল্পনা করলেন?

নাদিয়া: গত বিশ্বকাপ হলো কাতারে। তখন অনেকেই খেলা দেখতে গিয়েছিল। তখন খুব আফসোস হয়েছিল, এত কাছে, যেতে পারলাম না। এর পর থেকেই সিদ্ধান্ত নিই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ মিস করব না। তখন থেকেই লেগে ছিলাম কীভাবে টিকিট করব সেসব নিয়ে। গত বছর লটারি করেছিল ফিফা। সেখানে একের পর এক হতাশ হতে হয়। মনে হচ্ছিল এবারও খেলা দেখা হবে না। পরে সেকেন্ড একটা মাধ্যম থেকে আমরা টিকিট কাটি। এ বছর এপ্রিলে ফাইনালি টিকিট হাতে পাই। তখন আশ্বস্ত হই, খেলা দেখা হচ্ছে। এর আগপর্যন্ত বিশ্বাসই হচ্ছিল না।

নাদিয়া আহমেদ। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে
প্রশ্ন

আর কোনো ম্যাচ দেখবেন?

নাদিয়া: টিকিট পাওয়াটাই কঠিন। টিকিট পেলে তো পরের রাউন্ডের খেলাও দেখতে চাই। তবে এবার দেখলাম ম্যাচ শুরুর আগেও ফিফা আরও টিকিট ছাড়ছে। সেগুলো বেশ চড়া দামে। এভাবে যদি পরের রাউন্ডের কোনো টিকিট পাই, তাহলে কিনে ফেলব। মেসির কোনো টুর্নামেন্টই মিস করতে চাই না। আর যদি কোনো ম্যাচ না–ও দেখা হয়, তাহলেও কোনো আফসোস নেই। আমি সার্থক, মেসির হ্যাটট্রিক ম্যাচ দেখে ফেলেছি, আর কোনো ম্যাচ না দেখলেও আফসোস নেই।

প্রশ্ন

কবে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে?

নাদিয়া: আমি ঈদের আগে এসেছি। আত্মীয়স্বজন আছে, তাদের সঙ্গে সময় কাটছে। নাঈম এখানেই আছে। আপাতত আছি কিছুদিন।

স্বামী এফএস নাঈমসহ নাদিয়া আহমেদ। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যে