
কয়েক মাসে বেশ কয়েকজন পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও অন্যান্য কলাকুশলী পারিশ্রমিক না পাওয়া নিয়ে সরব হয়েছেন। মূলত ফেসবুক পোস্টেই নিজেদের ক্ষোভ জানিয়েছেন তাঁরা। পাওনা পারিশ্রমিক নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার কারণ, মান–সম্মানের ভয়েও যদি টনক নড়ে। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, পাওনা কবে পাবেন, তাঁরা জানেন না। কেউ ফোন ধরেন না। কেউ আবার বলেই দিচ্ছেন টাকা দেবেন না। কাজ না পাওয়ার ভয়ে পাওনাবঞ্চিতরা সংগঠনেও মুখ খুলতে ভয় পান।
পারিশ্রমিক না দেওয়ার বেশির ভাগ অভিযোগ নির্মাতা ও প্রযোজকদের বিরুদ্ধে। আবার অনেক প্রযোজকের অভিযোগ, পরিচালকেরা টাকা নিয়ে কাজ করেননি। তবে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাজ শেষ করার পর শিল্পী, কলাকুশলীদের পারিশ্রমিক না দেওয়া অনেক নির্মাতা ও প্রযোজকের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিনয়শিল্পী ছাড়াও ক্যামেরাম্যান, আর্ট, প্রডাকশন বয়সহ অনেকেই নিয়মিত টাকার জন্য ধরনা দিচ্ছেন। গত ঈদের আগে নির্মাতা আবু হায়াত মাহমুদ ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আর কত অপেক্ষা করব? ছয় বছর ধরে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার আমাকে একটি দীর্ঘ ধারাবাহিকের (১৬৮ পর্ব) পরিচালক সম্মানীর হিসাব দিচ্ছেন না। চাইলেই বলেন, এই বসি বসছি, হিসাব দিচ্ছি। ধৈর্যটা বেশি দিন ধরে ফেলেছি। খুব শিগগিরই নাম, ছবিসহ প্রকাশ করব।’ এই স্ট্যাটাসের নিচে পরিচালক গোলাম সোহরাব মন্তব্য করেছেন, ‘একজন প্রথিতযশা প্রযোজকের ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করেছিলাম, এক প্রথম সারির চ্যানেলের জন্য ৯ বছর আগে। রেমুনারেশন পাই নাই এখনো।’ পরিচালক ইমরাউল রাফাত লিখেছেন, তিনিও পাঁচ বছর ধরে পারিশ্রমিকের পেছনে ঘুরছেন। আরেক পরিচালক রিজাউল রিজু মন্তব্য করেছেন, ‘আমিও ক্লান্ত’।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিচালকেরা দিনের পর দিন পারিশ্রমিকের জন্য ঘুরলেও সংগঠনে সাধারণত অভিযোগ করেন না। ফেসবুকে পোস্ট দিলেও ভয়ে কারও নাম উল্লেখ করেন না। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পরিচালক বলেন, ‘আমাদের ইন্ডাস্ট্রি ছোট। নাম বললে তারা ক্ষতি করার চেষ্টা করে। কেউ নিজেদের কোনো দোষ ধরবে না কিন্তু সুযোগ পেলে ক্ষমতা দেখাবে। এসব কারণে নাম বলি নাই। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পরিশ্রমের টাকা না পেলে কষ্ট লাগে।’
কেবল পরিচালকেরা নন, পারিশ্রমিক বুঝে পেতে ভোগান্তির শিকার হলেও অভিনয়শিল্পীরা নাম প্রকাশ করতে চান না। অভিনেত্রী কাজী নওশাবা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কয়েকজনের কাছে প্রাপ্য সম্মানী একাধিকবার চেয়েও পাইনি। চাইলেই দিচ্ছি দিচ্ছি বলা হয়।’ অভিনেতা মাসুম বাশার বলেন, ‘প্রচুর লোকের কাছে টাকা পাই। অনেকের কাছে পাওনা টাকার কথা ভুলেই গেছি। ফোন দিলে পাঁচ দিন পরে ব্যাক করে। পাওনা টাকা ওঠাতেও কাঠখড় পোড়াতে হয়।’ এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি আহসান হাবীব বলেন, ‘সেলিব্রেটি বা তরুণ অভিনয়শিল্পীদের কাছ থেকে বছরে অনেকগুলো অভিযোগ পাই। মিউচুয়ালি ৯৫ ভাগ সমস্যা আমরাই সমাধান করতে পারি। অনেক সময় যাঁদের নামে অভিযোগ পাই, তাঁদের সংগঠনকে চিঠি দিই।’
ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে টাকা চাওয়ায় শিল্পনির্দেশক নাজমুস অমিকে একাধিক পরিচালক ও প্রযোজক ব্লক করেছেন। গত সপ্তাহে তিনি স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘ডিরেক্টর পারভেজ আমিনের কাছে আমি অনেকগুলো টাকা পাই। তিনি আমাকে পুলিশের ভয় ও ফেসবুক হ্যাকের ভয় দেখাচ্ছেন।’ নাজমুস আরও বলেন, ‘আশুতোষ সুজন ভাই লক্ষাধিক টাকা দিচ্ছেন না। ইফতেখার ফাহমি ভাই বলেই দিয়েছেন দেবেন না। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া নির্মাতাসহ অনেকেই বছরের পর বছর ঘোরাচ্ছেন।’ পাওনা বিষয়ে জানতে চাইলে আশুতোষ সুজন বলেন, ‘শুধু অমি না, নেহাল ভাইসহ আরও কয়েকজন অনুদানের সিনেমায় কাজ করার পারিশ্রমিক পাবেন। আমরা সিনেমাটি মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। বাকি টাকা পেলেই সবাইকে দিয়ে দেব।’ তবে শিল্পনির্দেশকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইফতেখার ফাহমি। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি আর্ট ডিরেক্টর দিয়ে কাজই করাই না। অমি কোন টাকা পায় বুঝতে পারছি না। তাকে বলবেন আমাকে ডিটেইল জানাতে। আমি কাজই কম করি।’
পাঁচ নির্মাতা ও ছয়জন অভিনেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা বিভিন্ন সময় প্রযোজক আলী বসির, শাহরিয়ার শাকিলসহ বেশ কয়জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা পাবেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে আলী বসির বলেন, ‘যে টাকা পাবেন বলে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, তিনি কি কমিটমেন্ট রেখেছেন? কেউ নিজের ব্যর্থতায় দুই দিনের জায়গায় পাঁচ দিন লাগালে সেই ব্যর্থতার দায় কে নেবে? আমি তো দুই শর মতো ধারাবাহিক বানিয়েছি, গত ঈদের ৪০টি নাটক প্রচার হয়েছে। কয়জন বলতে পারবেন তাঁরা টাকা পাবেন? এ নিয়ে কাদা–ছোড়াছুড়ি না করাই ভালো।’
আলফা আই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার শাহরিয়ার শাকিল দেশের বাইরে রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী প্রযোজক শান্ত এজাজ অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, ‘২০১৭-১৮ সালের দিকে কিছু ডিরেক্টরের টাকা বকেয়া ছিল। সেগুলো আমরা শোধ করেছি। যাঁরা ফেসবুকে আমাদের উদ্দেশ করে লিখছেন, তাঁরা আমাদের জানাতে পারেন।’
টেলিভিশন প্রযোজক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাজু মনতাসির বলেন, ‘আমরা প্রায়ই অভিযোগ পাই। অনিয়মিত কিছু প্রযোজক এমনটা বেশি করে। তবে অনেক প্রযোজকও পরিচালকদের কাছে টাকা পান। আইন ও সালিস বিভাগের মাধ্যমে কমিটি করে আমরা এসব অভিযোগ নিষ্পত্তি করি।’