‘দ্য গডফাদার’–এর রবার্ট ডুভাল। আইএমডিবি
‘দ্য গডফাদার’–এর রবার্ট ডুভাল। আইএমডিবি

রবার্ট ডুভাল যেভাবে হলিউড কিংবদন্তি হয়ে উঠলেন

সাত দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ার, সাতবার অস্কার মনোনয়ন, অসংখ্য অবিস্মরণীয় চরিত্র—ছিলেন সেই বিরল অভিনেতাদের একজন, যিনি তারকাখ্যাতি নয়, অভিনয় দিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল শান্ত, দৃঢ়, কখনো কঠোর; কিন্তু সব সময়ই বিশ্বাসযোগ্য। সেই অভিনেতা রবার্ট ডুভাল ১৫ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন; কিন্তু কীভাবে হলিউডের কিংবদন্তি হয়ে উঠলেন তিনি?

নৌবাহিনীর পরিবার থেকে অভিনয়ের পথে
১৯৩১ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোতে জন্ম ডুভালের। বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে যেন নেভিতে যোগ দেয়; কিন্তু কলেজ শেষ করে সেনাবাহিনীতে দুই বছর কাটানোর পর তিনি পা বাড়ান সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে—অভিনয়ে।

নিউইয়র্কে অভিনয় শেখার সময় তাঁর সহপাঠী ছিলেন ভবিষ্যতের দুই তারকা ডাস্টিন হফম্যান ও জিন হ্যাকম্যাক। সে সময় ছোটখাটো চাকরি করে জীবন চালালেও লক্ষ্য ছিল একটাই—মঞ্চে দাঁড়ানো।

প্রথম বড় সুযোগ
টেলিভিশনের ছোট চরিত্র দিয়ে শুরু হলেও ১৯৬২ সালে ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’ চলচ্চিত্রে রহস্যময় বুউ র‌্যাডলি চরিত্রে অভিনয়ই ছিল তাঁর বড় পর্দার অভিষেক। সংলাপ কম, উপস্থিতি সীমিত—তবু দর্শকের মনে দাগ কেটে যায় তাঁর অভিনয়।
ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার সঙ্গে যাত্রা

ষাটের দশকের শেষ দিকে পরিচালক ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার সঙ্গে কাজ তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে ‘দ্য গডফাদার’-এ মাফিয়া পরিবারের পরামর্শক টম হ্যাগেন চরিত্রে অভিনয় তাঁকে এনে দেয় প্রথম অস্কার মনোনয়ন। শান্ত, বুদ্ধিমান, পর্যবেক্ষণশীল—এই চরিত্রের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, নায়ক না হয়েও সিনেমার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া যায়।

রবার্ট ডুভাল। এএফপি ফাইল ছবি

কালজয়ী সব চরিত্র
১৯৭৯ সালে ‘অ্যাপোক্যালিপস নাউ’-এ লেফটেন্যান্ট কর্নেল কিলগোর চরিত্রে তাঁর অভিনয় যেন বিস্ফোরক উপস্থিতি। যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে তাঁর সংলাপ ‘আই লাভ দ্য স্মেল অব নাপাম ইন দ্য মর্নি’ সিনেমা ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। এই চরিত্র তাঁকে এনে দেয় আরেকটি অস্কার মনোনয়ন এবং বিশ্বজুড়ে নতুন পরিচিতি।

অস্কার জয়ের মুহূর্ত
১৯৮৩ সালের ‘টেন্ডার মার্সিজ’ চলচ্চিত্রে এক বিধ্বস্ত কান্ট্রি সিঙ্গারের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জিতে নেন সেরা অভিনেতার অস্কার। অতিরঞ্জনহীন, মৃদু অভিনয় ডুভালের মূল শক্তি এখানেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‘টেন্ডার মার্সিজ’–এর রবার্ট ডুভাল। আইএমডিবি

কঠোর কিন্তু ভেতরে গভীরতা
‘দ্য গ্রেট সানতিনি’, ‘নেটওয়ার্ক’, ‘দ্য অ্যাপোসল’, ‘আ সিভিল অ্যাকশন’—প্রতিটি ছবিতে তিনি এমন চরিত্র বেছে নিয়েছেন, যারা মেজাজি, অহংকারী; একই সঙ্গে ভেতরেও ভেঙে পড়া মানুষ। তিনি বলতেন, চরিত্র যত কঠিন হবে, তার ভেতরের মানুষটাকে তত গভীর হতে হবে।

টিভি সিরিজেও সমান প্রভাব
বড় পর্দার পাশাপাশি মিনি সিরিজ ‘লোসাম ডাভ’ তাঁকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলে। পশ্চিমা ঘরানার সিনেমা ও সিরিজে তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘ইংরেজদের আছে শেকসপিয়ার, ফরাসিদের মলিয়ের আর আমেরিকার আছে ওয়েস্টার্ন।’

শেষ বয়সেও থামেননি
অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা এতটাই প্রবল ছিল যে ৯০ পার করেও তিনি অভিনয় চালিয়ে যান। ‘দ্য জাজ’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয়ের জন্য আবারও অস্কার মনোনয়ন আসে—যেন প্রমাণ করে দিলেন, বয়স শুধু সংখ্যা।

রবার্ট ডুভাল। এএফপি ফাইল ছবি

কেন তিনি ‘অ্যাক্টরস অ্যাক্টর’
রবার্ট ডুভালকে বড় তারকা নয়; বরং ‘অভিনেতাদের অভিনেতা’ বলা হয়। কারণ, তিনি ক্যামেরার সামনে কখনো অভিনয় করতেন না—তিনি চরিত্র হয়ে উঠতেন।
সিনেমার ইতিহাসে এমন অনেক নাম আছে, যাঁরা আলোয় থেকেছেন; কিন্তু ডুভালের বিশেষত্ব হলো তিনি আলোকে নিজের দিকে টেনে আনেননি; বরং চরিত্রের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।

হলিউডে প্রজন্ম বদলেছে, অভিনয়ের ধরন বদলেছে কিন্তু পর্দায় রবার্ট ডুভালের সংযত অভিনয়, পর্দার বাইরে নিরুত্তাপ জীবন বেছে নেওয়া তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।

বিবিসি অবলম্বনে