‘মাইকেল’–এ জাফর জ্যাকসন। আইএমডিবি
‘মাইকেল’–এ জাফর জ্যাকসন। আইএমডিবি

বিতর্ক ছাপিয়ে হিট হওয়ার পথে মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিক

নামটা যখন মাইকেল জ্যাকসন, তখন বিতর্ক তো হবেই। প্রয়াত এই পপ তারকার বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো কথা হবে না, আবার তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে বিতর্কও কম নেই। তাই তাঁর জীবনের গল্প নিয়ে যখন ‘মাইকেল’ সিনেমার ঘোষণা হয়, তখন এ নিয়েই যে ব্যাপক বিতর্ক হবে, সেটা ধরেই নেওয়া হয়েছিল। অপেক্ষার অবসান হচ্ছে, ২৪ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাবে সিনেমাটি। বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, মুক্তির পর ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্য পেতে যাচ্ছে ‘মাইকেল’।

‘বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডি’র পথ ধরে
‘মাইকেল’ মুক্তির আগেই তৈরি করেছে তুমুল আগ্রহ। একই সঙ্গে প্রশ্নও: এই সিনেমা কি তাঁর জীবনের পুরো গল্প বলবে? ২০১৮ সালের সুপারহিট ‘বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডি’ ছিল নানা সমস্যায় জর্জর একটি প্রজেক্ট। শুটিংয়ের মাঝপথে পরিচালক পরিবর্তন, প্রধান অভিনেতা বদল—সবকিছু মিলিয়ে এটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ। তবু ছবিটি বিশ্বব্যাপী ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে জেতে চারটি অস্কার।
এই সাফল্যের পরই প্রযোজক গ্রাহাম কিং ঘোষণা দেন, তিনি আরেকজন সংগীত কিংবদন্তিকে নিয়ে বায়োপিক বানাবেন। সেই কিংবদন্তি হচ্ছেন ‘কিং অব পপ’ মাইকেল জ্যাকসন।

শুরু থেকেই জটিলতা
তবে শুরু থেকেই ছবিটি সহজ ছিল না। কারণ, মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গুরুতর অভিযোগ, বিশেষ করে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ।
১৯৯৪ সালে জর্ডান চ্যান্ডলারের সঙ্গে আদালতের বাইরে সমঝোতা করেন মাইকেল। পরে ২০০৫ সালে একটি ফৌজদারি মামলায় তিনি খালাস পান।

জ্যাকসনের এস্টেটের আইনজীবীরা বলছেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মাইকেল জ্যাকসন নির্দোষ, এটি আদালতের রায় ও প্রমাণে সমর্থিত।’

তবু এসব অভিযোগ মাইকেলের জীবনের অংশ হয়ে রয়েছে, যা একটি বড় বাজেটের হলিউড সিনেমা নির্মাণকে জটিল করে তোলে।

জনপ্রিয়তা মৃত্যুর পরও অটুট
২০০৯ সালে মাত্র ৫০ বছর বয়সে মৃত্যুর পরও মাইকেল জ্যাকসনের জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং বেড়েছে। স্পটিফাইয়ে তাঁর মাসিক শ্রোতা প্রায় ৬৫ মিলিয়ন। এই বিশাল ‘মাইকেল জ্যাকসন ইন্ডাস্ট্রি’র নতুন সংযোজন হতে যাচ্ছে এই বায়োপিক।

‘মাইকেল’–এর পোস্টার। আইএমডিবি

তারকাবহুল নির্মাণ
২০২৩ সালে ঘোষণা আসে, ছবিটি লিখবেন জন লোগান, পরিচালনা করবেন অ্যান্টনি ফুকো। অভিনয়ে থাকবেন কোলম্যান ডমিঙ্গো, মাইলস টেলার, নিয়া লং। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মাইকেলের চরিত্রে অভিনয় করছেন তাঁরই ভাতিজা জাফর জ্যাকসন।

বিতর্ক বনাম জনপ্রিয়তা
প্রশ্ন উঠছে, এত বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও কেন জ্যাকসন এখনো এত জনপ্রিয়? ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সমালোচক লুডোভিক হান্টার-টিলনির মতে, তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ নেই, ইমেজ পুনর্গঠনের চেষ্টা হয়েছে। এ ছাড়া অনেকেই তাঁকে ‘ভিকটিম’ হিসেবে দেখেন। লুডোভিকের মতো, সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ছিলেন অসাধারণ শিল্পী।

অন্যদিকে ২০১৯ সালের বিতর্কিত তথ্যচিত্র ‘লিভিং নেভারল্যান্ড’-এ দুই ব্যক্তি অভিযোগ করেন, শিশু অবস্থায় তাঁরা জ্যাকসনের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলেন। ডকুমেন্টারির নির্মাতা ড্যান রিড দাবি করেন, বায়োপিকের প্রাথমিক স্ক্রিপ্টে অনেক ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছিল। তবে জ্যাকসনের এস্টেট এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

গল্প বদলের নেপথ্য
প্রথম দিকে ধারণা ছিল, সিনেমাটিতে জ্যাকসনের জীবনের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোও দেখানো হবে। বিশেষ করে জর্ডান চ্যান্ডলার–সংক্রান্ত ঘটনাগুলো ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু পরে সেই পরিকল্পনা বদলে যায়। বর্তমান সংস্করণে দেখানো হয়েছে জ্যাকসনের শৈশব ও ‘দ্য জ্যাকসন ৫’-এর সঙ্গে তাঁর যাত্রা, বাবার কঠোর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি, একক শিল্পী হিসেবে সুপারস্টার হয়ে ওঠা এবং ১৯৮৮ সালের ‘ব্যাড’ ট্যুরের জাঁকজমকপূর্ণ কনসার্ট দিয়ে সমাপ্তি, অর্থাৎ বিতর্কিত কোনো অংশই রাখা হয়নি।

কেন বাদ পড়ল বিতর্ক
হলিউড রিপোর্টারের মতে, ১৯৯৪ সালের সমঝোতার একটি শর্ত ছিল, জর্ডান চ্যান্ডলারকে কোনো চলচ্চিত্রে দেখানো যাবে না। ফলে নতুন করে দৃশ্য লেখা হয়, ২০২৫ সালে ২২ দিন অতিরিক্ত শুটিং হয় এবং মুক্তির সময় পিছিয়ে ২০২৬ করা হয়। এই পুনরায় শুটিংয়ে খরচ হয়েছে ১০-১৫ মিলিয়ন ডলার।

সিক্যুয়েলের ইঙ্গিত
প্রতিবেদন বলছে, বাদ পড়া অংশগুলো ভবিষ্যতে সিক্যুয়েলে ব্যবহৃত হতে পারে। স্টুডিও লায়নসগেট ইঙ্গিত দিয়েছে, এটি আসলে ‘পার্ট ওয়ান’, যেখানে একজন কিংবদন্তির উত্থান দেখানো হবে। তবে কেবল ইতিবাচকভাবে সিনেমায় মাইকেলকে উপস্থাপন করা হলে সমালোচকেরা কীভাবে নেন আর সার্বিক প্রতিক্রিয়া কী হবে, সেটা মুক্তির পরই বোঝা যাবে।

বিবিসি অবলম্বনে