মার্কিন বিচার বিভাগের (ডিওজে) অ্যান্টিট্রাস্ট বিভাগ ১১১ বিলিয়ন ডলারের প্যারামাউন্ট-ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি একীভূতকরণ চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। কোলাজ
মার্কিন বিচার বিভাগের (ডিওজে) অ্যান্টিট্রাস্ট বিভাগ ১১১ বিলিয়ন ডলারের প্যারামাউন্ট-ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি একীভূতকরণ চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। কোলাজ

ট্রাম্পঘনিষ্ঠ ধনকুবেরের সমর্থনে হলিউডের মেগা চুক্তি, ওয়ার্নার ব্রাদার্স কিনছে প্যারামাউন্ট-স্কাইড্যান্স

হলিউডে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত করপোরেট লড়াইয়ে বড় জয় পেল স্কাইড্যান্স-প্যারামাউন্ট। মার্কিন বিচার বিভাগের (ডিওজে) অ্যান্টিট্রাস্ট বিভাগ ১১১ বিলিয়ন ডলারের প্যারামাউন্ট-ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি একীভূতকরণ চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এত বড় একটি চুক্তির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সম্পদ বিক্রি, বিশেষ শর্ত বা আচরণগত বিধিনিষেধ আরোপ করেনি সংস্থাটি।

ফলে স্কাইড্যান্সের প্রধান নির্বাহী ডেভিড ইলিসনের বহুদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় একটি বাধা দূর হলো। তবে আইনি লড়াই এখনো শেষ হয়নি।

কী বলছে বিচার বিভাগ
আট মাসব্যাপী তদন্ত শেষে ডিওজে জানিয়েছে, প্যারামাউন্ট ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির একীভূতকরণ প্রতিযোগিতা বা ভোক্তাদের জন্য ক্ষতিকর হবে—এমন প্রমাণ তারা পায়নি। তদন্তের অংশ হিসেবে ৮০টির বেশি পক্ষের কাছ থেকে ২০ লাখের বেশি নথি সংগ্রহ করা হয়। শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহীদের জিজ্ঞাসাবাদ, তৃতীয় পক্ষের সাক্ষাৎকার ও দীর্ঘ শুনানির পর সংস্থাটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
ডিওজের ভাষায়, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্প এখন অত্যন্ত গতিশীল এবং এই চুক্তি প্রতিযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।

তৈরি হবে নতুন মিডিয়া সাম্রাজ্য
চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে এক ছাতার নিচে চলে আসবে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বিনোদন ব্র্যান্ডগুলো। প্যারামাউন্টের সম্পদের মধ্যে রয়েছে সিবিএস, সিবিএস নিউজ, প্যারামাউন্ট পিকচার্স ও প্যারামাউন্ট প্লাস।

অন্যদিকে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির সম্পদের মধ্যে রয়েছে এইচবিও ম্যাক্স, ওয়ার্নার ব্রাদার্স পিকচার্স, সিএনএন, টিএনটি, টিবিএস, এইচজিটিভি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই একীভূতকরণের ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কনটেন্ট লাইব্রেরি ও স্ট্রিমিং ব্যবসা তৈরি হবে, যা সরাসরি নেটফ্লিক্স, ডিজনি প্লাস এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে।

হলিউডে কেন এত উদ্বেগ
চুক্তিটি ঘোষণার পর থেকেই হলিউডের শিল্পীসমাজের একাংশ তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্রকর্মী এক খোলা চিঠিতে এর বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ফ্লোরেন্স পিউ, পেদ্রো প্যাসকল, এডওয়ার্ড নর্টন, হোয়াকিন ফিনিক্স, বেন স্টিলার ও রবার্ট ডি নিরো।

এসব শিল্পীর আশঙ্কা, এই একীভূতকরণ হাজার হাজার কর্মসংস্থান কমিয়ে দিতে পারে, বাজারে প্রতিযোগিতা হ্রাস করতে পারে এবং দর্শকদের জন্য কনটেন্টের বৈচিত্র্য কমিয়ে দিতে পারে।

এই আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, প্যারামাউন্ট ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, একীভূতকরণের মাধ্যমে তারা ছয় বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় সাশ্রয় করতে চায়। সাধারণত এ ধরনের ব্যয় সাশ্রয়ের বড় অংশ আসে কর্মী ছাঁটাই ও বিভাগ একীভূত করার মাধ্যমে।

ট্রাম্প-যোগ নিয়ে বিতর্ক
চুক্তিটি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও কম নয়। ডেভিড এলিসনের বাবা লরি এলিসন বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওরাকলের সহপ্রতিষ্ঠাতা। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত।

এই কারণে ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনসহ কয়েকজন আইনপ্রণেতা অভিযোগ করেন, চুক্তিটি রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সুবিধা পেতে পারে।
ডিওজে অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তদন্ত পুরোপুরি পেশাদার কর্মীদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত কেবল তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে।

নেটফ্লিক্সের সঙ্গে বিডিং যুদ্ধ
এই নাটকীয় করপোরেট লড়াইয়ের আরেক চরিত্র ছিল নেটফ্লিক্স। গত বছরের শেষ দিকে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের স্টুডিও ও স্ট্রিমিং ব্যবসা অধিগ্রহণের বিষয়ে নেটফ্লিক্সও আলোচনায় ছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে প্যারামাউন্ট তাদের প্রস্তাব বাড়ালে নেটফ্লিক্স প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ায়।

পরবর্তী সময়ে প্যারামাউন্ট অভিযোগ করে, নেটফ্লিক্স নাকি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছে চুক্তিটির বিরুদ্ধে জোরালো লবিং করেছে। যদিও নেটফ্লিক্স এই অভিযোগকে ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ডিওজের অনুমোদন মিললেও চুক্তিটি এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত নয়। ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোনতাসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা অ্যান্টিট্রাস্ট আইনের আওতায় মামলা করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন।

এ ছাড়া ইউরোপেও তদন্ত চলছে। ইউরোপিয়ান কমিশন বিশেষভাবে খতিয়ে দেখছে সৌদি আরব, কাতার ও আবুধাবির সার্বভৌম সম্পদ তহবিল থেকে আসা প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন।

ভ্যারাইটি অবলম্বনে