
বিশ্বজুড়ে তিনি পরিচিত ‘জেমস বন্ডের অভিভাবক’ হিসেবে। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে রয়েছে নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। বলছি বারবারা ব্রকোলির কথা। প্রযোজকের মেয়ে বলে অনেকেই মনে করতেন, তিনি শুধু সুযোগ পাচ্ছেন। এমন পরিচয়ে তিনি এগিয়ে যেতে চাননি। কীভাবে সেই প্রযোজক বাবার ছায়া থেকে বের হলেন তিনি।
বারবারা ব্রকোলির জন্ম ১৯৬০ সালের ১৮ জুন, যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে। তিনি কিংবদন্তি বন্ড প্রযোজক আলবার্ট আর ব্রকোলির কন্যা। শৈশব কেটেছে বন্ড ছবির শুটিং সেটে। বাবার সঙ্গে গিয়ে দেখেছেন বন্ডের সিনেমার শুটিং। পরে তিনি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৈশোরেই বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রচারণা বিভাগে কাজ শুরু করেন।
সংগ্রামের দিনগুলো
বাবার পরিচয়ের বাইরে নিজেকে প্রমাণ করতে চাইতেন। কারণ, ক্যারিয়ার শুরুর সময়ে হলিউডে অনেকেই ধারণা করতেন যে তিনি শুধু ‘প্রযোজকের মেয়ে’ বলেই সুযোগ পাচ্ছেন। তিনি সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেছিলেন, ‘সবাই বলত, প্রযোজকের মেয়ে বলে এত কিছু। প্রযোজক বাবার মেয়ে বলে অনেকেই মনে করত, আমার সত্যকারের মেধা নেই।’
সেই ধারণা ভাঙতে বছরের পর বছর পর্দার আড়ালে কাজ করেছেন। ১৭ বছর বয়সে ‘দ্য স্পাই হু লাভড মি’–এর প্রচারণা বিভাগে যুক্ত হন। পরে সহকারী পরিচালক এবং সহযোগী প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৫ সালে তিনি সৎভাই মিশেল জি উইলসনের সঙ্গে বন্ড সিরিজের প্রধান প্রযোজকের দায়িত্ব নেন। তখন এই ফ্র্যাঞ্চাইজি অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। সেই সময়ে তাঁদের গোল্ডেনআই–এর সাফল্য নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনে জেমস বন্ডকে। এরপর তাঁকে নিজেকে প্রমাণ করতে একের পর এক ঝুঁকি নিতে হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ছিল ড্যানিয়েল ক্রেগ
বারবারা ব্রকোলির সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল ড্যানিয়েল ক্রেগকে নতুন জেমস বন্ড হিসেবে নির্বাচন করা। সে সময় অনেক ভক্ত ও সমালোচক এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ সিনেমা মুক্তির পর সেই সিদ্ধান্তই বন্ড ইতিহাসের অন্যতম সফল কাস্টিং হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
কঠিন সময় ও লড়াই
বন্ড ফ্র্যাঞ্চাইজির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাও ছিল তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২২ সালে অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওস অধিগ্রহণ করলেও বারবারা ব্রকোলি দীর্ঘদিন সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখেন। তিনি মনে করতেন, বন্ড কেবল ‘কনটেন্ট’ নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কয়েক বছর ধরে অ্যামাজনের সঙ্গে মতবিরোধের পর ২০২৫ সালে তিনি ও মাইকেল উইলসন সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেন। চরিত্র তৈরি নিয়েও মতবিরোধ দেখা দেয়। এ নিয়ে বারবারা লিখেছিলেন, ‘জেমস বন্ড যেকোনো বর্ণের হতে পারেন, কিন্তু চরিত্রটি পুরুষ হিসেবেই থাকবে।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘নারীদের জন্য নতুন শক্তিশালী চরিত্র সৃষ্টি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
একের পর এক সাফল্য
তাঁর নেতৃত্বে নির্মিত বন্ড সিরিজের সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’, ‘স্কাইফল’, ‘স্পেকটার’, ‘নো টাইম টু ডাই’ এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে বন্ড ইতিহাসে নতুন মাইলফলক গড়ে। বাড়তে থাকে তাঁর আয়। দ্য হলিউড রিপোর্টার এর মতে বারবারা ব্রকোলির সম্পদের পরিমাণ ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
তাঁকে নিয়ে সিনেইউরোপার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘হলিউডে নারী প্রযোজকদের সংখ্যা যখন তুলনামূলক কম ছিল, তখন বারবারা ব্রকোলি বিশ্বের সবচেয়ে সফল চলচ্চিত্র ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর একটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাবার উত্তরাধিকার রক্ষা করলেও তিনি কেবল উত্তরাধিকারী হয়ে থাকেননি; বরং নিজের সিদ্ধান্ত, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং দূরদর্শিতার মাধ্যমে জেমস বন্ডকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।’