হলিউডের মূলধারার সিনেমায় যৌনতা নিয়ে একসময় বেশ খোলামেলা আলোচনা হতো। কিন্তু গত কয়েক দশকে বড় পর্দায় যৌন দৃশ্যের উপস্থিতি কমেছে। ২০১৯ সালের এক জরিপেও দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেমায় যৌন দৃশ্যের সংখ্যা আগের ৫০ বছরের তুলনায় কমে এসেছে। একই সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যৌন সম্পর্কের প্রবণতা কমে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো, যৌনতা নিয়ে বাড়তি সংবেদনশীলতা কিংবা অনলাইনে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা—এর পেছনে নানা কারণের কথা বলা হয়েছে।
তবে ২০২৬ সালে যেন পরিস্থিতি আবার বদলাচ্ছে। যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্ক ও যৌন পরীক্ষা এখন নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে সিনেমায়। ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’, ‘দ্য ইনভাইট’, ‘পিলিয়ন’ বা আগের ‘বেবিগার্ল’—সাম্প্রতিক এসব সিনেমায় যৌনতাকে শুধু উত্তেজক উপাদান হিসেবে নয়; বরং চরিত্রের মানসিকতা, সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
গ্রেগ আরাকির নতুন সিনেমা
এ পরিবর্তনের অন্যতম আলোচিত উদাহরণ গ্রেগ আরাকির ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’। ১৯৯০-এর দশকের নিউ কুইয়ার সিনেমা আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত নির্মাতা আরাকি তাঁর সিনেমায় বরাবরই যৌনতা ও সম্পর্কের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন। নতুন সিনেমাটিতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
সিনেমার গল্প শিল্পজগতের তরুণ ইন্টার্ন এলিয়টকে ঘিরে। সে তার বয়সে বড় নিয়োগকর্তা এরিকা ট্রেসির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এরিকা একজন বিখ্যাত শিল্পী; যৌনতা ও আধিপত্য নিয়ে তার নিজস্ব, প্রচলিত ধারণার বাইরে থাকা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তাদের কর্মক্ষেত্রের অনুচিত সম্পর্ক ধীরে ধীরে জটিল হয়ে ওঠে।
আরাকি জানিয়েছেন, সিনেমাটির চিত্রনাট্য লেখার সময় তিনি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যৌনতা নিয়ে একধরনের সংকোচ লক্ষ করেছিলেন। তাঁর মতে, ভুল করার ভয় অনেকের মধ্যেই তৈরি হয়েছে। অথচ ভুলের মধ্য দিয়েই মানুষ শেখে।
চলচ্চিত্র সমালোচক ট্রাভিস উডসের ভাষায়, ‘সিনেমা আবারও যৌনতানির্ভর হয়ে উঠছে।’ তবে আশি বা নব্বইয়ের দশকের মতো সরাসরি যৌনতার প্রদর্শন নয়; বরং নির্মাতারা ধীরে ধীরে মূলধারার সিনেমাতেই যৌনতা ও যৌন আকাঙ্ক্ষাকে নতুনভাবে অনুসন্ধান করছেন।
‘বেবিগার্ল’ থেকে ‘পিলিয়ন’
এই নতুন ধারার সিনেমার তালিকায় রয়েছে হালিনা রেইনের ‘বেবিগার্ল’। নিকোল কিডম্যান অভিনীত সিনেমাটিতে ক্ষমতাবান এক করপোরেট নির্বাহী নিজের কর্মক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি হন। তরুণ কর্মীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যৌনতা, ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের জটিল সমীকরণ সামনে আনে।
ব্রিটিশ নির্মাতা হ্যারি লাইটনের ‘পিলিয়ন’-এও যৌনতা ও সম্পর্কের ভিন্ন এক দিক উঠে এসেছে। সিনেমাটিতে এক লাজুক তরুণ সমকামী পুরুষের প্রেমে পড়ার গল্প বলা হয়েছে। সম্পর্কটি শুধু যৌন আকর্ষণের নয়, আবেগ, প্রত্যাশা ও হৃদয়ভাঙারও।
এ ধরনের সিনেমার বিশেষত্ব হলো, যৌনতাকে এখানে সব সময় গুরুগম্ভীর বা নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে না। কোথাও তা মজার, কোথাও বিব্রতকর, আবার কোথাও আবেগপূর্ণ। অর্থাৎ যৌন অভিজ্ঞতার ভালো-মন্দ—দুই দিকই গল্পের অংশ হয়ে উঠছে।
‘দ্য ইনভাইট’-এ যৌনতা নিয়ে সরাসরি আলোচনা
অলিভিয়া ওয়াইল্ডের তৃতীয় পরিচালিত সিনেমা ‘দ্য ইনভাইট’ এ ধারার আরেকটি উদাহরণ। সিনেমাটি বহুগামী সম্পর্ক, দাম্পত্যের সংকট ও যৌনতার সামাজিক ধারণা নিয়ে তৈরি। ওয়াইল্ড ও শেঠ রোজেন অভিনীত এক দম্পতির জীবনে নতুন মোড় আসে প্রতিবেশী এক মুক্তমনা দম্পতির সঙ্গে পরিচয়ের পর।
সিনেমাটিতে সরাসরি যৌন দৃশ্য না থাকলেও দাম্পত্য যৌনতা ও এর অভাব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা রয়েছে। ফলে যৌনতা এখানে শুধু পর্দায় দেখানোর বিষয় নয়; বরং চরিত্রগুলোর সম্পর্ক ও মানসিক অবস্থাকে বোঝার একটি মাধ্যম।
সাম্প্রতিক এসব সিনেমার একটি মিলও রয়েছে—অনেকগুলোই নারী অথবা কুইয়ার নির্মাতাদের হাতে তৈরি। ফলে যৌনতাকে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিতে দেখানোর বদলে সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতা ও আত্মপরিচয়ের জটিলতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে।
ঘনিষ্ঠ দৃশ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
হলিউডের বহু সিনেমায় যৌন দৃশ্য দীর্ঘদিন গল্পের প্রয়োজনের চেয়ে যেন আনুষ্ঠানিকতার অংশ হয়ে ছিল। কয়েকটি ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য, বিছানায় হাত কিংবা চাদরের নিচে নড়াচড়া, এরপর দৃশ্য শেষ। এতে চরিত্রের সম্পর্ক বা গল্পে খুব বেশি কিছু যোগ হতো না।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ‘ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর’-এর ভূমিকা। যৌন দৃশ্যের শুটিংয়ে অভিনয়শিল্পীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি দৃশ্যের প্রতিটি মুহূর্ত পরিকল্পনা করাও তাঁদের কাজ। ফলে এমন দৃশ্য এখন আগের তুলনায় বেশি সচেতন ও পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে।
শুধু শরীর নয়, ক্ষমতার সম্পর্কও
সাম্প্রতিক সিনেমাগুলোতে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের নির্মাণে বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। এর কারণ শুধু দৃশ্যগত আকর্ষণ নয়। এসব সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘বেবিগার্ল’-এর চরিত্রের মতো ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’-এর এলিয়টও নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে নিজের সম্পর্কে নতুন কিছু আবিষ্কার করে। কর্মজীবনে যে মানুষটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তার কাছে অন্যের নিয়ন্ত্রণে থাকা একধরনের স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ যৌন আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় মানুষের নিজের প্রয়োজন ও মানসিকতার এমন দিক সামনে আনে, যা সে নিজেও আগে বুঝতে পারেনি।
চলচ্চিত্র সমালোচক জুরডেইন সার্লসের মতে, এসব চরিত্র নিজেদের যৌন কল্পনার ভেতর দিয়ে আত্মপরিচয় খুঁজে পায়। ‘পিলিয়ন’ ও ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’—দুই সিনেমাতেই যৌনতাকে আবেগ ও মনস্তত্ত্বের জায়গা থেকে দেখা হয়েছে।
আনন্দের পাশাপাশি আছে ঝুঁকিও
তবে যৌন আকাঙ্ক্ষার অনুসরণ সব সময় সুখের হয় না। ‘বেবিগার্ল’-এ নিকোল কিডম্যানের চরিত্রের সম্পর্ক তাঁর ক্যারিয়ার ও দাম্পত্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’-এও এলিয়টের জীবন জটিল হয়ে পড়ে। ফলে এসব সিনেমা যৌনতাকে একমাত্র আনন্দের বিষয় হিসেবে দেখায় না; আনন্দের সঙ্গে অস্বস্তি, ভুল, বিব্রতকর পরিস্থিতি ও মানসিক আঘাতও দেখানো হয়।
‘পিলিয়ন’-এও যৌনতা ও ভালোবাসার সীমারেখা নিয়ে একই ধরনের জটিলতা দেখা যায়। যৌন আকর্ষণকে কখন যে ভালোবাসা বলে ভুল হয়ে যায়, সেটিও সিনেমাটি দেখায়।
অলিভিয়া ওয়াইল্ডও সম্প্রতি যৌনতা নিয়ে অস্বস্তিতে থাকা তরুণদের উদ্দেশে বলেছেন, জীবনে বিব্রতকর অভিজ্ঞতা থাকাই স্বাভাবিক। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—জীবনে কোনো বিব্রতকর মুহূর্ত না থাকলে সেই জীবন হয়তো খুবই একঘেয়ে।
বিবিসি অবলম্বনে