ল্যারি আর জোআন। পঁয়ষট্টি বছরের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন তাঁদের। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন দুজনেই, তবু সারাক্ষণ খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে লেগেই থাকে মান-অভিমান আর ঝগড়া। একদিন তাঁরা যান পরিবারের এক অনাগত শিশুর জেন্ডার রিভিল পার্টিতে। চারপাশে উৎসবের আমেজ, হাসি-ঠাট্টা চলছে। কিন্তু এই উৎসবের ভিড়েও স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভেতরে-ভেতরে বয়ে বেড়াচ্ছেন এক গভীর বিষাদ। জোআনের শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি ক্যানসার। চিকিৎসকেরা সময় বেঁধে দিয়েছেন। কিন্তু পরিবারের আনন্দ মাটি হবে ভেবে সেই খবর গোপন রেখেছেন তাঁরা।
একনজরেসিনেমা: ‘ইটারনিটি’ধরন: ফ্যান্টাসি রোমান্টিক কমেডিভাষা: ইংরেজিপরিচালনা: ডেভিড ফ্রেইনঅভিনয়: এলিজাবেথ ওলসেন, মাইলস টেলার, ক্যালাম টার্নারস্ট্রিমিং: অ্যাপল টিভিদৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট
পার্টিতে হঠাৎ ল্যারির হাতে আসে জোআনের প্রথম স্বামী লিউকের একটি ছবি। বহু বছর আগে কোরিয়া যুদ্ধে মারা গিয়েছিল লিউক। সেই পুরোনো ছবি দেখে খাবার খেতে গিয়ে গলায় একটি প্রিটজেল (ময়দার তৈরি একধরনের শক্ত মচমচে ভাজা) আটকে যায় ল্যারির, মুহূর্তেই দম বন্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ল্যারির জীবনের এই আকস্মিক সমাপ্তি দিয়ে শুরু হয় ‘ইটারনিটি’র গল্প।
আমরা জানি, বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসে মৃত্যুর পররর্তী জীবন নিয়ে আছে স্বর্গ বা নরকের ধারণা। আবার কারোর কল্পনায় ভেসে ওঠে শুধুই অন্ধকার বা অনন্ত শূন্যতা। কিন্তু আইরিশ নির্মাতা ডেভিড ফ্রেইন তাঁর নতুন সিনেমা ‘ইটারনিটি’-তে এই চিরন্তন প্রশ্নের এক অদ্ভুত উত্তর নিয়ে হাজির হয়েছেন। ২০২৫ সালের এই আলোচিত সিনেমাটি দর্শকদের দেখায় এমন এক আফটারলাইফ (পরকাল), যা দেখতে অনেকটা ব্যস্ত ট্রানজিট স্টেশনের মতো।
চোখ খুলে ল্যারি নিজেকে আবিষ্কার করেন এক অদ্ভুত স্টেশনে। জায়গাটি দেখতে অনেকটা ষাটের দশকের পুরোনো অভিজাত হোটেলের মতো। ল্যারি অবাক হয়ে উপলব্ধি করে তার সেই জরাগ্রস্ত শরীর আর নেই। সে ফিরে পেয়েছে যৌবন। অর্থাৎ জীবনের যে বয়সে সে সবচেয়ে বেশি সুখী ছিল, সেই বয়সের শারীরিক গঠন। এখানে তার সঙ্গে দেখা হয় এক ‘আফটারলাইফ কনসালট্যান্ট’ বা পরকাল পরামর্শকের। এই পরামর্শকের কাজ হলো মৃত আত্মাদের জন্য তাদের পছন্দমতো একটি জগৎ বেছে দেওয়া।
সিনেমার এই অংশটি বেশ অভিনব ও মজার। পরিচালকের কল্পনার জগতে অনন্তকাল কাটানোর জন্য হাজারো অপশন বা থিম রয়েছে। কেউ যদি সারা জীবন সমুদ্রের পাড়ে কাটাতে চায়, তার জন্য আছে ‘বিচ ওয়ার্ল্ড’। কেউ যদি পুরুষদের ঝামেলা এড়াতে চান, তার জন্য আছে ‘ম্যান-ফ্রি ওয়ার্ল্ড’। আবার কেউ যদি আশির দশকের গ্ল্যামার পছন্দ করেন, তার জন্য আছে ‘স্টুডিও ৫৪ ওয়ার্ল্ড’। তবে এই অদ্ভুত পরকালের একটা কড়া নিয়ম আছে। আপনাকে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একবার কোনো একটি জগৎ বেছে নিয়ে সেখানে ঢুকে পড়লে আর ফিরে আসা যাবে না। ল্যারি সিদ্ধান্ত নেয় সে কোনো জগৎ এখনই বেছে নেবে না। সে অপেক্ষা করবে তার স্ত্রী জোআনের জন্য।
যেহেতু জোআনের ক্যানসার ধরা পড়েছে, তাই ল্যারি জানত তার অপেক্ষা খুব বেশি দীর্ঘ হবে না। মৃত্যুর পর জোআন যখন সেই স্টেশনে পৌঁছায়, তখন তাদের পুনর্মিলন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখানে গল্প মোড় নেয় অন্যদিকে। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছে জোআনের প্রথম স্বামী লিউক। সেই ছবির মানুষটি, যে জোআনের জীবন থেকে বহু দশক আগে হারিয়ে গিয়েছিল। সেও যৌবনের চেহারা নিয়ে এতকাল অপেক্ষা করেছে শুধু জোআনের জন্য। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে জোআনকে নিতে হবে এক কঠিন সিদ্ধান্ত। সে কার সঙ্গে তার অনন্তকাল কাটাবে? ল্যারি, যার সঙ্গে সে দীর্ঘ সংসার করেছে? সুখে-দুঃখে পাশে ছিল? নাকি লিউক, যে তাকে তীব্রভাবে ভালোবাসত?
সিনেমার চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক ডেভিড ফ্রেইন খুব নিপুণভাবে একটি ত্রিভুজ প্রেমের গল্প সাজিয়েছেন। তবে এই প্রেমের গল্পে স্মৃতি, মায়া ও ভালোবাসার সঙ্গে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত মুখ্য হয়ে ওঠে। আর তা হলো জীবনের ‘কঠিন বাস্তবতা’। সিনেমায় ল্যারি চরিত্রটি কিছুটা খিটখিটে স্বভাবের। সে জোয়ানকে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে সে হয়তো জোআনকে ‘টেকেন ফর গ্র্যান্টেড’ বা নিশ্চিত ধরে নিয়েছিল। অন্যদিকে লিউক হলো জোআনের সেই হারানো প্রেম, যা পূর্ণতা পায়নি। লিউকের চরিত্রটি রোমান্টিক ও শান্ত। সে জোআনের সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, যা সময়ের আগেই হারিয়ে গিয়েছিল। দর্শক হিসেবে আপনি ল্যারি ও লিউক উভয়ের প্রতিই মায়া অনুভব করবেন।
অভিনয়শিল্পীদের জন্য এই সিনেমাটি ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, তাঁদের তরুণ শরীরে বয়স্ক ও অভিজ্ঞ মনের প্রতিফলন ঘটাতে হয়েছে। জোআন চরিত্রে এলিজাবেথ ওলসেন অনবদ্য অভিনয় করেছেন। তিনি এমন এক নারী চরিত্রের রূপদান করেছেন, যিনি সারা জীবন অন্যের খুশির জন্য নিজের ইচ্ছা বিসর্জন দিয়েছেন। মৃত্যুর পর এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে পড়ে তিনি প্রথমবারের মতো নিজের সুখকে প্রাধান্য দেওয়ার সাহস সঞ্চয় করেন। তাঁর দ্বিধা, নার্ভাসনেস এবং দুই ভালোবাসার মানুষের মাঝখানে পড়ে যাওয়ার টানাপোড়েন ওলসেন খুবই চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
মাইলস টেলার ল্যারি চরিত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। ল্যারির চরিত্রে একধরনের চার্ম বা আকর্ষণীয় দিক ফুটে উঠেছে। মৃত্যুর পর লিউকের উপস্থিতি তাকে নতুন করে লড়াই করতে শেখায়। সে বুঝতে পারে, ভালোবাসার মানুষের মন জয় করতে হলে হাল ছাড়া যাবে না। অন্যদিকে ক্যালাম টার্নার লিউকের চরিত্রে ক্ল্যাসিক নায়কোচিত আভিজাত্য নিয়ে এসেছেন।
সিনেমার পার্শ্বচরিত্রগুলোও গল্পের গতি ধরে রাখতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে ডা’ভাইন জয় র্যান্ডলফ এবং জন আর্লি এজেন্ট বা পরামর্শক হিসেবে দুর্দান্ত কাজ করেছেন। তাঁদের কমিক টাইমিং এবং অদ্ভুত সব নিয়মকানুন বোঝানোর ভঙ্গি সিনেমাটিকে প্রাণবন্ত রেখেছে। বিভিন্ন থিমযুক্ত জগৎ এবং এজেন্টদের তোষামোদ করার দৃশ্যগুলো দর্শকদের হাসাতে বাধ্য। ল্যারির এজেন্ট আনা এবং জোআনের এজেন্ট রায়ান নিজেদের ক্লায়েন্টদের নির্দিষ্ট ওয়ার্ল্ডে পাঠানোর জন্য প্রতিযোগিতায় নামে। তাঁদের এই খুনসুটি গল্পের গাম্ভীর্য কমিয়ে হালকা মেজাজ তৈরি করে।
‘ইটারনিটি’ সিনেমায় জোয়ানের দ্বন্দ্বটি আসলে দ্ব্যর্থক। দুটি ভিন্ন ধরনের ভালোবাসার দ্বন্দ্ব। লিউকের প্রেম যেন আকাশে ভেসে থাকা মেঘের মতো কল্পনার জগতে ভেসে থাকে। অন্যদিকে ল্যারির ভালোবাসাও সত্য, কিন্তু পুরোপুরি বাস্তবতানির্ভর। এই দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়া কি আদৌ সম্ভব? পরিচালক এমনই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হালকা মেজাজে এক গভীর দর্শন ভাবনা তুলে এনেছেন। সিনেমায় নব্বইয়ের দশকের ‘ঘোস্ট’ বা ‘ডিফেন্ডিং ইউর লাইফ’-এর মতো সিনেমাগুলোর ছায়া স্পষ্ট। স্ট্রিমিং সার্ভিসের যুগে এমন হাই-কনসেপ্ট রোমান্টিক কমেডি এখন আর খুব একটা দেখা যায় না। সেই শূন্যস্থান পূরণ করার এক দুর্দান্ত প্রচেষ্টা এই সিনেমা।
সিনেমার সেট ডিজাইন ও ভিজ্যুয়াল এফেক্টস প্রশংসার দাবি রাখে। স্টেশন, হোটেল ও বিভিন্ন কাল্পনিক জগতের দৃশ্যগুলো চোখের জন্য আরামদায়ক। বিশেষ করে কৃত্রিম সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখানোর জন্য পর্দা ব্যবহারের বিষয়টি বেশ নান্দনিক ছিল। তবে সিনেমাটির কিছু জায়গায় গল্পের যুক্তি কিছুটা নড়বড়ে মনে হতে পারে। প্রথম দিকে আবেগের প্রাধান্য থাকলেও শেষের দিকে চিত্রনাট্যকারেরা যেন কাহিনির জট খোলার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। ফলে ক্লাইম্যাক্সটি যতটা শক্তিশালী হতে পারত, ততটা মনে হয়নি।
তবু ডেভিড ফ্রেইন ‘ইটারনিটি’ সিনেমায় গতানুগতিক প্রেমের গল্পের বাইরে গিয়ে অনন্তকালের ভালোবাসার এক নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন। পাশাপাশি খুব যত্ন নিয়ে প্রতিটি দৃশ্য সাজিয়েছেন। আধুনিক যুগের দর্শকের রুচি মাথায় রেখেও তিনি পুরোনো দিনের সিনেমার নস্টালজিয়া ধরে রেখেছেন। তাই বলতে হয়, রোমান্টিক কমেডি ঘরানার সিনেমা যাঁরা উপভোগ করেন, তাঁদের জন্য সিনেমাটি বেশ উপভোগ্যই হবে।