কমিকসের পাতায় তাঁর জন্ম বহু আগে। কিন্তু বড় পর্দায় তাঁর যাত্রা খুব সুখকর ছিল না। ১৯৮৪ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘সুপারগার্ল’—ডিসির জনপ্রিয় সুপারহিরো চরিত্রকে কেন্দ্র করে নির্মিত প্রথম একক চলচ্চিত্র। ‘সুপারম্যান’ সিরিজের স্পিন-অফ হিসেবে নির্মিত সেই সিনেমা মুক্তির পর বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়, সমালোচকদের কাছ থেকেও পায় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। দীর্ঘদিন ধরে অনেকেই মনে করেন, সেই ব্যর্থতা হলিউডে নারী সুপারহিরোদের একক চলচ্চিত্র নির্মাণের পথকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।
চার দশকের বেশি সময় পর আবারও বড় পর্দায় ফিরছেন ‘সুপারগার্ল’। নতুন ডিসি ইউনিভার্সের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে আজ ২৬ জুন শুক্রবার আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তি পাচ্ছে ‘সুপারগার্ল’। একই দিনে বাংলাদেশের দর্শকেরাও সিনেমাটি দেখতে পারবেন স্টার সিনেপ্লেক্সে।
নতুন এই চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন ক্রেইগ গিলেস্পি। এর আগে ‘আই, টনিয়া’ ও ‘ক্রুয়েলা’র মতো আলোচিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন। ছবির নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন অস্ট্রেলীয় অভিনেত্রী মিলি অ্যালকক। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন ম্যাথিয়াস শোনার্টস, ইভ রিডলি, ডেভিড ক্রামহোল্টজ, এমিলি বিচাম, ডেভিড কোরেনসওয়েট ও জেসন মোমোয়া।
কয়েক সেকেন্ডের উপস্থিতি থেকে পূর্ণাঙ্গ যাত্রা
নতুন ডিসি ইউনিভার্সে দর্শক প্রথম ‘সুপারগার্ল’কে দেখেছেন ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া জেমস গানের ‘সুপারম্যান’ সিনেমায়। সেখানে তাঁর উপস্থিতি ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিই দর্শকদের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়।
এবার সেই চরিত্রকেই কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র। ‘হাউস অব দ্য ড্রাগন’ সিরিজে তরুণ রেনিরা টারগারিয়েন চরিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পাওয়া মিলি অ্যালককের কাঁধেই এবার নতুন ‘সুপারগার্ল’-এর দায়িত্ব।
যদিও ডিসি ভক্তদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে ‘সুপারগার্ল’ বলতে টেলিভিশন সিরিজে অভিনয় করা মেলিসা বেনয়েস্টের মুখটাই বেশি পরিচিত ছিল। তবে ডিসির নতুন পরিকল্পনায় চরিত্রটিকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
সুপারম্যানের চেয়ে ভিন্ন এক নায়িকা
এই চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় আকর্ষণ এর গল্প ও চরিত্র নির্মাণ। সুপারম্যানের মতো পৃথিবীতে নিরাপদ ও স্নেহময় পরিবেশে বড় হননি কারা জোর-এল, অর্থাৎ ‘সুপারগার্ল’।
ক্রিপ্টন ধ্বংস হওয়ার সময় তার একটি বিচ্ছিন্ন অংশে বড় হয়েছেন তিনি। শৈশবেই নিজের চারপাশের মানুষের মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। ফলে তাঁর ব্যক্তিত্ব সুপারম্যানের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর, ক্ষতবিক্ষত এবং বাস্তববাদী।
চলচ্চিত্রে দেখা যাবে, নিজের বিশ্বস্ত কুকুর ক্রিপ্টোকে নিয়ে মহাকাশ ভ্রমণে বের হন কারা। সেই যাত্রায় তাঁর পরিচয় হয় রুথি নামের এক কিশোরীর সঙ্গে। রুথির পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে এক ভয়ংকর দস্যু নেতা। এরপর রুথি ও ‘সুপারগার্ল’ একসঙ্গে ন্যায়বিচার এবং প্রতিশোধের খোঁজে বের হয় বিপজ্জনক আন্তগ্যালাকটিক অভিযানে।
ডিসি কমিকসের জনপ্রিয় সিরিজ ‘সুপারগার্ল: ওম্যান অব টুমরো’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত হয়েছে ছবিটি। ফলে এটি প্রচলিত সুপারহিরো কাহিনির বাইরে গিয়ে অনেক বেশি আবেগঘন ও মানবিক গল্প বলার চেষ্টা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আলোচনার কেন্দ্রে জেসন মোমোয়ার লোবো
ছবিটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহের আরেকটি বড় কারণ লোবো চরিত্রের লাইভ-অ্যাকশন অভিষেক। ডিসি কমিকসের এই জনপ্রিয় আন্তগ্যালাকটিক ভাড়াটে শিকারির চরিত্রে অভিনয় করেছেন জেসন মোমোয়া। এর আগে ‘অ্যাকুয়াম্যান’ চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি।
পরিচালক ক্রেইগ গিলেস্পি জানিয়েছেন, লোবো চরিত্রটিকে কমিকসের প্রতি যতটা সম্ভব বিশ্বস্ত রেখে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে কমিকসপ্রেমীদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।
ট্রেলারেই মিলেছে ইতিবাচক সাড়া
ছবির ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। দর্শকদের অনেকেই মনে করছেন, এটি আগের যেকোনো ‘সুপারগার্ল’ গল্পের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত, অন্ধকার ও আবেগঘন।
প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় সমালোচকেরাও ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ এর ভিজ্যুয়াল স্টাইলের সঙ্গে ‘ম্যাড ম্যাক্স: ফিউরি রোড’ ও ‘গার্ডিয়ানস অব দ্য গ্যালাক্সি’-এর তুলনা টেনেছেন। বিশেষ করে মহাকাশভিত্তিক অ্যাডভেঞ্চার, চরিত্রের আবেগ এবং ভিজ্যুয়াল জগতের নির্মাণ দর্শকদের কৌতূহল বাড়িয়েছে।
ডিসির ভবিষ্যৎ
সমালোচকদের মতে, ‘সুপারগার্ল’ শুধু একটি একক সুপারহিরো চলচ্চিত্র নয়। এটি ডিসি স্টুডিওসের নতুন সিনেম্যাটিক ইউনিভার্স গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জেমস গান ও পিটার সাফরানের নেতৃত্বে ডিসি বর্তমানে নতুনভাবে নিজেদের সুপারহিরো জগৎ সাজাচ্ছে। সেই পরিকল্পনায় ‘সুপারম্যান’-এর পাশাপাশি ‘সুপারগার্ল’কেও কেন্দ্রীয় নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য রয়েছে। তাই ২৬ জুন মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রের সাফল্য শুধু একটি চরিত্রের ভবিষ্যৎ নয়, নতুন ডিসি ইউনিভার্সের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। চার দশক আগে যে চরিত্রের বড় পর্দার যাত্রা শুরু হয়েছিল হতাশা দিয়ে, সেই ‘সুপারগার্ল’ এবার নতুন যুগের ডিসির অন্যতম মুখ হয়ে উঠতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।